অভিন্ন নদীতে বাঁধ : পানি রাজনীতির আড়ালে পরিবেশ যুদ্ধ

বাংলাদেশের নদীগুলো কেবল পানি নয়; এটি এ দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের অংশ। এ নদীগুলো বাঁচাতে হলে শুধু প্রতিবাদ নয়, প্রয়োজন কৌশল, কূটনীতি এবং দৃঢ় জাতীয় অবস্থান। অন্যথায়, একদিন হয়তো নদীমাতৃক বাংলাদেশের পরিচয় ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে।

বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ- এ পরিচয় আজ ক্রমে প্রশ্নের মুখে। একসময় যে নদীগুলো এ ভূখণ্ডকে জীবন, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির ধারক হিসেবে বয়ে নিয়েছিল, সেগুলো আজ ধুঁকছে। এর বড় একটি কারণ ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহার ও উজানে বাঁধ নির্মাণ। ফলে প্রশ্ন উঠছে- এটি কি কেবল উন্নয়ন প্রকল্প, নাকি এক ধরনের ‘পানি আগ্রাসন’ বা নীরব পরিবেশ যুদ্ধ?

বাংলাদেশের মোট ২৫৪টি আন্তর্জাতিক নদীর মধ্যে প্রায় ২৫০টি ভারতের ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ, বাংলাদেশের নদীগুলোর প্রাণ কার্যত ভারতের হাতে বন্দী। উজানে ভারত যখন খুশি পানি আটকে দিতে পারে, আবার প্রয়োজনে ছেড়েও দিতে পারে- যা ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ। এই অসম নির্ভরশীলতা দুই দেশের সম্পর্কের এক জটিল বাস্তবতা তৈরি করেছে।

সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ হলো ফারাক্কা বাঁধ। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হতে যাচ্ছে। এ চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগ মুহূর্তে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে : এটি কি শুধু নবায়ন হবে, নাকি এর একটি মৌলিক পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন?

গঙ্গা নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে ফারাক্কা বাঁধ বহু দিন ধরে বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের কারণ। ১৯৯৬ সালের চুক্তি এ উদ্বেগ আংশিকভাবে প্রশমিত করলেও, তা কখনো স্থায়ী সমাধান দিতে পারেনি। বরং সময়ের সাথে সাথে এর সীমাবদ্ধতাগুলো আরো স্পষ্ট হয়েছে- বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায়।

চুক্তির মূল কাঠামো ছিল পানির একটি নির্দিষ্ট ভাগাভাগি ব্যবস্থা, যা ১০ দিনের ভিত্তিতে প্রবাহ নির্ধারণ করে। কিন্তু বড় সমস্যা ছিল- এতে কোনো কার্যকর ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ ছিল না। অর্থাৎ, উজানে পানিপ্রবাহ কমে গেলে বাংলাদেশ কতটুকু পানি নিশ্চিতভাবে পাবে, তার স্পষ্ট নিশ্চয়তা ছিল না। ফলে বাস্তবে বাংলাদেশ প্রায়ই প্রত্যাশিত হিস্যা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

২০২৬ সালের প্রাক্কালে বাংলাদেশের অবস্থান আগের তুলনায় আরো দৃঢ়। এবার শুধু চুক্তি নবায়ন নয়, বরং একটি ন্যায্য ও বাধ্যতামূলক কাঠামো প্রতিষ্ঠার দাবি উঠেছে। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকরা চাইছেন- নতুন চুক্তিতে এমন একটি গ্যারান্টি ক্লজ যুক্ত হোক, যা শুষ্ক মৌসুমেও ন্যূনতম পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করবে। কারণ গঙ্গার পানি শুধু একটি নদীর প্রবাহ নয়; এটি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন ও পরিবেশের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত।

বর্তমান বাস্তবতা আরো জটিল। ভারতে কেন্দ্রীয় সরকার ছাড়াও প্রাদেশিক রাজনীতি- বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ এ ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অতীতে যেমন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তিস্তা চুক্তি আটকে দিয়েছিলেন, তেমনি গঙ্গা চুক্তির ক্ষেত্রেও আঞ্চলিক রাজনীতি প্রভাব ফেলতে পারে। চুক্তি নবায়নের প্রক্রিয়ায় যৌথ নদী কমিশন (জেআরসি) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কারিগরি ও সচিবপর্যায়ের বৈঠক ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে মন্ত্রীপর্যায়ের বৈঠকের সম্ভাবনা আছে। তবে আলোচনার অগ্রগতি নির্ভর করছে দুই দেশের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কৌশলগত অগ্রাধিকারের ওপর।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো- যদি ১২ ডিসেম্বর ২০২৬-এর আগে নতুন চুক্তি না হয়, তাহলে একটি আইনি শূন্যতা তৈরি হবে। সেই ক্ষেত্রে ভারত পানি ভাগাভাগি করতে বাধ্য থাকবে না। এটি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুতর সঙ্কট ডেকে আনতে পারে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে যখন পানির প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে। নদীর তলদেশ ভরাট হয়। নাব্যতা কমে যায়। এর সাথে সাথে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণবৈচিত্র্য ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়ে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রের সঙ্কট- এসবের পেছনেও ফারাক্কার প্রভাব স্পষ্ট।

বাংলাদেশ-ভারত আন্তঃদেশীয় নদী রাজনীতির আরেকটি স্পর্শকাতর অধ্যায় হলো টিপাইমুখ বাঁধ। বহু বছর ধরে আলোচনায় থাকা প্রকল্পটি কেবল একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নয়; বরং এটি দুই দেশের মধ্যে আস্থা, পরিবেশ নিরাপত্তা এবং পানির ন্যায্য বণ্টন নিয়ে বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

ভারতের মনিপুর রাজ্যের চুরাচাঁদপুর জেলায় বরাক ও তুইভাই নদীর মিলনস্থলের কাছে প্রস্তাবিত এ বাঁধ মূলত ১৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে নেয়া হয়েছে। কাগজে-কলমে এটি একটি উন্নয়ন প্রকল্প হলেও, বাস্তবে এর প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পড়তে পারে- যা এ প্রকল্পকে একটি আন্তর্জাতিক ইস্যুতে পরিণত করেছে।

এ প্রকল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বরাক নদী, যা বাংলাদেশে প্রবেশ করে সুরমা নদী ও কুশিয়ারা নদী নামে বিভক্ত হয়েছে। এ দুটি নদী সিলেট অঞ্চলের কৃষি, মৎস্য এবং সামগ্রিক পরিবেশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে উজানে যেকোনো বড় ধরনের হস্তক্ষেপ সরাসরি ভাটির এ অঞ্চলের জীবনে প্রভাব ফেলবে।

বাংলাদেশের প্রধান উদ্বেগ দুটি স্তরে- প্রবাহ ও পরিবেশ। প্রথমত, বাঁধ নির্মাণে শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ কমে যেতে পারে। এতে সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকায় পানির ঘাটতি দেখা দেবে, যা কৃষি উৎপাদন ও প্রাণবৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। দ্বিতীয়ত, আকস্মিকভাবে পানি ছেড়ে দিলে বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে, যা উত্তর-পূর্বাঞ্চলে একটি বড় হুমকি।

তবে এ প্রকল্প শুধু বাংলাদেশে নয়, ভারতের অভ্যন্তরেও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। মনিপুর ও আসাম অঞ্চলের অনেক পরিবেশবাদী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীও এ বাঁধের বিরোধিতা করেছে। তাদের আশঙ্কা- এটি ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। সেই সাথে স্থানীয় পরিবেশ ও জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

ভারত সরকার অবশ্য বারবার আশ্বাস দিয়েছে, এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়া হবে না, যা বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু বাস্তবতা হলো- এ আশ্বাসগুলো এখনো কোনো বাধ্যতামূলক চুক্তি বা গ্যারান্টির মাধ্যমে নিশ্চিত হয়নি। ফলে আস্থার সঙ্কট থেকে যাচ্ছে।

২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে এ ইস্যু আবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকরা এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি সতর্ক অবস্থানে আছেন। জাতীয় সংসদের শীর্ষপর্যায় থেকেও এ প্রকল্পকে সম্ভাব্য ‘দুর্যোগ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা সরকারের অবস্থান আরো স্পষ্ট করে।

এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের করণীয় কী হতে পারে? প্রথমত, টিপাইমুখ প্রকল্পের বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ যৌথ পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন দাবি করা জরুরি। এতে দুই দেশের বিশেষজ্ঞরা অংশ নিলে প্রকৃত ঝুঁকি ও সম্ভাবনা সম্পর্কে একটি নিরপেক্ষ চিত্র পাওয়া যাবে। দ্বিতীয়ত, এ প্রকল্পকে একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় আনতে হবে; যেখানে পানিপ্রবাহ, বন্যা ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়ে স্পষ্ট গ্যারান্টি থাকবে। শুধু মৌখিক আশ্বাসে এ ধরনের বড় প্রকল্পের ঝুঁকি মোকাবেলা সম্ভব নয়। তৃতীয়ত, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ফোরামে বিষয়টি তুলে ধরা যেতে পারে। কারণ, আন্তঃদেশীয় নদী ব্যবস্থাপনা একটি আন্তর্জাতিক ইস্যু। এ জন্য আন্তর্জাতিক নীতিমালা ও মানদণ্ড আছে। সবশেষে, টিপাইমুখ বাঁধকে কেবল একটি প্রকল্প হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে একটি বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতিফলন, যেখানে উজান ও ভাটির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য, আস্থা এবং ন্যায্যতার প্রশ্ন জড়িয়ে আছে।

তিস্তা চুক্তি নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তা চলছে। মনমোহন সিংয়ের আমলে ২০১১ সালে এ চুক্তি হওয়ার কথা ছিল। তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তিতে তা আর বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃদেশীয় নদী চুক্তি আজো ঝুলে আছে। তিস্তা নদী বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রাণ। নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রামসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চল এ নদীর ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শুষ্ক মৌসুমে এ নদী প্রায় মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে। নদীর বুকজুড়ে বালুচর, পানির অভাবে কৃষকের হাহাকার, এ যেন এক নীরব দুর্যোগ।

এ সঙ্কটের মূল কারণ তিস্তা চুক্তির অনিশ্চয়তা। ১৯৮৩ সালে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতায় বাংলাদেশের জন্য ৩৬ শতাংশ এবং ভারতের জন্য ৩৯ শতাংশ পানি বরাদ্দের প্রস্তাব ছিল। কিন্তু তা কখনো কার্যকর হয়নি। পরবর্তীতে ২০১১ সালে একটি খসড়া চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত হলেও পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক আপত্তির কারণে বাস্তবায়ন হয়নি। বিশেষ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতা এ চুক্তি থামিয়ে দেয়।

ফলে বাস্তবে যা ঘটছে তা হলো- ভারত উজানে পানি প্রত্যাহার করছে। আর বাংলাদেশ শুষ্ক মৌসুমে পানির ভয়াবহ সঙ্কটে পড়ছে। এতে শুধু কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বাড়ছে। নদীর নাব্যতা কমছে। একই সাথে পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।

এ অচলাবস্থার মধ্যে সামনে এসেছে ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’। চীনের সহায়তায় প্রস্তাবিত তিস্তা প্রকল্প মূলত একটি সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা উদ্যোগ। এর আওতায় নদী খনন, বাঁধ নির্মাণ, ভূমি পুনরুদ্ধার এবং সেচ ও নৌপথ উন্নয়নের মতো বড় বড় পদক্ষেপ নেয়ার পরিকল্পনা আছে।

প্রকল্প অনুযায়ী, প্রায় ১৪০ মিলিয়ন ঘনমিটার ড্রেজিং, দুই তীরে ১০৮ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ এবং প্রায় ১৭১ বর্গকিলোমিটার ভূমি পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর লক্ষ্য শুধু নদী পুনরুজ্জীবিত করা নয়; বরং বন্যা ও নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণ, শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রাপ্যতা বৃদ্ধি এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা।

এ প্রকল্প ঘিরে উত্তরবঙ্গের মানুষের মধ্যে এক ধরনের আশা তৈরি হয়েছে। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে তারা নদীভাঙন, বন্যা ও পানি সঙ্কটের সাথে লড়াই করে আসছে। যদি এ প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে এটি ওই অঞ্চলের অর্থনীতি ও জীবন-জীবিকায় একটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে- এ মহাপরিকল্পনা কি তিস্তা সমস্যার স্থায়ী সমাধান? উত্তরটি এতটা সরল নয়।

প্রথমত, তিস্তা নদী একটি আন্তঃদেশীয় নদী। এর উজানে যদি পর্যাপ্ত পানি না আসে, তাহলে ভাটিতে যত উন্নয়ন প্রকল্প নেয়া হোক না কেন, তা টেকসই হওয়া নিয়ে সন্দেহ-সংশয় থেকে যায়। অর্থাৎ, তিস্তা চুক্তি ছাড়া মহাপরিকল্পনা একটি অসম্পূর্ণ সমাধান হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, এ প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা একটি নতুন ভূরাজনৈতিক মাত্রা যোগ করেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় চীন-ভারত প্রতিদ্বন্দ্বিতা একটি বাস্তবতা এবং তিস্তা প্রকল্প সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হয়ে উঠতে পারে। ফলে এটি শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়, বরং একটি কৌশলগত ইস্যু হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- তিস্তা চুক্তি ও মহাপরিকল্পনা পরস্পরের বিকল্প হিসেবে দেখা কতটুকু ঠিক তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। বরং এ দুটি সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে। একদিকে ভারতের সাথে ন্যায্য পানি বণ্টনে কূটনৈতিক চাপ বাড়াতে হবে, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে নদী-ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে।

বাংলাদেশের পানি সঙ্কট শুধু ভারতের কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক বাস্তবতার অংশ। যেমন, চীন উজান নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেয়ায় ভারত এখন ব্রহ্মপুত্র নদ নিয়ে উদ্বিগ্ন। এর উজানে চীন বাঁধ নির্মাণ করছে; যা ভারতে একই ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। যেমনটি ভারতের কারণে বাংলাদেশ ভোগ করছে। অর্থাৎ, উজান-ভাটির এ রাজনীতি একটি ‘ডমিনো এফেক্ট’ তৈরি করছে।

বাংলাদেশে পানি সঙ্কট নতুন নয়। মওলানা ভাসানী ফারাক্কা বাঁধের বিরোধিতায় আন্দোলন করেছিলেন। পরে জিয়াউর রহমান বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উত্থাপন করেছিলেন। জাতিসঙ্ঘে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমাধান এখনো অধরাই রয়ে গেছে।

বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে কয়েকটি করণীয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ক. নদীগুলোর পানিপ্রবাহের ওপর শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কা, তিস্তা, টিপাইমুখ ও ফেনী নদীর পানিপ্রবাহ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। তথ্যভিত্তিক কূটনীতি ছাড়া এ সঙ্কট মোকাবেলা করা সম্ভব নয়।

খ. প্রয়োজনে বিষয়টি আন্তর্জাতিক পরিসরে জোরালোভাবে উত্থাপন করতে হবে। জাতিসঙ্ঘ, আন্তর্জাতিক আদালত বা আঞ্চলিক ফোরাম- যেখানে প্রয়োজন, সেখানে বাংলাদেশের ন্যায্য দাবি তুলে ধরতে হবে। কারণ, এটি কেবল দ্বিপক্ষীয় ইস্যু নয়, এটি একটি মানবিক ও পরিবেশগত সঙ্কট।

গ. অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐক্য অপরিহার্য। পানি ইস্যুতে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কোনো ধরনের দলীয় বা পররাষ্ট্রনির্ভর অবস্থান এ সঙ্কটকে আরো জটিল করে তুলতে পারে।

সবশেষে, ভারতকেও বুঝতে হবে- একটি বড় রাষ্ট্র হিসেবে তার দায়িত্বও বড়। প্রতিবেশী দেশের স্বার্থ উপেক্ষা করে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। আন্তঃদেশীয় নদী কখনো একক দেশের সম্পদ হতে পারে না; এটি একটি যৌথ সম্পদ, যার ব্যবস্থাপনায় পারস্পরিক আস্থা ও ন্যায্যতা জরুরি।

বাংলাদেশের নদীগুলো কেবল পানি নয়; এটি এ দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের অংশ। এ নদীগুলো বাঁচাতে হলে শুধু প্রতিবাদ নয়, প্রয়োজন কৌশল, কূটনীতি এবং দৃঢ় জাতীয় অবস্থান। অন্যথায়, একদিন হয়তো নদীমাতৃক বাংলাদেশের পরিচয় ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক