ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার নাজিরপুর গ্রামের যুবক মো: রশিদ বেপারীর জীবন যেন এক দীর্ঘ দুঃখগাঁথা। জীবিকার আশায় প্রায় এক দশক আগে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান তিনি। পরিবারের স্বপ্ন ছিল—বিদেশে গিয়ে ভাগ্য বদলাবেন রশিদ, বদলে যাবে সংসারের অভাব-অনটনের চিত্র। কিন্তু ভাগ্য তার জন্য লিখে রেখেছিল ভিন্ন এক গল্প।
পরিবারের সদস্যরা জানায়, বিদেশ যাওয়ার পর প্রথম কয়েক বছর রশিদের সাথে যোগাযোগ স্বাভাবিক ছিল। হঠাৎ একসময় তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। ফোন বন্ধ, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন—ধীরে ধীরে পরিবার ধরে নেয় হয়তো কোনো অজানা বিপদে পড়েছেন তিনি।
রশিদের মা প্রতিদিন ছেলের ফেরার অপেক্ষায় বাড়ির উঠোনে বসে থাকতেন। গ্রামের রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকতেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কিন্তু সেই অপেক্ষা শেষ হওয়ার আগেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন তিনি। প্রায় চার বছর আগে ছেলেকে না দেখেই মৃত্যু হয় মায়ের।
পরবর্তীতে জানা যায়, মালয়েশিয়ায় পুলিশের হাতে আটক হওয়ার পর থেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন রশিদ। জেল থেকে মুক্তি পেলেও আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেন, নিজের পরিচয়ও প্রায় ভুলে গিয়েছিলেন।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও নতুন করে আশার আলো দেখায় পরিবারকে। ভিডিওতে দেখা যায়, এক ব্যক্তি অসহায়ের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছেন বিদেশের রাস্তায়। ভিডিওটি দেখে নাজিরপুর গ্রামের কয়েকজন যুবক নিশ্চিত হন—এই মানুষটিই রশিদ।
এরপর শুরু হয় তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার সংগ্রাম। স্থানীয় তরুণদের উদ্যোগে চাঁদা তোলা হয়, বিভিন্নজনের সাথে যোগাযোগ করা হয়। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর অবশেষে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় রশিদকে।
দীর্ঘ নয় বছর পর গ্রামের বাড়িতে ফিরে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। আত্মীয়-স্বজন ও এলাকাবাসী ভিড় করেন তাকে দেখতে। কিন্তু বাড়ি ফিরে সবচেয়ে বড় আঘাত পান তিনি, যখন জানতে পারেন—তার মা আর বেঁচে নেই।
পরে মায়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ নিশ্চুপ ছিলেন রশিদ। তার চোখেমুখে ছিল গভীর শূন্যতা আর হারানোর বেদনা।
বর্তমানে তিনি পরিবারের সাথেই বসবাস করছেন। তিন ভাই ও দুই বোনের এই পরিবারটি চরম আর্থিক সংকটে দিন পার করছে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থাও করতে পারছে না পরিবার।
তবুও গ্রামের মানুষের কাছে রশিদের ফিরে আসা এক স্বস্তির খবর। কারণ, দীর্ঘদিন পর হলেও হারিয়ে যাওয়া এক মানুষ ফিরে এসেছে আপন ঠিকানায়। তবে তার জীবনের সবচেয়ে বড় শূন্যতা হয়তো কখনো পূরণ হওয়ার নয়—মায়ের সেই অপেক্ষাভরা মুখ আর কোনোদিন দেখতে পাবেন না তিনি।



