কোরবানির মহত্ত্ব : মুসলিম বিশ্বের মিলনমেলা

শায়খ মুফতি আলী হাসান উসামা

ত্যাগের এই মহান, শাশ্বত ও ইবরাহিমি শিক্ষা যদি আমাদের ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনের প্রতিটি স্তরে সত্যিকার অর্থে প্রতিফলিত হয়, তবে সমাজ থেকে যাবতীয় অন্যায়, অবিচার, জুলুম ও স্বার্থপরতার ঘন অন্ধকার চিরতরে দূর হয়ে যাবে এবং সেখানে প্রতিষ্ঠিত হবে ইনসাফ, সাম্য, মানবতা ও শান্তির এক অনাবিল পরিবেশ।

লেখক শায়খ মুফতি আলী হাসান উসামা
লেখক শায়খ মুফতি আলী হাসান উসামা |লেখকের ফেসবুক থেকে নেয়া ছবি

ত্যাগের শাশ্বত দর্শন ও মানবজীবনের উৎকর্ষ
সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই ত্যাগ মানুষের মহত্ত্বের প্রধান মাপকাঠি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। মহাবিশ্বের প্রতিটি অণু-পরমাণু যেন ত্যাগের এক একটি জীবন্ত দৃষ্টান্ত। সূর্য নিজের অস্তিত্বকে দহন করে পৃথিবীকে আলো দেয়, নদী নিজের বুক চিরে প্রবাহিত হয়ে জনপদকে সুজলা-সুফলা করে তোলে। ঠিক তেমনি, মানবসভ্যতার ইতিহাসে যত মহান আদর্শ, যত উন্নত চরিত্র ও যত উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বের উদ্ভব হয়েছে, তার মূলে রয়েছে আত্মত্যাগের অনন্য দৃষ্টান্ত। ত্যাগ মানুষকে শুধু মহানই করে না; বরং তাকে পার্থিব সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করে পরিশুদ্ধ, মহিমান্বিত ও স্রষ্টার নৈকট্যের উপযুক্ত করে তোলে। এই ত্যাগেরই এক সর্বোচ্চ প্রতীক হলো ইসলামী শরীয়তে নির্ধারিত কোরবানি, যা নিছক কোনো বাৎসরিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য, পরম আত্মসমর্পণ ও তাকওয়ার এক মহিমান্বিত প্রকাশ।

মানবজীবনের গভীরে যদি আমরা দৃষ্টিপাত করি, তাহলে দেখতে পাই, মানুষের সকল অর্জনের পেছনেই কোনো না কোনো ত্যাগ লুকিয়ে থাকে। একজন শিক্ষার্থী যখন জ্ঞান অর্জনের জন্য রাতের ঘুম ত্যাগ করে, একজন শ্রমিক যখন পরিবারের জন্য নিজের আরাম বিসর্জন দেয়, একজন মা যখন সন্তানের জন্য নিজের যাবতীয় সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য অবলীলায় বিসর্জন দেন, একজন নেতা যখন জাতির কল্যাণে ব্যক্তিগত স্বার্থ ত্যাগ করেন, তখন সেই ত্যাগই তাদের সাফল্যের সর্বোচ্চ চূড়ায় নিয়ে যায়। এই ধ্রুব বাস্তবতা আমাদের প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয়, ত্যাগ ছাড়া কোনো মহৎ ও স্থায়ী অর্জন সম্ভব নয়। ইসলাম এই ত্যাগকে একটি সুনির্দিষ্ট ও সুশৃঙ্খল দিকনির্দেশনার মাধ্যমে মানুষের জীবনে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কোরবানি সেই ঐশী দিকনির্দেশনারই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি মানুষকে হাতে-কলমে শেখায়, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে, প্রতিটি পদক্ষেপে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। মানুষের জীবনে এমন অনেক সঙ্কটময় মুহূর্ত আসে, যখন তাকে দুটি ভিন্ন পথের মধ্যে একটি বেছে নিতে হয়। একটি পথ নফসের কাছে সহজ, আরামদায়ক ও সাময়িকভাবে লাভজনক মনে হয়, অন্যটি কণ্টকাকীর্ণ, কষ্টকর কিন্তু সত্য, শাশ্বত ও ন্যায়ভিত্তিক। কোরবানির অন্তর্নিহিত শিক্ষা মানুষকে সেই কঠিন কিন্তু সত্য পথ বেছে নেয়ার অবিচল সাহস জোগায়।

ইতিহাসের আয়নায় কোরবানি : হাবিল ও কাবিলের দৃষ্টান্ত
কোরবানির ইতিহাস কোনো সাম্প্রতিক প্রথা নয়; বরং মানবজাতির প্রাচীনতম অধ্যায়ের সাথে এটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আদি মানব সায়্যিদুনা আদম আলাইহিস সালাম-এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের ঘটনার মধ্য দিয়ে আমরা পৃথিবীতে ত্যাগের প্রথম দৃষ্টান্ত প্রত্যক্ষ করি। সেখানে দেখা যায়, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য প্রদত্ত উৎসর্গ তখনই গ্রহণযোগ্য হয়, যখন তা হয় ঐকান্তিক আন্তরিকতা ও তাকওয়ার ভিত্তিতে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন যে, ‘আল্লাহ কেবল মুত্তাকিদের থেকেই কবুল করেন।’ কাবিলের কোরবানি ছিল ত্রুটিপূর্ণ ও আন্তরিকতাহীন, অন্যদিকে হাবিলের কোরবানি ছিল নিখুঁত ও তাকওয়াপূর্ণ। এই আদিম ঘটনা মানবজাতির জন্য এক চিরন্তন নির্দেশনা হয়ে আছে যে, আল্লাহর কাছে বাহ্যিক আড়ম্বর বা বস্তুর পরিমাণ মুখ্য নয়; বরং অন্তরের বিশুদ্ধতা ও ইখলাসই হলো গ্রহণযোগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি।

এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি আমাদের আরো একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম বিষয় শেখায়। মানুষ যখন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোনো সৎকর্ম করে, তখন তার সেই কাজের মূল্যায়ন হয় কেবল নিয়তের ভিত্তিতে। নিয়ত বিশুদ্ধ হলে জাগতিক দৃষ্টিতে ছোট বা নগণ্য কাজও আল্লাহর দরবারে পাহাড়সম ভারী হয়ে যায়, আর নিয়ত দূষিত হলে বা লোকদেখানোর প্রবণতা থাকলে বিশাল মহৎ কাজও মূল্যহীন ও প্রত্যাখ্যাত হয়ে পড়ে। এই শিক্ষা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য। আমাদের ইবাদত, আমাদের কর্মক্ষেত্র, আমাদের পারস্পরিক সম্পর্ক, এমনকি আমাদের মেধা ও যোগ্যতার প্রয়োগ, সবকিছুর মধ্যেই এই ঐকান্তিক আন্তরিকতা থাকা অপরিহার্য।

ইবরাহিমি চেতনা : নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের চূড়ান্ত মানদণ্ড
ইতিহাসের নানা পরিক্রমায় কোরবানি অনুষ্ঠিত হলেও এর প্রকৃত ও পূর্ণাঙ্গ আদর্শ প্রতিফলিত হয়েছে মুসলিম মিল্লাতের পিতা সায়্যিদুনা ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর বর্ণাঢ্য জীবনে। আল্লাহর পক্ষ থেকে যখন তাঁকে তাঁর প্রাণপ্রিয় পুত্র সায়্যিদুনা ইসমাঈল আলাইহিস সালাম-কে কোরবানি করার নির্দেশ দেয়া হলো, তখন তিনি বিন্দুমাত্র দ্বিধা, শঙ্কা বা কালক্ষেপণ না করে সেই নির্দেশ পালন করতে প্রস্তুত হলেন। এটি কোনো সাধারণ পরীক্ষা ছিল না; বরং মানব-ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন মানসিক, আবেগিক ও আধ্যাত্মিক অগ্নিপরীক্ষা ছিল। একজন স্নেহশীল পিতার জন্য তার ঔরসজাত সন্তানের চেয়ে প্রিয় আর কিছু হতে পারে না। তাও আবার সেই পুত্র, যাকে তিনি লাভ করেছিলেন জীবনের পড়ন্ত বেলায়, বার্ধক্যের শেষ প্রান্তে পৌঁছে, দীর্ঘ দোয়া ও রোনাজারির পর। অথচ আল্লাহর সন্তুষ্টি ও রুবুবিয়াতের দাবির সামনে তিনি সেই প্রিয়তম বস্তুকেই উৎসর্গ করতে ইস্পাতকঠিন সংকল্প গ্রহণ করলেন।

এই ঘটনার মধ্যে আমরা যে গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য খুঁজে পাই, তা হলো মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার জ্ঞান বা ক্ষমতায় নয়, বরং তার নিঃশর্ত আনুগত্যে। মানুষ যত বড়ই হোক, যত অভাবনীয় প্রতিভার অধিকারী বা ক্ষমতাবানই হোক, যদি সে তার স্রষ্টার নির্দেশ মানতে ব্যর্থ হয়, তবে তার সেই বড়ত্ব নিছক অহংকার ছাড়া আর কিছুই নয়। আর যে ব্যক্তি নিজের সমস্ত আবেগ ও যুক্তিকে পাশ কাটিয়ে নিঃশর্তভাবে আল্লাহর নির্দেশ পালন করে, সে-ই দুনিয়া ও আখিরাতে প্রকৃত সম্মানের অধিকারী।

