২০২৬ সালের ১২ এপ্রিল, আওয়ামী লীগ শাসনামলের সাবেক স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীকে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান চলাকালীন সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগে দায়ের করা একটি ফৌজদারি মামলায় ম্যাজিস্ট্রেট আদালত জামিন দিয়েছেন। ড. শারমিনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত এ অভিযোগগুলো কেবল অসার নয়, বরং হাস্যকর এবং সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলে অসংখ্য ব্যক্তি ও গোষ্ঠী এ শাসনের সহযোগী বা অংশীদার ছিল; যাদের মধ্যে প্রভাবশালী রাজনীতিক থেকে শুরু করে দক্ষ কর্মকর্তা ও সুপরিচিত পেশাজীবীরাও আছেন। কিন্তু কেবল আওয়ামী লীগের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকা মানে ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টের শেষ দিনগুলোতে ঘটে যাওয়া সেই ভয়াবহ অপরাধগুলোতে অংশ নেয়া নয়।
অভ্যুত্থানের পূর্ব পর্যন্ত জনমনে এ ধারণা বদ্ধমূল ছিল যে, আওয়ামী লীগ সরকার আরো অনেক দিন ক্ষমতায় থাকছে। এ সরকারের দ্রুত পতনের পেছনে প্রধান ভূমিকা ছিল সেনাবাহিনীর; তারা নিজ দেশের মানুষের ওপর গুলি না চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যাশা অনুযায়ী সেনাবাহিনী যদি সে দিন দমনে অংশ নিতো, তবে হয়তো ক্ষমতার সমীকরণ আজ ভিন্ন হতো। তিনি তার মসনদ ধরে রাখতে পারতেন হয়তোবা। কিন্তু তার ফল হতো ভয়াবহ; রাজপথে অগণিত ছাত্র-জনতার লাশের স্তূপ হতো। দেশ এক অন্ধকার স্বৈরশাসনের অধীনে থেকে যেত।
চব্বিশে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ছিল এক আকস্মিক বিপর্যয়, যা খোদ নিজ দলের অনেককেও স্তম্ভিত করে দিয়েছিল। যারা কেবল বৈষয়িক সুবিধা বা ব্যক্তিগত স্বার্থে এ শাসনের সহযোগী হয়েছিলেন। দলের দাপটকে অপরাজেয় মনে করতেন, তারা এ নাটকীয় পতনে মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না। ক্ষমতার পালাবদলের পর এক অস্বস্তিকর প্রবণতা আমাদের সামনে এসেছে; তা হলো, স্রেফ সান্নিধ্য বা সংসর্গে কারো উপর দায়ভার বা অপরাধ চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা। জুলাইয়ের ঘটনায় ড. শারমিনের সরাসরি কোনো ভূমিকা ছিল এমন কোনো পরিষ্কার প্রমাণ মেলেনি, কিন্তু সাবেক স্পিকার হিসেবে তার পদমর্যাদা ও ক্ষমতা বলয়ের খুব কাছে থাকা যেন তাকে অপরাধীর তকমা দিতে যথেষ্ট বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু মনে রাখা জরুরি, বাংলাদেশের প্রচলিত ফৌজদারি আইন অনুযায়ী অপরাধ প্রমাণে সুনির্দিষ্ট কর্মকাণ্ডের প্রয়োজন, স্রেফ ‘সংসর্গজনিত অপরাধের’ বা (গিল্ট বাই অ্যাসোসিয়েশন) কারণে কাউকে দোষী করা আইনত অসম্ভব। অথচ যে ‘সংসর্গজনিত অপরাধের’ ধারণা আমাদের প্রচলিত আইনে নেই, সেটিই জামায়াত নেতাদের বিচার ও ফাঁসি নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। সেই বিশেষ আইনি তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে তখন অনেক দণ্ডাদেশ দেয়া হয়েছিল। ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে আমরা যে ধরপাকড়গুলো দেখছি, তার ওপর মূলত অতীতের সেই বিতর্কিত আইনি সংস্কৃতির এক ছায়া লক্ষ করা যাচ্ছে।
শেখ হাসিনা শাসনের পতনের পর যে ধরপাকড় শুরু হয়, তার পরিধি কেবল মন্ত্রিসভা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে আবদ্ধ থাকেনি। আরো বিস্তৃত হয়ে পড়েছিল। খবর আসতে শুরু করে, কেবল রাজনীতিবিদরাই নন, বরং সেই ব্যবস্থার সান্নিধ্যে থাকা টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব, আইনজীবী এবং সংসদ-সদস্যদেরও একে একে নিরাপত্তা হেফাজতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এ গ্রেফতারি অভিযান কেবল সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী বা সরাসরি মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; জনপরিসরের বৃহত্তর বলয়েও বিস্তৃত হয়েছিল; যারা রাজনৈতিক বা প্রকাশ্যভাবে তৎকালীন সরকারের অনুসারী ছিলেন।
জুলাই আন্দোলনের বিরোধিতায় সরব অভিনেত্রী শমী কায়সারকে চব্বিশের নভেম্বরে গ্রেফতার করা হয়। পক্ষান্তরে, সাবেক স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময়জুড়ে সামরিক সুরক্ষায় ছিলেন বলে খবর পাওয়া যায়। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি যখন নিজের বাসভবনে ফিরে আসেন, ঠিক তখন তাকে গ্রেফতার করা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি জামিন পেতে সক্ষম হন; যা একই ধরনের অভিযোগে অভিযুক্ত অনেকের কাছে এখনো অধরা রয়ে গেছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সাথে ড. শারমিনের প্রধান সংশ্লিষ্টতা ছিল জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে। তার এই দায়িত্বকাল এমন এক সময়ে ছিল, যা দাফতরিকভাবে অগণতান্ত্রিক ঘোষিত না হলেও, গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছিল। এ অভিযোগগুলোর মধ্যে ছিল গুমের মতো ভয়াবহ ঘটনা, শাপলা চত্বরের রক্তাক্ত অভিযান এবং সর্বশেষ চব্বিশের বিপ্লব নস্যাৎ করতে গিয়ে সাধারণ নাগরিক ও ছাত্রদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে প্রাণহানি ঘটানোর মতো বিষয়গুলো। তা সত্ত্বেও, এ ঘটনাবলির কোনোটিতে তার প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা ছিল বলে কোনো স্পষ্ট প্রমাণ মেলেনি। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে যে প্রবণতাটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তা হলো, সাবেক শাসনামলের কাছাকাছি থাকা যে কাউকে ফৌজদারিভাবে দায়ী বলে গণ্য করা হচ্ছে।
চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থান চলাকালীন সংঘটিত অপরাধগুলোর ভয়াবহতা বিবেচনায় নিলে দেখা যায়, এ মামলাগুলোর একটি বড় অংশ শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর অধীনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারিক প্রক্রিয়ার সম্মুখীন হতে পারে। তবে আগে যেমনটি উল্লেখ করা হয়েছে, শমী কায়সার বা শিরীন শারমিন চৌধুরীর মতো ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে একমাত্র দৃশ্যমান অভিযোগ হলো, তারা আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ ছিলেন কিংবা কোনো না কোনোভাবে সেই শাসনের সাথে যুক্ত ছিলেন। সমস্যার মূল জায়গাটি হলো, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল যেভাবে ‘যৌথ অপরাধমূলক উদ্যোগ’ (জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজ) তত্ত্বটির ব্যাখ্যা এবং প্রয়োগ ঘটিয়েছে। বেশ কিছু ক্ষেত্রে ‘অপরাধমূলক সংসর্গ’ বা ‘অপরাধমূলক সম্পৃক্ততা’র মতো পরিভাষাগুলো এমনভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে, যা থেকে মনে হয় যে, অপরাধের মূল হোতাদের সাথে কেবল পরিচয়ের সূত্র থাকাই সাজা পেতে যথেষ্ট। বিচারের এই পদ্ধতি বড় ধরনের ত্রুটিপূর্ণ। এটি বাংলাদেশের প্রচলিত ফৌজদারি আইনের মৌলিক নীতিমালা যেমন ক্ষুণ্ন করে, তেমনি আন্তর্জাতিক আইনি মানদণ্ডের সাথেও সাংঘর্ষিক। আন্তর্জাতিক আইনের প্রথিতযশা পণ্ডিত প্রফেসর কুইন্সি রাইট ১৯৪৯ সালে ‘আমেরিকান জার্নাল অফ ইন্টারন্যাশনাল ল’-তে উল্লেখ করেছিলেন ‘সংসর্গজনিত অপরাধ’র ধারণাটি আদিম আইনি ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য। আইনের শাসন দ্বারা পরিচালিত কোনো আধুনিক ব্যবস্থার নয়। অথচ বাংলাদেশ বর্তমানে ফৌজদারি দায়বদ্ধতার অত্যন্ত আদিম একটি রূপ প্রয়োগ করছে বলে প্রতীয়মান হয়।
লর্ড ডেনিং তার ‘ফ্রিডম আন্ডার দ্য ল’ গ্রন্থে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে ‘সংসর্গজনিত অপরাধ’কে স্বীকৃতি দেয় এমন আইনি ব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি সোভিয়েত দণ্ডবিধির ৭ নম্বর অনুচ্ছেদটি উদ্ধৃত করেন, যেখানে এমন ব্যক্তিদের আটকে রাখার বিধান ছিল; যারা ‘তাদের বিপজ্জনক সংসর্গের কারণে সমাজের জন্য বিপজ্জনক’ হিসেবে গণ্য হতেন। উত্তর কোরিয়া আজো ‘ইয়ানজু’ নামের একটি অগ্রহণযোগ্য ‘সংসর্গজনিত অপরাধ’ নীতি অনুসরণ করে, যেখানে পরিবারের কোনো এক সদস্যের অপরাধে তার পুরো পরিবারকে শাস্তি দেয়া হয়। অথচ আধুনিক আইনি ব্যবস্থা এই ‘সংসর্গজনিত অপরাধ’র ধারণা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে। বর্তমান বিশ্বে অপরাধের দায়ভার নিরূপিত হয় অভিযুক্তের সেই মানসিক অবস্থার নিরিখে, যা প্রমাণ করে যে, তিনি সচেতনভাবে আইন ভঙ্গ করতে চেয়েছিলেন। এই মৌলিক নীতি থেকে সরে আসার মানে হলো, ‘সংসর্গজনিত অপরাধ’র মতো বিতর্কিত ধারণার দিকে ধাবিত হওয়া; যেখানে ব্যক্তির কর্ম নয়, বরং তার পরিচয় দণ্ডের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কর্নেল ল স্কুলের ডিন প্রফেসর ওহ্লিন এই সামাজিক মানসিকতাটি চিহ্নিত করেছেন যে, কোনো গোষ্ঠী যখন আমাদের সাহায্য করে তখন আমরা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ করি। যখন তারা কোনো অন্যায় করে তখন সেই পুরো গোষ্ঠীর প্রতি আমাদের তীব্র ক্ষোভ বা বিদ্বেষ তৈরি হয়। আমাদের প্রশংসা কিংবা ক্ষোভ, উভয় সাধারণত কোনো গোষ্ঠীর প্রতি ধাবিত হয়। তবে ফৌজদারি দায়বদ্ধতা একান্তই ব্যক্তির বিষয়, কোনো গোষ্ঠীর নয়; এবং এ দণ্ড কেবল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ভোগ করতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশের আইনি ব্যবস্থা সব সময় এ পার্থক্য বজায় রাখতে সফল হয়নি।
এই বিচারিক দর্শনের নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশে আব্দুল কাদের মোল্লার মামলার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেখানে ব্যক্তিগত সুনির্দিষ্ট অপরাধের চেয়েও বিহারি সম্প্রদায়ের সাথে তার কথিত ঘনিষ্ঠতা বা সংশ্লিষ্টতাকে অপরাধের মাপকাঠি হিসেবে বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়েছিল, যার ফলে তিনি ‘সংসর্গজনিত অপরাধে’র শিকার হন। ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণে একজন বাঙালি নাগরিকের ‘বিহারি হাঙ্গামাকারীদের’ সাথে মেলামেশার বিষয়টি বিশেষভাবে সামনে আনা হয়। আদালত প্রশ্ন তোলেন, কেন তিনি ২৫ মার্চের আগে থেকে তাদের সাথে এ ‘অপরাধীসুলভ সখ্যতা’ বজায় রেখেছিলেন, যা শেষ পর্যন্ত তাকে দোষী সাব্যস্ত করতে বড় ভূমিকা পালন করে। এর অন্তর্নিহিত অর্থ ছিল এই যে, এমন সংসর্গ বা মেলামেশা নিজেই অপরাধের প্রমাণ হিসেবে গণ্য হতে পারে। একইভাবে, বেশ কিছু মামলায় ট্রাইব্যুনাল ১৯৭১ সালে ইসলামী ছাত্র সঙ্ঘের সদস্যপদ বা সংশ্লিষ্টতাকে অপরাধের দায়বদ্ধতা প্রমাণে যথেষ্ট বলে গণ্য করেছে। এর ভিত্তি ছিল এ যুক্তি যে, ওই সংগঠনের কিছু সদস্য পরে আল-বদর বাহিনীতে যোগ দিয়েছিল। বাস্তবে, সংগঠনের সদস্য হওয়া যখন দোষী সাব্যস্ত করার মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়, তখন অপরাধের সাথে অভিযুক্তের কায়িক বা সুনির্দিষ্ট কোনো যোগসূত্র প্রমাণের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়। বিচারের এ ধারা অভিযুক্তের ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতাকে আড়াল করে দেয়; এখানে ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে কী করেছেন, তার চেয়েও তিনি কাদের সাথে যুক্ত ছিলেন, সেই বিষয়ই প্রধান হয়ে ওঠে। এটি হলো ‘সংসর্গজনিত অপরাধ’ বা সংশ্লিষ্টতায় দোষী সাব্যস্ত করার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
একই যুক্তি এখন ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর মামলার মতো ক্ষেত্রেও কাজ করছে বলে মনে হচ্ছে; যেখানে আওয়ামী লীগের সাথে তার সংশ্লিষ্টতাকে দলটির শীর্ষ নেতাদের সংঘটিত অপরাধে তার ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততা হিসেবে গণ্য করার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবং হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নিবন্ধিত কৌঁসুলি



