‘ভেঙে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে আমারে?’- রবীন্দ্রনাথের সেই চিরচেনা গানের পঙক্তি আজ ডিজিটাল নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মনে এক নতুন, আতঙ্কজনক অর্থ নিয়ে হাজির হয়েছে। এখানে চাবি আর তালা যে সমার্থক, তা সবাই জানে; কিন্তু বিশ্বের বাঘা বাঘা নিরাপত্তা প্রধানদের ঘুম হারাম হয়ে গেছে সেই চাবিগুলো অচিরেই একটি বিশেষ চোরের হাতে পুরোপুরি অকেজো হয়ে যাবে ভেবে।
দুনিয়ার অতি গোপনীয় সংকেতাবন্ধ বার্তা বা এনক্রিপটেড ডেটা সুরক্ষিত রাখতে আমরা যে ডিজিটাল তালাগুলো ব্যবহার করি,
বিজ্ঞানীরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে সেগুলো একদিন স্রেফ খেলনার মতো ভেঙে ফেলা হবে।
এই মহাপ্রলয়ের দিনটিকে তারা নাম দিয়েছেন ‘কিউ-ডে’। আর এই ভয়াবহ পরিণতির দিকে আমাদের পৃথিবীকে দ্রুত ঠেলে দিচ্ছে কোয়ান্টাম কম্পিউটার নামের এক জাদুকরী ও একইসাথে ভয়ঙ্কর প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ।
বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নিউ সায়েন্টিস্ট’-এর সাম্প্রতিক সংখ্যার এক বিশ্লেষণে এই আসন্ন ডিজিটাল সংকটের এক ব্যবচ্ছেদধর্মী চিত্র ফুটে উঠেছে।
আমরা দীর্ঘদিন ধরে ভাবছিলাম যে কোয়ান্টাম কম্পিউটার হলো সুদূর ভবিষ্যতের এক বৈজ্ঞানিক বিস্ময়, যা কেবল মহাকাশ গবেষণা বা ওষুধ তৈরিতে বিপ্লব আনবে। কিন্তু নিউ সায়েন্টিস্ট জানাচ্ছে, সেই সময়টা আর দূরের কথা নয়, কারণ কোয়ান্টাম কম্পিউটারের ক্রমবর্ধমান শক্তির কাছে আমাদের বর্তমানের সব অজেয় এনক্রিপশন ব্যবস্থা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
কোয়ান্টাম কম্পিউটার আসলে কী এবং কেন এটি এত বিপজ্জনক
সহজভাবে বলতে গেলে, আমাদের বর্তমানের স্মার্টফোন, ল্যাপটপ বা এমনকি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সুপার কম্পিউটারগুলোও কাজ করে ‘বিট’-এর মাধ্যমে, যা কেবল ০ অথবা ১- এই দু’টি অবস্থার কোনো একটিতে থাকতে পারে। কিন্তু কোয়ান্টাম কম্পিউটার চলে ‘কুবিট’ বা কোয়ান্টাম বিটের নিয়মে। এটি একইসাথে ০ এবং ১- দুই অবস্থাতেই থাকতে পারে, যাকে বিজ্ঞানীরা বলেন ‘সুপারপজিশন’।
এর ফলে সাধারণ একটি কম্পিউটারকে একটি জটিল গাণিতিক সমস্যার উত্তর খুঁজতে অসংখ্য বার চেষ্টা করতে হয়, যা করতে হাজার বছর সময় লাগতে পারে। কিন্তু একটি কোয়ান্টাম কম্পিউটার একইসাথে সব সম্ভাব্য উত্তর পরীক্ষা করে দেখতে পারে, তাই যে সমস্যার সমাধানে একটি সুপার কম্পিউটারের হাজার বছর লাগবে, কোয়ান্টাম কম্পিউটার তা কয়েক সেকেন্ডে করে ফেলতে পারে।
আর এই অভাবনীয় গাণিতিক ক্ষমতাই এখন ডিজিটাল নিরাপত্তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের বর্তমানের প্রায় সব ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থা আর লেনদেন রক্ষা করে আরএসএ-২০৪৮ কিংবা ইসিডিএলপি-২৫৬ এর মতো অত্যন্ত জটিল গাণিতিক ছক, যা সাধারণ কোনো কম্পিউটার দিয়ে ভাঙা পুরোই অসম্ভব।
কিন্তু ২০২৬ সালের শুরুর দিকে বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, চলতি দশকের শেষের দিকেই এমন শক্তিশালী কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরি হয়ে যাবে যা এই পাকাপোক্ত এবং গোপন তালাগুলো অনায়াসেই খুলে ফেলবে। গুগল থেকে শুরু করে বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞরা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন ২০২৯ সালকে। তাদের মতে, ২০২৯ সালের মধ্যেই আমাদের এই কোয়ান্টাম হুমকির মোকাবিলায় পুরোপুরি প্রস্তুত হতে হবে।
নিউ সায়েন্টিস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই কোয়ান্টাম হুমকি বা ‘কিউ-ডে’ এক সময়ের আলোচিত ‘ওয়াই-টু-কে’ সঙ্কটের চেয়েও অনেক বেশি ভয়ানক। বিংশ শতাব্দীর শেষে সবাই ভয় পেয়েছিল যে ২০০০ সাল শুরু হতেই কম্পিউটারের তারিখ বিভ্রাটে বিমান চলাচল থেকে শুরু করে ব্যাংক ব্যবস্থা- সব স্থবির হয়ে যাবে। কিন্তু প্রকৌশলীদের অক্লান্ত পরিশ্রমে বিশ্বব্যাপী কাজ করার কারণে সেই বিপদ এড়ানো গিয়েছিল। কিউ-ডে তার চেয়েও বেশি ধূর্ত আর নিরব।
ওয়াই-টু-কে ছিল অনেকটা ঘড়ির কাটার মতো নির্দিষ্ট সময়ের বিষয়, কিন্তু কিউ-ডে কখন আসবে বা কখন আপনার তথ্য চুরি হয়ে যাবে, তার কোনো আগাম ঘোষণা থাকবে না। এরচেয়েও বড় বিপদের নাম হলো ‘হার্ভেস্ট নাও, ডিক্রিপ্ট লেটার’ বা ‘এখনই সংগ্রহ করো, পরে সংকেতমোচন বা সমাধান করো’ নামক হামলা।
হ্যাকাররা এবং রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখন থেকেই বিভিন্ন রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা, ব্যাংকিং বা স্বাস্থ্য খাতের সংকেতাবন্ধ তথ্য চুরি করে জমিয়ে রাখছে। তাদের কাছে এখন তালা খোলার চাবি না থাকলেও তারা জানে, কয়েক বছর পর যখন শক্তিশালী কোয়ান্টাম কম্পিউটার আসবে, তখন তারা অনায়াসেই এই পুরনো তথ্যগুলোর তালা খুলে ফেলতে পারবে। এর ফলে আমার আপনার ক্রেডিট কার্ডের তথ্য থেকে শুরু করে পারমাণবিক অস্ত্রের উৎক্ষেপণ কোড কিংবা রাষ্ট্রের অতি গোপন নথিপত্র পাচার হয়ে যাওয়ার ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।



