রাওয়ালপিন্ডি টু সিলেট : ধন্যবাদ অধিনায়ক শান্ত

অধিনায়ক হিসেবে এ সংস্করণে ১৮ ম্যাচে ৮ জয় পেয়েছেন শান্ত। বাংলাদেশ দলের আর কোনো অধিনায়ক এত টেস্ট জিততে পারেননি।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
পাকিস্তানকে সিরিজ হারানোর পর অধিনায়ক শান্ত
পাকিস্তানকে সিরিজ হারানোর পর অধিনায়ক শান্ত |ক্রিকইনফো থেকে নেয়া ছবি

বৈশ্বিক আসরে টাইগারদের অর্জনের পাল্লা নিতান্তই সাধারণ। এখন পর্যন্ত জিততে পারেনি বড় কোনো আসরে। ফলে দ্বিপক্ষীয় সিরিজগুলোর উপলক্ষগুলো হয়ে ওঠে আরো আনন্দের।

কাগজে-কলমে মোটে একটা সিরিজ জয় হলেও, আমাদের মানদণ্ডে প্রাপ্তি বিশাল। আর পাকিস্তানের মতো দলের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ জয়, রূপকথার চেয়ে নিশ্চয়ই কম নয়! ঐতিহাসিকও বলা যায়।

এমন ঐতিহাসিক ঘটনা টানা দুইবার ঘটালো বাংলাদেশ। রাওয়ালপিন্ডির পর এবার ঘরের মাঠে ডেকে এনে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে পাকিস্তানকে ২-০ ব্যবধানে ধবলধোলাই করেছে টাইগাররা।

সব মিলিয়ে পাকিস্তানের বিপক্ষে টানা চার টেস্ট জিতলো বাংলাদেশ। এর আগে আর কোনো দলের বিপক্ষে টানা চার টেস্ট জিতেনি টাইগাররা। অথচ এই পাকিস্তানের সাথে টেস্ট জয় দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

২০০৩ সালে মুলতান টেস্টে খুব কাছে গিয়েও হেরেছিল বাংলাদেশ। ইনজামাম উল হকের মহাকাব্যিক এক সেঞ্চুরিতে হাতের মুঠোয় থাকা জয় হাতছাড়া হয়ে যায় টাইগারদের।

অধিনায়ক খালেদ মাহমুদ সুজন সেই দুঃখ লুকাতে পারেননি, মাঠেই কেঁদে দেন তিনি। স্বপ্নভঙ্গের সেই বেদনা বাংলাদেশকে বয়ে বেড়াতে হয়েছে আরো ২১ বছর। সময়ের সাথে বেড়েছে হাহাকার।

পাকিস্তানের বিপক্ষে ২০২৪ সালের আগ পর্যন্ত আর টেস্ট জিততে পারেনি বাংলাদেশ। ১৩ টেস্টে প্রাপ্তি বলতে ছিল একটা মাত্র ড্র। বাকি সব ম্যাচেই মাঠ ছাড়তে হয় মাথানত করে। কেটে যায় এভাবে ২১ বছর।

এরপর ২০২৪ সালের আগস্টে এসে ঘুরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ। শোককে শক্তি করে লেখে নতুন ইতিহাস। পাকিস্তানকে তাদের ঘরের মাঠে হারিয়ে দেয় ১০ উইকেটে। পুরো বিশ্ব অবাক।

অনেকেই বিষয়টা হয়তো অঘটন হিসেবেই দেখছিলো। তবে তা যে কাকতাল নয়, তার প্রমাণ দেয় বাংলাদেশ পরের ম্যাচেই। সেই রাওয়ালপিন্ডিতে ফের স্বাগতিকদের ৬ উইকেটে হারায় বাংলাদেশ।

যেই পাকিস্তানের মাটিতে কোনো ফরম্যাটে কোনো জয়ই ছিল না বাংলাদেশের, সেই মাটিতে স্বাগতিকদের বিপক্ষে সিরিজ জয়—দেশের ক্রিকেটের সেরা মুহূর্তগুলোর একটি হয়ে দেখা দেয়।

এরপর গত দেড় বছরে আর টেস্ট খেলেনি দুই দল। তবে ফের আবার যখন মুখোমুখি হয়নি, তখনও চিত্রনাট্যে পরিবর্তন আসেনি। প্রতিশোধের লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশে আসা ম্যান ইন গ্রিনরা আবারো হয়েছে বিধ্বস্ত।

মিরপুরে সিরিজের প্রথম টেস্টে ১০৪ রানের দাপুটে জয়। দেশের মাটিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে যেটি ছিল প্রথম টেস্ট জয়।

মিরপুরে প্রথম ইনিংসে নাজমুল হোসেন শান্তর সেঞ্চুরিতে ৪১৩ রানের সংগ্রহ পেয়েছিল বাংলাদেশ। জবাবে পাকিস্তান অলআউট হয় ৩৮৬ রানে। মেহেদী মিরাজ পান ৫ উইকেট।

দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাক টু ব্যাক সেঞ্চুরির সুযোগ ছিল শান্তর। তবে ৮৭ রানে আউট হয়ে যান তিনি। তবে সাহস দেখান বাংলাদেশ অধিনায়ক, ৯ উইকেটে ২৪০ রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করে স্বাগতিকরা।

পাকিস্তানের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় ২৬৮ রানের। যা তাড়া করতে নেমে নাহিদ রানার গতির সামনে ১৬৩ রানেই ভেঙে পড়ে তারা। বাংলাদেশ পায় ১০৪ রানের জয়। নাহিদ রানার পকেটে ৫ উইকেট।

সিলেটে দ্বিতীয় টেস্টে অবশ্য জয়টা এত সহজে আসেনি। প্রথম ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে বিপর্যয়ে পড়ে যায় বাংলাদেশ। ১১৬ রানে হারিয়ে বসে ৬ উইকেট। সেখান থেকে ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন লিটন দাস।

লোয়ার অর্ডারদের নিয়ে খেলেন ১২৬ রানের মহাকাব্যিক ইনিংস। বাংলাদেশ পায় ২৭৮ রানের সংগ্রহ। জবাবে নাহিদ-তাইজুলদের বিপক্ষে ২৩২ রানেই থেমে যায় পাকিস্তান। ৪৬ রানের লিড পায় পাকিস্তান।

দ্বিতীয় ইনিংসে মুশফিকুর রহিম হাঁকান সেঞ্চুরি। তার ১৩৭ রানের ইনিংসে ভর করে ৩৯০ রানের পুঁজি পেয়ে যায় বাংলাদেশ। লিডসহ টাইগারদের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৪৩৬ রান।

জয়ের জন্য পাকিস্তানকে গড়তে হতো বিশ্ব রেকর্ড। ক্রিকেটের প্রায় দেড় শ’ বছরের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত এতো রান তাড়া করে জেতেনি কোনো দল। ফলে বাংলাদেশ পেয়ে যায় সিলেটেও জয়ের মঞ্চ।

তবে চতুর্থ দিনে সারাদিন বল করেও পাকিস্তানকে গুটিয়ে দিতে পারেনি বাংলাদেশ। মঙ্গলবার পাকিস্তান দিন শেষ করেছিল ৭ উইকেটে ৩১৬ রান নিয়ে। জয়ের জন্য তখনো ১২১ রান প্রয়োজন তাদের।

এদিকে জয়ের সুবাস পাওয়া বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল ৩ উইকেট। দিনের শুরুতে দুইটা ক্যাচ মিস মনে ভয় ধরিয়ে দিলেও প্রথম সেশনের মাত্র ১১.২ ওভারেই ফুরিয়েছে সেই অপেক্ষা।

আজ জোড়া উইকেট নিয়েছেন তাইজুল ইসলাম। সব মিলিয়ে ইনিংসে ৬ উইকেট নিয়েছেন তিনি। সাদা পোশাকে এই নিয়ে ১৮ বার ৫ উইকেট নিলেন তিনি। দিনের অন্য উইকেটটা নেন শরীফুল ইসলাম।

পঞ্চম দিনে অবশ্য খানিকটা ভয় ধরিয়ে দেন মোহাম্মদ রিজওয়ান ও সাজিদ খান। দুজনের জুটি পঞ্চাশ পেরোয়। তবে ৯৬তম ওভারে এই জুটি ভেঙে দেন তাইজুল। ফেরান ২৮ রান করা সাজিদকে।

সেখানেই শেষ হয় পাকিস্তানের প্রতিরোধ। এরপর ৯৭তম ওভারের প্রথম বলেই শতকের পথে হাঁটা রিজওয়ানকে থামান শরীফুল। মিরাজকে ক্যাচ দিয়ে ফিরেন ১৬৬ বলে ৯৪ রান করা রিজওয়ান।

পরের ওভারে তাইজুল আব্বাসকে (০) ফেরাতেই শেষ হয় অপেক্ষা। ০ রানে ৩ উইকেট তুলে নিয়ে পাকিস্তানকে গুটিয়ে দেয় ৩৫৮ রানে। সিলেটে বাংলাদেশ জয় পায় ৭৮ রানের। সেই সাথে জিতে নেয় সিরিজও।

ইতিহাস গড়ায় নেতৃত্ব দিয়ে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তও তো বাড়তি একটা ধন্যবাদ পেতেই পারেন! ধন্যবাদ দেন না দেন, বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা টেস্ট অধিনায়ক এখন শান্তই।

মিরপুরে জিতে সেরা অধিনায়ক হিসেবে জয়ের সংখ্যায় মুশফিকের পাশে বসেন শান্ত। দুজনের জয় সংখ্যা ছিল ৭টি। সিলেট টেস্টটা অধিনায়ক হিসেবে শান্তর অষ্টম জয়। ছাপিয়ে গেছেন মুশফিককে।

অধিনায়ক হিসেবে এ সংস্করণে ১৮ ম্যাচে ৮ জয় পেয়েছেন শান্ত। বাংলাদেশ দলের আর কোনো অধিনায়ক এত টেস্ট জিততে পারেননি।