বিশ্বচ্যাম্পিয়নের উৎসবে যখন মেটলাইফ স্টেডিয়াম রঙিন হয়ে উঠেছে, চারদিকে কনফেটির ঝড়; তখন রানার্সআপের রুপালি পদক গলায় ঝুলিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিলেন একজন— লিওনেল মেসি।
সেই উৎসবের মাঝেই ক্যামেরা আটকে ছিল তার মুখেই। তার চোখ বেয়ে নেমে আসছিল অশ্রু। মনে হচ্ছিল, এই হারে যেন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর এক অধ্যায়টাও ধীরে ধীরে শেষ হয়ে আসছে।
স্পেনের কাছে হেরে আর্জেন্টিনা শিরোপা হাতছাড়া করলেও ম্যাচ শেষের পর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন মেসি। কারণ, ফুটবল বিশ্ব জানে—এটাই হয়তো বিশ্বকাপের মঞ্চে তার শেষ উপস্থিতি।
ফক্স স্পোর্টসের স্টুডিওতেও মেসিকে নিয়েই চলছিল আলোচনা। জ্বালাতান ইব্রাহিমোভিচের চোখে এই হার কোনোভাবেই মেসির বিশ্বকাপকে ছোট করতে পারে না।
‘আমরা এই বিশ্বকাপে ওকে মন ভরে উপভোগ করেছি। আমি জানি বিশ্বকাপটা জিততে না পেরে ও ভীষণ কষ্ট পেয়েছে। কিন্তু ও একটা অবিশ্বাস্য বিশ্বকাপ কাটিয়েছে। একা হাতে এই দলটাকে টেনে নিয়ে গেছে। ও যা করেছে, তা স্রেফ জাদুকরী।’
৩৯ বছর বয়সেও ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট। প্রথম পাঁচ ম্যাচেই টানা গোল, এরপর নকআউট পর্বে গোল না পেলেও তিনটি গোল বানিয়ে দেওয়া—বিশেষ করে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দুই অ্যাসিস্টে নাটকীয় প্রত্যাবর্তন।
ইব্রাহিমোভিচের ভাষায়, ‘কখনো মনে হয়েছে ও এই গ্রহেরই কেউ না, আবার কখনো একদম আমাদের মতো রক্তমাংসের মানুষ।’
ফাইনালে অবশ্য মেসিকে পুরোপুরি আটকে দেয় লুইস দে লা ফুয়েন্তের স্পেন। পুরো ম্যাচে গোলমুখে কার্যকর কোনো আক্রমণই গড়তে পারেনি। কিন্তু থিয়েরি অঁরির মতে, এটা মেসির ব্যর্থতা নয়, বরং স্পেনের কৌশলগত সাফল্য।
‘আপনি মেসির বিপক্ষে বাজি ধরতে পারেন না। আর্জেন্টিনাকে হারাতে হলে স্পেনের মতো একটা দলই লাগত।’
মেসির শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে কোনো সংশয় নেই ডেনমার্কের সাবেক গোলরক্ষক ক্যাসপার স্মাইকেলেরও। তিনি মনে করেন, একজন ফুটবলারের মূল্যায়ন শুধু ট্রফি দিয়ে করা যায় না।
‘হ্যাঁ, ও বিশ্বকাপে জেতার চেয়ে ফাইনাল হেরেছে বেশি। কিন্তু তা সত্ত্বেও ও-ই ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়। ফুটবল শুধু জেতার নাম নয়, খেলাটাকে আপনি কী দিয়ে গেলেন সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। আর মেসি যা দিয়ে গেছে, তার কোনো তুলনা হয় না।’
একই মত পোষণ করেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ডিফেন্ডার অ্যালেক্সি লালাস। ‘ও একজন চ্যাম্পিয়ন। চ্যাম্পিয়নরা সব সময় জিততে চায়। তাই আজকের হারটা ওকে কষ্ট দেবে। কিন্তু এই একটি ম্যাচ দিয়ে মেসিকে বিচার করা অন্যায়। এখন আলোচনা হওয়া উচিত, ফুটবল ইতিহাসে ও কতটা আইকনিক।’
ইংল্যান্ডের সাবেক স্ট্রাইকার পিটার ক্রাউচ মনে করিয়ে দিলেন, বর্তমান প্রজন্মের অনেক তারকার কাছেই মেসি ছিলেন অনুপ্রেরণার নাম।
‘আজ স্পেনের যে ছেলেরা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হলো, তাদের অনেকেই ছোটবেলায় মেসিকে দেখে বড় হয়েছে। এই মানুষটা একজন জিনিয়াস। যদি এটাই তার শেষ বিশ্বকাপ হয়, তাহলে আমরা ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ফুটবলারকে বিদায় জানাচ্ছি।’
তবে সবচেয়ে আবেগঘন মন্তব্যটি আসে আবারো থিয়েরি অঁরির কাছ থেকেই। পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে মেসির চোখের জল দেখে তিনি বলেন, ‘দেখো, এই হারটা ওর কাছে কতটা কষ্টের। যদি কারো মনে সন্দেহ থাকে, এই বয়সেও ওর জেতার ক্ষুধা আছে কি না, তাহলে ওর মুখের দিকে তাকাও। ও সব জিতেছে। তবু কেন কাঁদছে? কারণ দেশের জন্য ওর ভালোবাসা আর আবেগ এখনো একটুও কমেনি।’
এখন প্রশ্ন একটাই—মেটলাইফ স্টেডিয়ামে রানার্সআপের পদক গলায় ঝুলিয়ে চোখের জল ফেলাই কি আর্জেন্টিনার জার্সিতে লিওনেল মেসির শেষ দৃশ্য? ইব্রাহিমোভিচ অবশ্য এখনই বিদায় মানতে নারাজ।
‘আমি চাই, ও যত দিন সম্ভব খেলে যাক। কারণ ও খেলছে মানেই আমরা ফুটবলের সৌন্দর্য উপভোগ করছি। যেদিন মেসি খেলা ছেড়ে দেবে, সেদিন শুধু আর্জেন্টিনা নয়, পুরো ফুটবল বিশ্বেরই কিছু একটা হারিয়ে যাবে।’



