মধুসূদনের মেঘনাদবধ কাব্যের পরিচিত পঙ্ক্তি, ‘এতক্ষণে অরিন্দম কহিলা বিষাদে। জানিনু কেমনে আসি লক্ষ্মণ পশিল রক্ষঃপুরে!’ পঙ্ক্তিটি এখন তেলের জন্য লাইনে অপেক্ষমান মানুষের দীর্ঘশ্বাসের সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অরিন্দম মানে ‘অরি’ বা শত্রুকে যে জয় করে। কাব্যে অরিন্দম হলো লঙ্কার রাজপুত্র মেঘনাদ। তিনি যখন দেখলেন তার আপন কাকা বিভীষণ পূজার ঘরে দাঁড়িয়ে শত্রুকে পথ দেখাচ্ছেন, অবাক হলেন। বিষাদে তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে। মেঘনাদ বুঝতে পারেন, বাইরের শত্রুর চেয়ে ঘরের বিভীষণ বেশি ভয়ঙ্কর।
আমাদের অরিন্দম বা মেঘনাদ হলো তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষেরা। দারিদ্র্য আর অভাবের শত্রুকে জয় করে টিকে থাকতে চান তারা। কিন্তু এই টিকে থাকার লড়াইয়েও তাদের সামনে শত্রু হিসেবে দাঁড়িয়ে যায় ‘বিভীষণ’দের কারসাজি। রক্ষঃপুর বা রাক্ষসপুরী লঙ্কার সেই রাজকীয় বিষাদ এখন নাগরিক জীবনের যন্ত্রণার রূপক।
ইরানের ওপর হামলা করেছে আমেরিকা ও ইসরাইল। যুদ্ধ লেগেছে মধ্যপ্রাচ্যে। এর প্রভাব এখানে পড়বে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই প্রভাবে আমরা কাত হইনি, কাত হয়ে যাচ্ছি বিভীষণদের তেলেসমাতিতে! আমরা জানতাম শত্রু বাইরে; কিন্তু দেখা যাচ্ছে শত্রু লুকিয়ে আছে ঘরের ভেতর। এখন তেলের খনি পাওয়া যাচ্ছে রাজনীতিবিদের গোয়ালঘরে, পানির ট্যাংকে। আর পাম্পের সামনে মাইলের পর মাইল লাইনে দাঁড়িয়ে মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস উঠছে। সংবাদমাধ্যমে উঠে আসছে এসব খবরÑ
গত বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর আসাদগেটের এক ফিলিং স্টেশনের সামনে মোটরসাইকেল লাইনে রেখে লুডু খেলছিলেন চার যুবক। খাইরুল নামের এক যুবক জানান, তিনি লাইনে আছেন ভোর ৪টা থেকে। সিরিয়াল ছেড়ে দিলেই হাজার বাইকের পেছনে পড়তে হবে। তাই রাত-দিন এক করে সেখানেই আস্তানা গেড়েছেন। রোদে পুড়ে, ঘামে ভিজে দাঁড়িয়ে থাকার কষ্টও হারিয়ে ফেলেছেন তারা।
অথচ আমাদের তেল আছে। সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা সে কথা বুক ফুলিয়ে বলছেনও। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম অভয় দিয়ে বলেছেন, ‘তেল নিয়ে আতঙ্কের কারণ নেই। দেশে তেলের মজুদ ও সরবরাহ স্বাভাবিক।’ কিন্তু আতঙ্ক তো তেলের অভাব নিয়ে নয়, ‘তেলেসমাতি’ নিয়ে। তেল কি কর্পূরের মতো কোথাও উবে যাচ্ছে? না, তা নয়। তেল আসলে ‘গুপ্তধন’ হয়ে গেছে। কুড়িগ্রামের রৌমারীর এক বিএনপি নেতার গোয়ালঘরে গরু-বাছুর পাওয়া যায়নি, পাওয়া গেছে ড্রামভর্তি পেট্রল। তিনি লিটার-প্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা দরে তেল বিক্রি করছিলেন। গত ২৮ মার্চ ভ্রাম্যমাণ আদালত উদ্ধার করেছে সেই তেলের খনি!
একই রকম তেলেসমাতি দেখা গেছে চট্টগ্রামে। শাহ আমানত বিমানবন্দর এলাকায় এক ব্যবসায়ী এই ‘গুপ্তধন’ লুকিয়ে রেখেছিলেন পানির ট্যাংকে। ওখানে মিলেছে ছয় হাজার লিটার ডিজেল। ভাবুন একবার, বাড়ির কল খুললে যদি পানি না বেরিয়ে ডিজেল বের হয়, তাহলে সেই বাড়ির মালিকের চেয়ে সুখী আর কে আছে! এই যে পানির ট্যাংক আর গোয়ালঘর, এগুলোই হচ্ছে আধুনিক লঙ্কার ‘পূজার ঘর’। এসব ঘরেই মানুষের পকেট কাটতে বিভীষণরা কারসাজি করে।
এসব কারসাজি আর সিন্ডিকেট বন্ধ করার দায়িত্ব সরকারের; কিন্তু ভয়াবহ সঙ্কটের সময়ও সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কারো কারো ভূমিকা হতাশাজনক। যখন সাধারণ মানুষ তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে হাঁসফাঁস করছে, তখন তাদের দেখা যাচ্ছে সংসদে বসে ‘তেলবাজি’ করতে। গত বুধবার জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নেন জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ কামাল হোসেন। ঢাকা-৫ আসনের এই এমপি তেল কিনতে না পারায় রসিকতা করে বলেছিলেন, ‘গত রাতে আমাকে ২টা পর্যন্ত রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। আমি তেল পাই নাই। তেল শুধু মহান সংসদে; এত তেল এখানে অপচয় হচ্ছে, বাইরে তেল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।’
রসিকতা করে বললেও কথাটা সত্য। এর আড়ালে লুকিয়ে আছে বিশাল ক্ষত। জনপ্রতিনিধিদের কাজ যেখানে সঙ্কটের সমাধান খোঁজা, সেখানে তারা তোষামোদে ব্যস্ত। শেখ হাসিনা রেজিমের কথা ভাবুন। তখন জাতীয় সংসদ ছিল ‘তেল উৎপাদনের কারখানা’, তেলবাজির চারণভূমি। সংসদ ভবনের সবুজ আঙিনায় তেলের চাষ হতো! আর পাশের লেকে টলটল করত খাঁটি সরিষার তেল! সেখান থেকে তেল নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে নিবেদন করতেন সংসদ সদস্যরা! যেকোনো ছোটখাটো বিষয়েও চাওয়া হতো প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ। ‘তিনি না থাকলে তো দেশই চলবে না’, জপ করা হতো এমন সব মন্ত্র। এই মন্ত্রগুলো সংসদীয় গণতন্ত্রকে পরিণত করেছিল একটা তৈলাক্ত সার্কাসে।
শেখ হাসিনা রেজিমের পতন হলো। তিনি পালিয়ে গেলেন ভারতে। জুলাইয়ের রক্তঝরা পথ ধরে বাংলাদেশে এলো অন্তর্বর্তী সরকার। তাদের ওপর মানুষের প্রত্যাশা ছিল পাহাড়সমান। মানুষ আশা করেছিল, এই সরকার এমন একটি সিস্টেম দাঁড় করিয়ে দিয়ে যাবে, ভবিষ্যতে নির্বাচিত সরকার এসে যেন জাতীয় সংসদকে তৈলাক্ত সার্কাস বানাতে না পারে। অন্তর্বর্তী সরকার একটি সিস্টেমের পথে এগিয়ে গেল। সামনে আনা হলো জুলাই সনদ। এতে স্বাক্ষর করল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলসহ (বিএনপি) অধিকাংশ রাজনৈতিক দল। শেষে নির্বাচন হলো। মানুষের রায় নিয়ে ক্ষমতায় বসল বিএনপি; কিন্তু তারা ভুলে গেল মানুষের দেয়া আরেক রায়ের কথা। গণভোটে মানুষ যে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছে, সেটি পাশ কাটিয়ে গেল। জনমতকে তুচ্ছ করা মানে জনগণের মালিকানা অস্বীকার করা। গণরায় এড়িয়ে গেলে শাসনব্যবস্থায় দুর্বলতা তৈরি হয়। সেই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে কারসাজি করতে পারে বিভীষণরা।
অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, সংসদে যদি এই তোষামোদ বা ‘তেলবাজি’ না থাকে, তাহলে কি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমবে? তেলের দাম কমা বা বাড়ার সাথে সম্পর্ক হলো যুদ্ধের, বিশ্বরাজনীতির মারপ্যাঁচের। সংসদে তেলবাজি হোক বা না হোক, পাম্পে তেলের দাম কিংবা সরবরাহের সাথে এর সম্পর্ক কোথায়?
যুক্তি হিসেবে কথাটা মন্দ না; কিন্তু গভীরভাবে ভাবলে দেখা যায়, সংসদে যখন গঠনমূলক আলোচনার পরিবর্তে ‘তেলবাজি’ চলে, তখন প্রশাসনের ভেতর আত্মতুষ্টি বা উদাসীনতা ভর করে। বাজার তদারকি সংস্থাগুলোও ঢিলেমি করতে শুরু করে। এতে আন্তর্জাতিক সঙ্কটের দোহাই দিয়ে অসাধু চক্র সাধারণ মানুষের পকেট কাটার উৎসবে মেতে ওঠে। অথচ জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রের কাজ হলো বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যেও অভ্যন্তরীণ বাজার স্থিতিশীল রাখা, জনগণের কষ্টের ভাগ নেয়া। জবাবদিহির সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলে তেলের বাজারে বিশৃঙ্খলা রোধ করা সম্ভব। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী একটি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন, জনসাধারণের আর্থিক দুর্ভোগ বিবেচনায় আপাতত জ্বালানি তেলের দাম বাড়াবে না সরকার। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বিশ্বের অনেক দেশেই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে, বাংলাদেশ এখনো সেই পথে যায়নি।
প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে, তাদের চেয়ে আমাদের বাজারে তেলের দাম কম; কিন্তু তেল নিয়ে তেলেসমাতি দেখতে হচ্ছে আমাদেরই। নেপালে তেলের দাম এখন আকাশচুম্বী, প্রতি লিটার প্রায় রেকর্ড উচ্চতায়। পাকিস্তানে পেট্রলের দাম দ্বিতীয় সর্বোচ্চ (১.৩৬ ডলার)। এমনকি শ্রীলঙ্কা ও ভুটানেও দাম বাংলাদেশের তুলনায় বেশি। তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশে তেলের দাম এখনো কম আছে। কিন্তু এই ‘কম দাম’ আমাদের কী দিচ্ছে? সুলভ মূল্যের তেল যদি পাম্পে পাওয়া না যায়, তাহলে সেই ‘দাম’ দিয়ে কী হবে? মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে হয়রান হয়ে বিকল্প উপায় খোঁজে। তেলের খোঁজে যায় গোয়ালঘরে, পানির ট্যাংকিতে। খবর আসছে, তেল এখন অনলাইনেও বিক্রি হচ্ছে। ২০০ থেকে ৩০০ টাকায় পেট্রল বিক্রির বিজ্ঞাপন দেখা যাচ্ছে ফেসবুকে।
বাংলাদেশে তেলের দাম কম রাখতে পেরেছে সরকার, এ জন্য প্রশংসা তাদের প্রাপ্য; কিন্তু তেল নিয়ে তাদের কি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা আছে? এই সরকারের বয়স বেশি নয়। সে হিসাবে যথাযথ পরিকল্পনা করার সময়ও পায়নি তারা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও বিশ্বরাজনীতিতে উত্তাপ ছিল। আমেরিকা আর ইরানের মধ্যে ‘হট টক’ চলছিল। তখনই তারা বুঝেছিল তেলের বাজারে আগুন লাগবে। সে জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিল। আজ যে সরকার বলতে পারছে, দেশে তেলের মজুদ যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি, এটি অন্তর্বর্তী সরকারের অবদান।
এই মুহূর্তে আমাদের কেবল মধ্যপ্রাচ্যের দিকে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে থাকলে চলবে না। রাশিয়ার মতো উৎস থেকে আমদানির দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা তৈরি করতে হবে। সেই সাথে দেশে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। এতে জ্বালানির ওপর চাপ কমবে। বিভীষণদের ঠেকাতে ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে ডিপো থেকে পাম্প পর্যন্ত প্রতি লিটার তেলের গতিবিধি নজরদারি করা সম্ভব হবে।
আশার কথা, যুদ্ধ থেকে আমেরিকাকে অনেকটাই পিছু হটতে দেখা যাচ্ছে। এতে যুদ্ধের তাপও কিছুটা কমে আসছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অনেকটাই নেমে গেছে তেলের দাম। এর ধারাবাহিকতায় রাশিয়ার ফিনিশড পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানিতে বাংলাদেশকে নতুন করে আরো ৬০ দিনের ছাড় দিয়েছে আমেরিকা। এর আগে ৩০ দিনের ছাড় দেয়া হয়েছিল; কিন্তু তাতে তেমন সুফল পাওয়া যায়নি। কারণ সেই সময় রাশিয়ার কোনো তেলবাহী জাহাজ বাংলাদেশের পথে ছিল না। তবে এবারের ছাড় বাংলাদেশের জন্য বড় স্বস্তি। এই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে আমাদের। দ্রুত বাড়িয়ে নিতে হবে আপৎকালীন মজুদ।
তবে ঘাপটি মেরে থাকা ‘বিভীষণ’দের রুখতে না পারলে সব মজুদ যাবে তাদের ঘরেই। তখন ভালো ভালো সব ‘পরিকল্পনা’ ধুয়ে পানি খেলেও ফল আসবে না।
লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত



