খাদ্যের প্রাচুর্যের মধ্যেও কোটি মানুষ ক্ষুধার্ত!

ক্ষুধা কোনো একটি দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা নয়। এটি পুরো মানবজাতির সম্মিলিত দায়িত্বহীনতার সাক্ষ্য। একটি শিশু যখন না খেয়ে ঘুমায়, তখন সে একা ব্যর্থ হয় না- আমরা প্রত্যেকে, আমাদের প্রতিটি নির্লিপ্ততার মধ্য দিয়ে, একটু একটু করে ব্যর্থ হই। বিশ্বনেতাদের এখন সম্পদের পেছনে না ছুটে মানুষের মৌলিক চাহিদার অগ্রাধিকার বদলাতে হবে। মানুষের পেট ভরানো, অস্ত্রের গুদাম ভরানোর চেয়ে কম জরুরি নয়- এই সহজ সত্যটুকু বিশ্বনেতারা যতদিন না বুঝবেন, ততদিন পৃথিবীর ক্ষুধার মানচিত্র লাল থেকে যাবে। আর সেই লাল রঙের দায় কেবল তাদের নয়, আমাদের সবার

নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন একটি কথা বলছেন, দুর্ভিক্ষ কখনো খাদ্যের অনুপস্থিতির ফল নয়; বরং এটি সর্বদা বণ্টনব্যবস্থার ব্যর্থতার পরিণতি। আজকের পরিসংখ্যান সেই তত্ত্ব সমর্থনই করে। পৃথিবীতে এখন যে পরিমাণ খাদ্য উৎপাদিত হয়, তা বর্তমান বৈশ্বিক জনসংখ্যার চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত থাকে। অথচ ক্ষুধার মানচিত্র ছোট হচ্ছে না; বরং কোনো কোনো অঞ্চলে তা আরো গভীর হচ্ছে।

খাবার আছে, তবু কোটি মানুষ ক্ষুধার্থ কেন? উত্তর খুঁজতে গেলে কয়েকটি স্তর উন্মোচন করতে হয়। প্রতিটি স্তরেই রয়েছে মানুষের লোভ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সম্মিলিত দায়িত্বহীনতার ছাপ।

জাতিসঙ্ঘের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১১২ কোটি টন খাবার সরাসরি আবর্জনায় ফেলা হয়েছে। এই বিপুল অপচয় কোথায় হচ্ছে? বড় শহরের চকচকে সুপারশপে, যেখানে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বিক্রি না হওয়া খাবার ছুড়ে ফেলা হয়। বিলাসবহুল রেস্তোরাঁর রান্নাঘরে, যেখানে পরিবেশনের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ না হওয়া খাবার সরাসরি বর্জ্যে যায়। অভিজাত বিয়ে বা সামাজিক অনুষ্ঠানের বাফেট টেবিলে, যেখানে চোখের সামনে পাহাড়সম খাবার অনায়াসে নষ্ট হয়। এই খাবারগুলো পাকা, সতেজ এবং পুরোপুরি খাওয়ার উপযোগী; কিন্তু ব্যবসায়িক হিসাব বা সামাজিক আড়ম্বরের কারণে সেগুলো ডাস্টবিনে যাচ্ছে।

খাদ্য অপচয়ের বৈশ্বিক তালিকায় শীর্ষে আছে চীন, যারা একা বছরে ১০৯ মিলিয়ন টনেরও বেশি খাবার নষ্ট করে। এরপরেই আছে ভারত ও পাকিস্তান, অথচ এই দেশগুলোর মাটিতেই বিশ্বের বৃহত্তম দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বসবাস। নিজের দেশে লাখো মানুষ অনাহারে থাকে, আর একই সময়ে সেই দেশই বিশ্বের সর্বোচ্চ খাদ্য-অপচয়কারীদের তালিকায়- এর চেয়ে বড় নীতিগত ব্যর্থতা আর কী হতে পারে?

মাথাপিছু হিসাবটা আরো বিচলিত করে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে মাথাপিছু খাদ্য অপচয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়ে উঠেছে পর্যটননির্ভর ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপ, একজন মানুষ বছরে গড়ে ২০৭ কেজি খাবার নষ্ট করেন সেখানে। পাকিস্তানে ১৩০ কেজি, নেপালে ৯৩ কেজি। আমাদের বাংলাদেশও এই লজ্জার দৌড়ে নেই বলা যাচ্ছে না- এখানে একজন মানুষ বছরে গড়ে ৬৫ কেজি খাবার ফেলে দেন। এই পরিসংখ্যানগুলো যেন বলছে, বিশ্বজুড়ে খাবার নষ্ট করার এক অলিখিত প্রতিযোগিতা চলছে।

যদি এই অপচয়ের একটি ক্ষুদ্র অংশও সঠিকভাবে সংরক্ষণ করে প্রয়োজনীয় মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া যেত, তাহলে ক্ষুধার মানচিত্র আজ এতটা বিস্তৃত থাকত কি না- সেই প্রশ্নের উত্তর আমরা সবাই জানি।

ক্ষুধার সঙ্কটকে আরো গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে যুদ্ধ ও সশস্ত্র সঙ্ঘাত। পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বের মোট ক্ষুধার্ত জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭০ শতাংশই যুদ্ধবিধ্বস্ত কোনো না কোনো অঞ্চলে বাস করে। তবে যুদ্ধ আর ক্ষুধার সম্পর্কটা এখন আর কেবল পার্শ্বক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ক্ষুধাকে এখন সরাসরি সামরিক ও রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে- সচেতনভাবে, পরিকল্পিতভাবে।

যুদ্ধ মানে শুধু দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি নয়। যুদ্ধ মানে কৃষকের সোনালি ফসলের মাঠ পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া। যুদ্ধ মানে খাদ্য সরবরাহের প্রধান সড়কগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে অবরুদ্ধ করে রাখা। যুদ্ধ মানে ত্রাণবাহী ট্রাককে গন্তব্যে পৌঁছাতে না দেয়া। গাজা ও সুদানের বর্তমান পরিস্থিতি এই নিষ্ঠুর কৌশলের সবচেয়ে দগদগে উদাহরণ। এই অঞ্চলগুলোতে ক্ষুধাকে বিপক্ষ জনগোষ্ঠীকে দমন করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। গুলি করে মানুষ মারার মতোই ত্রাণের পথ বন্ধ করে না খাইয়ে মারা একটি সমতুল্য অপরাধ- পার্থক্য শুধু এটুকু যে, এতে বুলেটের শব্দ হয় না, তাই বিশ্বের মনোযোগ পায় কম, আন্তর্জাতিক নিন্দার ঝড় ওঠে কম।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য প্রতিষ্ঠিত করেছে- আধুনিক বিশ্বের সঙ্ঘাত আর নির্দিষ্ট কোনো সীমান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ইউক্রেন ও রাশিয়া বিশ্ববাজারে গম, বার্লি, সূর্যমুখী তেল এবং রাসায়নিক সারের অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী দেশ। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বৈশ্বিক খাদ্যশস্যের সরবরাহ শৃঙ্খল মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ভেঙে পড়ল। এর প্রভাব গিয়ে পড়ল হাজার মাইল দূরের আফ্রিকার কোনো এক প্রান্তিক কৃষকের সংসারে। সারের দাম রাতারাতি কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় তার পক্ষে জমিতে ফসল ফলানো সম্ভব হলো না। পরিবারে খাবার জুটল না। শিশুটির স্কুলে যাওয়া বন্ধ হলো। সেই কৃষক কোনো দিন ইউক্রেনের মানচিত্র দেখেননি হয়তো, অথচ সেখানকার যুদ্ধ তার জীবনটা বদলে দিয়ে গেল। ভূরাজনীতির দাবার ছকে বলির পাঁঠা সবসময় সেই মানুষটিই হয়, যে এই খেলার নিয়মও জানে না।

অপচয় আর যুদ্ধের পাশাপাশি তৃতীয় যে শক্তিটি এই সঙ্কটকে ক্রমাগত গভীর করে চলেছে, সেটি হলো- জলবায়ু পরিবর্তন। মানুষের অপরিণামদর্শী শিল্পায়নের মাশুল এখন দিতে হচ্ছে পুরো পৃথিবীকে, তবে সবচেয়ে বেশি দিতে হচ্ছে তাদেরকে, যারা এই বিপর্যয়ের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী।

আবহাওয়ার স্বাভাবিক চক্র এখন অতীতের বিষয়। কোথাও দীর্ঘস্থায়ী খরা ফসলের মাঠকে মরুভূমিতে পরিণত করছে, কোথাও আকস্মিক বন্যা ও প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় চোখের পলকে হাজার হেক্টর জমির কৃষিকাজ ধ্বংস করে দিচ্ছে। ঋতুচক্রের এই অনিশ্চয়তা কৃষিকাজকে একটি জুয়ার মতো করে তুলেছে- কৃষক জানে না কখন বীজ বুনবে, কখন সেচ দেবে, কখন ফসল ঘরে তুলবে। আফ্রিকার বহু দেশ এক সময় কৃষিতে স্বনির্ভর হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল, কঠোর পরিশ্রম করেছিল সেই লক্ষ্যে। জলবায়ুর ক্রমবর্ধমান বৈরিতা সেই অর্জনকে বারবার শুরু থেকে মুছে দিচ্ছে।

সবচেয়ে বড় নৈতিক অসঙ্গতি হলো- যেসব শিল্পোন্নত দেশ জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়িয়ে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার মুনাফা তুলেছে এবং পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে, তারাই প্রতি বছর আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনে দাঁড়িয়ে মানবতার সবচেয়ে আবেগময় ভাষণ দেয়। প্রতিশ্রুতির দলিল সই হয়, কার্বন নিঃসরণ কমানোর রোডম্যাপ প্রকাশিত হয়; কিন্তু কার্যত পরিবর্তন আসে সামান্যই। প্রকৃতি ভাষণ শোনে না। সে তার নিজের হিসাবে অবিচল থাকে।

ক্ষুধার এই সঙ্কটে কম আলোচিত; কিন্তু সমান ক্ষতিকর আরেকটি কারণ হলো বৈশ্বিক বাজার ব্যবস্থার কাঠামোগত ব্যর্থতা। অর্থনীতিবিদরা এটিকে বলেন ‘অ্যাক্সেস সঙ্কট’ অর্থাৎ- ক্রয়ক্ষমতার অনুপস্থিতি। বাজারে খাবার আছে; কিন্তু কেনার সামর্থ্য নেই। এই বাস্তবতাটাই কোটি পরিবারের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা।

তার ওপরে রয়েছে সিন্ডিকেটের খেলা। অসাধু ব্যবসায়ীরা গুদামে লাখ লাখ টন খাদ্যশস্য আটকে রাখে। উদ্দেশ্য একটিই- বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে দাম ফুলিয়ে মুনাফা বাড়ানো। এই প্রক্রিয়ায় খাদ্য আর মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার থাকে না, সেটি পরিণত হয় মুনাফা তোলার উপকরণে। যার পকেটে টাকা আছে সে খাবে, যার নেই সে ধুঁকবে- এটিই যেন বর্তমান বাজার অর্থনীতির অলিখিত নিয়ম।

এর সাথে যোগ হয়েছে ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার সমস্যা। দূরবর্তী প্রত্যন্ত অঞ্চলে খাদ্য পৌঁছে দেয়া এখনো কঠিন কাজ। যেসব জায়গায় রাস্তা নেই, সংযোগ নেই, পরিকাঠামো নেই- অথচ এই অঞ্চলগুলোতেই ক্ষুধার ঘনত্ব সাধারণত সবচেয়ে বেশি। আন্তর্জাতিক সাহায্যও অনেক সময় রাজনীতির জালে আটকে যায়। কোন দেশ ত্রাণ পাবে, সেটি নির্ধারিত হয় মানবিক প্রয়োজনে নয়, কৌশলগত স্বার্থের বিচারে। যেন ক্ষুধার্ত হওয়ার জন্যও সঠিক ভূরাজনৈতিক পরিচয় থাকা লাগে।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি হিসাব কষে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, প্রতি বছর মাত্র ৪০ বিলিয়ন ডলার সঠিকভাবে বিনিয়োগ করতে পারলে বৈশ্বিক ক্ষুধার সঙ্কট পুরোপুরি মোকাবেলা করা সম্ভব। সংখ্যাটি বড় শোনায়; কিন্তু প্রেক্ষাপটে রাখলে এটি নগণ্য। শুধু যুক্তরাষ্ট্রের এক বছরের সামরিক বাজেটের ৫ শতাংশেরও কম অর্থ দিয়ে পুরো পৃথিবীর ক্ষুধার্ত মানুষের এক বছরের আহার নিশ্চিত করা যায়। কিন্তু যুদ্ধাস্ত্রে বিনিয়োগে যে মুনাফা, মানুষের পেট ভরানোতে সেটি নেই। তাই সামরিক বাজেটে ট্রিলিয়ন ডলার বরাদ্দ হয়, ত্রাণের তহবিলে অর্থ জোটে না।

সমাধান কিন্তু একেবারে অদৃশ্য নয়। বৈশ্বিক খাদ্য উৎপাদনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসে প্রান্তিক ছোট কৃষকদের হাড়ভাঙা পরিশ্রম থেকে। এই মানুষগুলোকে যদি আধুনিক প্রযুক্তি, সহজ শর্তে ঋণ এবং জলবায়ু-সহনশীল উন্নত বীজ দিয়ে সহায়তা করা যায়, তাহলে উৎপাদন বহুগুণে বাড়বে। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধ হয়ে খাদ্যকে যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের বিরুদ্ধে শক্তিশালী আইনি কাঠামো গড়ে তুলতে পারে এবং সেই আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে- শুধু কাগজে লেখা থাকলে চলবে না। টেকসই কৃষিতে বিনিয়োগ বাড়ানো, খাদ্য সরবরাহের পরিকাঠামো উন্নত করা এবং অপচয় রোধে কার্যকর নীতি প্রণয়ন- এই পদক্ষেপগুলো নেয়া কঠিন নয়, শুধু দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

ক্ষুধা কোনো একটি দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা নয়। এটি পুরো মানবজাতির সম্মিলিত দায়িত্বহীনতার সাক্ষ্য। একটি শিশু যখন না খেয়ে ঘুমায়, তখন সে একা ব্যর্থ হয় না- আমরা প্রত্যেকে, আমাদের প্রতিটি নির্লিপ্ততার মধ্য দিয়ে, একটু একটু করে ব্যর্থ হই। বিশ্বনেতাদের এখন সম্পদের পেছনে না ছুটে মানুষের মৌলিক চাহিদার অগ্রাধিকার বদলাতে হবে। মানুষের পেট ভরানো, অস্ত্রের গুদাম ভরানোর চেয়ে কম জরুরি নয়- এই সহজ সত্যটুকু বিশ্বনেতারা যতদিন না বুঝবেন, ততদিন পৃথিবীর ক্ষুধার মানচিত্র লাল থেকে যাবে। আর সেই লাল রঙের দায় কেবল তাদের নয়, আমাদের সবার।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

rintuanowar.com