মার্কিন ভুলের সুযোগে বিশ্বমঞ্চে চীনের জয়জয়কার

মার্কিন অস্থিরতা ও নীতিগত ভুলের সুযোগে চীন বৈশ্বিক প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়াচ্ছে। কূটনীতি, অর্থনীতি ও কৌশলগত পদক্ষেপে বেইজিং নিজেকে স্থিতিশীল বিকল্প হিসেবে তুলে ধরছে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
সংগৃহীত

ইরান যুদ্ধের দামামা আর একের পর এক হঠকারী সিদ্ধান্তের জেরে বৈশ্বিক অঙ্গনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি যখন তলানিতে, ঠিক সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নিজের অবস্থান তুঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে চীন। একদিকে বোমা, বিশৃঙ্খলা আর অস্থিরতার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠছে ওয়াশিংটন, অন্যদিকে বেইজিং নিজেকে তুলে ধরছে স্থিতিশীলতা এবং পরিকল্পিত উন্নয়নের এক নির্ভরযোগ্য দূর্গ হিসেবে।

বিষয়টি অনেকটা ‘কারো পৌষ মাস কারো সর্বনাশ’ প্রবাদের মতো। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিটি ভুল পদক্ষেপকে বেইজিং নিজের প্রচারণার হাতিয়ার বানিয়ে নিয়েছে। সম্প্রতি বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত ‘চায়না ডেভেলপমেন্ট ফোরাম’-এ ইতিহাসবিদ অ্যাডাম টুজ এই বৈপরীত্য তুলে ধরে জানান, বিশ্ব এখন এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে মার্কিন বিশৃঙ্খলার বিপরীতে চীনের ১৫তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মতো সুশৃঙ্খল কাঠামো অনেক বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজে ফেরার পর দুই পরাশক্তির লড়াই নতুন মাত্রা পেয়েছে। গত বছরের বাণিজ্য যুদ্ধে চীন নৈতিকভাবে জয়ী হওয়ার পর এখন মধ্যপ্রাচ্য সঙ্কটেও বেইজিং সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। ট্রাম্পের আচরণ মিত্রদের দূরে ঠেলে দিচ্ছে। এই সুযোগে চীন এবারে কূটনীতি এবং বহুপক্ষীয়তার ঝাণ্ডা ধরে নিজেকে শান্তির দূত হিসেবে জাহির করছে।

২০২৫ সালের গ্যালাপ জরিপ অনুযায়ী, বৈশ্বিক জনপ্রিয়তায় চীন ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে। যেখানে ৩৬ শতাংশ মানুষ চীনা নেতৃত্বের পক্ষে এবং মার্কিনীদের পক্ষে মাত্র ৩১ শতাংশ। গত ২০ বছরে চীনের এই লিড সবচেয়ে বড় ব্যবধান হিসেবে দেখা হচ্ছে। এমনকি কানাডার মতো প্রতিবেশী দেশের মানুষও এখন চীনের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রকেই বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি মনে করছে।

ইরান যুদ্ধের উত্তাপ কমাতে পর্দার অন্তরালে চীনের ভূমিকা এখন আন্তর্জাতিক মহলে আলোচিত। তেহরানের প্রধান অর্থনৈতিক মিত্র হিসেবে ইসরাইল এবং মার্কিন সামরিক হামলার কড়া নিন্দা জানাচ্ছে বেইজিং। পাশাপাশি পাকিস্তানকে সাথে নিয়ে শান্তি উদ্যোগের নেতৃত্ব দিচ্ছে। ইরানকে নমনীয় হতে রাজি করিয়ে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার পেছনে চীনের বড় প্রভাব ছিল বলে মার্কিন গণমাধ্যমগুলোও স্বীকার করছে। এতে করে জ্বালানি বাজারে চীনের স্বার্থ রক্ষা হয়েছে।

অন্যদিকে মে মাসে হতে যাওয়া শি-ট্রাম্প সম্মেলনে অনেক বেশি দর কষাকষির শক্তি অর্জন করেছে বেইজিং। বেইজিংয়ের চতুর কূটনীতি ট্রাম্পের ‘ভুল’ পদক্ষেপগুলোকে এমনভাবে ব্যবহার করছে যে পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোও এখন ব্যঙ্গ করে বলছে- শত্রু যখন ভুল করে, তখন তাকে বাধা দিতে নেই।

চীনের এই উত্থান কেবল কূটনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। দেশটি সামরিক এবং কৌশলগত ক্ষেত্রেও লাভবান হচ্ছে। ওয়াশিংটন এখন এশিয়া-প্রশান্তমহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে নজর সরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে সম্পদ অপচয় করছে। চীন সেখানে মার্কিনের সেই শূন্যস্থান পূরণে ব্যস্ত। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো এখন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে চীনকে বেশি নির্ভরযোগ্য কৌশলগত অংশীদার মনে করছে। একইসাথে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় শি জিনপিংয়ের নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নীতি দেশে-বিদেশে বাড়তি বৈধতা পাচ্ছে। সব মিলিয়ে মার্কিন আগ্রাসনের মুখে চীন নিজেকে বিশ্ব ব্যবস্থার এক শান্ত এবং প্রজ্ঞাবান বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে, যা কি না আধুনিক ভূ-রাজনীতিতে ওয়াশিংটনের জন্য বড় এক পরাজয়।

সূত্র: আল পাইস