তেহরানে আসিম মুনিরের হাই-প্রোফাইল সফর ও নতুন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ

আসিম মুনির স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপটে টেকসই শান্তি ফেরাতে সংলাপ, উত্তেজনা প্রশমন এবং দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক তৎপরতার কোনো বিকল্প নেই।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
সংগৃহীত

আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধাবস্থা নিরসনে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় তিন দিনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তেহরান সফর শেষ করেছেন পাকিস্তানের চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস (সিডিএফ) তথা সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির।

পাকিস্তানের ইংরেজি দৈনিক ডন এবং ইরানের প্রভাবশালী সংবাদ মাধ্যম তাসনিম নিউজ অ্যাজেন্সি বলেছে, এই সফরটি আজ শনিবার শেষ হয়েছে। সফরে সফরসঙ্গী ছিলেন পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন নাকভি।

আজ শনিবার পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতরের (আইএসপিআর) বরাত দিয়ে ডন জানিয়েছে, এই সফরের মূল লক্ষ্য ছিল এ অঞ্চলের পরিবর্তনশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে টেকসই শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। বিশেষ করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনা কমিয়ে আনতে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে যে মধ্যস্থতার চেষ্টা চালানো হচ্ছে, এই সফরকে তারই একটি বড় অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির সফরকালে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, ইরানের জাতীয় সংসদ মজলিশে শূরার স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি এবং খাতাম আল-আম্বিয়া সদরদফতরের কমান্ডার মেজর জেনারেল আলি আবদুল্লাহির সাথে পৃথক বৈঠকে মিলিত হন। এসব বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির শান্তিপূর্ণ সমাধানে পাকিস্তানের দৃঢ় সংকল্প এবং দ্বিপক্ষীয় ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরো জোরদার করার বিষয়ে আলোচনা হয়।

আসিম মুনির স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপটে টেকসই শান্তি ফেরাতে সংলাপ, উত্তেজনা প্রশমন এবং দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক তৎপরতার কোনো বিকল্প নেই।

এই সফরের একটি বড় লক্ষ্য ছিল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনা কমানোর মধ্যস্থতা প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নেয়া।

ডন বলছে, চলতি মাসের শুরুতে ইসলামাবাদে ১৯৭৯ সালের পর এই প্রথম ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। টানা ২১ ঘণ্টা দীর্ঘ সেই আলোচনায় কোনো চূড়ান্ত চুক্তি না হলেও কূটনৈতিক যোগাযোগের পথ খোলা রাখার বিষয়ে উভয় পক্ষ একমত হয়েছিল। এমনকি আলোচনার প্রথম রাউন্ড শেষে ইরানি প্রতিনিধিদের নিরাপত্তায় পাকিস্তান বিমান বাহিনী তাদের সীমান্ত পর্যন্ত পাহারা দিয়ে পৌঁছে দিয়েছিল।

উল্লেখ্য, গত ৮ এপ্রিল দেশ দু’টির মধ্যে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল, যা আগামী ২২ এপ্রিল শেষ হতে চলেছে। বর্তমানে এই যুদ্ধবিরতি টিকে থাকলেও তা অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতেই সেনাপ্রধানের এই তেহরান সফর আন্তর্জাতিক মহলে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এস্কেন্দার মোমেনি পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন নাকভির সাথে আলাপকালে যুদ্ধবিরতি অর্জন এবং বিরোধ নিষ্পত্তিতে পাকিস্তানের বলিষ্ঠ ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বৈঠকে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে অমীমাংসিত বিষয়গুলো সমাধানে তাদের পূর্ণ চেষ্টা নিরন্তর চলছে।

মূলত ইসরাইলের সৃষ্ট মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিতিশীলতা এবং এ অঞ্চলের সামগ্রিক ভূ-রাজনৈতিক সঙ্কটের মধ্যে পাকিস্তান নিজেকে একটি ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। এই সফরের মাধ্যমে এটি স্পষ্ট হয়েছে যে আঞ্চলিক শান্তি রক্ষায় এবং আবারো কোনো বড় ধরনের সংঘাত এড়াতে পাকিস্তান প্রতিবেশী ইরানের সাথে আরো ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে আগ্রহী।

এই কূটনৈতিক তৎপরতা কেবল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উন্নয়নই নয়, বরং গোটা অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ও নিরাপত্তার স্বার্থে একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।