ফেনীতে ফসলি জমির মাটি কেটে কেনা-বেচার অবৈধ কারবার নিয়ে গ্রামে গ্রামে বিরোধে জড়িয়ে পড়েছে সরকারি দল বিএনপির অঙ্গ সংগঠনের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। ফলে জেলার কোনো না কোনো এলাকায় প্রায়ই সংঘাত-সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। প্রতিপক্ষের উপর হামলা, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া এমনকি খুনের ঘটনায় বিভিন্ন এলাকায় বিরোধ তুঙ্গে উঠেছে। শুধু তাই নয়, সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাটি কাটায় একদিকে যেমন ফসলি জমির উর্বরতা কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে গ্রামীণ রাস্তাঘাটও নষ্ট হচ্ছে। এ বিষয়ে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যসহ দলীয় নেতারা কঠোর হুঁশিয়ারি দিলেও নেতা-কর্মীরা তা মানছেন না।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১২ মার্চ ছাগলনাইয়া উপজেলার পাঠাননগর ইউনিয়নের পূর্ব শিলুয়া এলাকায় কন্ট্রাক্টর মসজিদ সংলগ্ন কৃষি জমির মাটি কাটাকে কেন্দ্র করে দুইপক্ষের সংঘর্ষে যুবদলকর্মী আবু আহমদ নিহত হন। একই সময় নিহতের ভাই নুরুল আলম ও প্রতিবেশী আলাউদ্দিন আহত হয়। ওই ঘটনায় ছাত্রদল যুবদলের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়েছেন।
অন্য ঘটনায়, সদর উপজেলার শর্শদি ইউনিয়নের ফতেহপুর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাটির ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের একাধিক পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলে আসছিল। বৃহস্পতিবার রাতে একটি ইটভাটার জন্য মাটি পরিবহনের সময় কয়েকটি গাড়ি আটকে দেয় একটি পক্ষ। গাড়ি আটকে দেয়ার বিষয়ে তাদের সাথে ফেনী আলিয়া মাদরাসা ছাত্রদল সভাপতি সাইফুদ্দিন শিবলু ও তার সমর্থকদের বাগ্বিতণ্ডা হয়। এ ঘটনার রেশে ২ এপ্রিল শিবলুর দুটি বসতঘর আগুনে পুড়িয়ে দেয় প্রতিপক্ষ যুবদলের নেতা-কর্মীরা। এ ঘটনায় যুবদল নেতা জাফর আহমদ মানিককে দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। এ নিয়ে এলাকায় এখনো উত্তেজনা বিরাজ করছে।
এছাড়া, গত সপ্তাহে দাগনভূঞা উপজেলার পূর্বচন্দ্রপুর ইউনিয়নের নয়নপুর গ্রামে যুবদল নেতা নিজাম উদ্দিন হুদনের মাটিকাটার এস্কেভেটর ও ট্রাক্টর প্রতিপক্ষ গ্রুপের লোকজন নিয়ে যায়। একই উপজেলার ইয়াকুবপুর ইউনিয়নের বরইয়া এলাকায় বিএনপি নেতাকর্মীদের দুইপক্ষের সংঘর্ষ হয়। এসময় বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। হামলার জন্য জেলা ছাত্রদলের বহিষ্কৃত সহ-সভাপতি জামশেদুর রহমান ফটিক ও তার অনুসারীদের দায়ী করা হয়।
অন্যদিকে, সোনাগাজীতে অবৈধভাবে সরকারি খাস জমি ও নদীর পাড় দখল করে মাছের খামার করতে পুকুর খননের অভিযোগে স্থানীয় ইউনিয়ন যুবদলের সদস্য এনামুল হক শাহীনের তিনটি এক্সেভেটর জব্দ করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। পরে সেগুলো অকেজো করে দেয়া হয়।
এদিকে, সদর উপজেলার পাঁচগাছিয়া ইউনিয়নের ইলাশপুরে মাটি কাটাকে কেন্দ্র করে দুই ছাত্রদল নেতার চাঁদাবাজির ফোনালাপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অডিওতে নাছির মেমোরিয়াল কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইফতেখার তাহাদ ইফতুর কাছে মাটির কারবার নিয়ে ফেনী সরকারি কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি নোমানুল হককে চাঁদা দাবি করতে শোনা যায়। এ ঘটনায় নোমানকে ছাত্রদল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
দলীয় সূত্র জানায়, কৃষি জমির মাটিকাটা বন্ধে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু ও ফেনী-১ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল আলম মজনু কঠোর অবস্থান নেন। তবে, ছাত্রদল ও যুবদলের নেতা-কর্মীরা দলের নির্দেশনা না মেনে রাতের আঁধারে এস্কেভেটর দিয়ে মাটি কেটে বিক্রি করেন।
দাগনভূঞা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো: আকবর হোসেন বলেন, ‘পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রীসহ দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা ফসলি জমির মাটি কাটার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে থাকলেও এক শ্রেণির সুবিধাবাদী নেতা-কর্মীরা প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে রাতের আঁধারে দেদারসে মাটি কাটছে। বিভিন্ন স্থান থেকে ভুক্তভোগীরা নানা অভিযোগ করেও ফল পাচ্ছেন না।’
জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আলাল উদ্দিন আলাল বলেন, ‘কোনো নেতা-কর্মী অপরাধে জড়িয়ে পড়লে এ দায়ভার তার নিজেই নিতে হবে। এক্ষেত্রে ফসলি জমির মাটি বেচা-কেনা বন্ধে জমির মালিক ও ক্রেতাকে আইনের আওতায় আনার বিষয়ে জেলা প্রশাসন যে ঘোষণা দিয়েছে, তা কার্যকর করা হবে।’