সায়্যিদুনা ইসমাঈল আলাইহিস সালাম-এর ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত বিস্ময়কর ও তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি যখন পিতার কাছ থেকে এই নির্দেশ ও স্বপ্নের কথা শুনলেন, তখন তিনি কোনো বিদ্রোহ করেননি, পালানোর চেষ্টা করেননি; বরং ধৈর্য, প্রশান্তি ও আনুগত্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। তিনি প্রশান্ত চিত্তে বললেন, ‘হে আমার পিতা! আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী যা আদেশ করা হয়েছে, তা পালন করুন, ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।’ এই একটিমাত্র বাক্যের মধ্য দিয়ে একজন কিশোর সন্তানের পক্ষ থেকে স্রষ্টা ও পিতার প্রতি সর্বোচ্চ আত্মসমর্পণের যে দৃষ্টান্ত ফুটে ওঠে, তা কিয়ামত পর্যন্ত আগত প্রতিটি প্রজন্মের জন্য এক আলোকবর্তিকা।

এই অভাবনীয় আত্মত্যাগের ঘটনাটি কেবল একটি ঐতিহাসিক বা পৌরাণিক কাহিনী নয়; বরং এটি মানুষের জীবনে আল্লাহর প্রতি পরম নির্ভরতা ও তাওয়াক্কুলের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মহান আল্লাহ পিতা-পুত্রের এই ত্যাগকে এতটাই মর্যাদা দিয়েছেন যে, কিয়ামত পর্যন্ত সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য এটিকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন ও ইবাদত হিসেবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন। প্রতি বছর জিলহজ মাসে সারা বিশ্বের মুসলিমরা পশু কোরবানির মাধ্যমে মূলত সেই ইবরাহিমি স্মৃতিকেই পুনরুজ্জীবিত করে এবং নিজেদের জীবনেও অনুরূপ ত্যাগের চেতনা ধারণ করার দীপ্ত অঙ্গীকার করে।

কোরবানির আত্মিক ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য : নফসের পরিশুদ্ধি
‘কোরবানি’ শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থের মধ্যেই এর প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত রয়েছে। আরবি ‘কোরবান’ শব্দের মূল ধাতু হলো ক্বাফ-রা-বা, যার অর্থ হলো নিকটবর্তী হওয়া বা নৈকট্য অর্জন করা। অর্থাৎ, কোরবানি হলো এমন একটি ইবাদত বা মাধ্যম, যার দ্বারা বান্দা তার রবের নৈকট্য লাভের চেষ্টা করে। তবে এই নৈকট্য কোনো পশুর রক্ত প্রবাহিত করা বা মাংস ভক্ষণের মাধ্যমে অর্জিত হয় না। কোরআন মাজিদে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করা হয়েছে- ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না এগুলোর গোশত বা রক্ত; বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।’ [সুরা হজ (২২) : ৩৭]

এই আয়াত আমাদের একটি অত্যন্ত গভীর ও শাশ্বত সত্যের বার্তা দেয়। কোরবানির মূল উদ্দেশ্য সমাজে নিজের আভিজাত্য বা সম্পদের বাহ্যিক প্রদর্শন নয়; বরং এর মূল লক্ষ্য হলো আত্মিক পরিশুদ্ধি বা তাজকিয়ায়ে নফস। তাই কোরবানির প্রকৃত শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত হলো নিজের ভেতরের অহংকার, লোকদেখানো প্রবৃত্তি (রিয়া), পার্থিব লোভ, হিংসা ও স্বার্থপরতাকে চিরতরে বিসর্জন দেয়া। পশু জবাই করার সময় যখন ছুরি চালানো হয়, তখন তার পাশাপাশি নিজের নফসের পশুত্ব, ক্রোধ ও অহমিকা নামক অদৃশ্য পশুটিকেই জবাই করাই হলো কোরবানির প্রকৃত মহিমা।

মানুষের ভেতরে যে প্রবৃত্তি বা ‘নফসে আম্মারা’ কাজ করে, তা তাকে প্রতিনিয়ত ভুল পথে, পাপের পথে পরিচালিত করতে চায়। এই নফসের প্ররোচনায় পড়েই মানুষ সমাজে অন্যায় করে, দুর্বলের অধিকার হরণ করে, নিজেকে সর্বেসর্বা ভাবতে শুরু করে। কোরবানি সেই উদ্দাম নফসকে লাগাম পরানোর একটি প্রতীকী ও ব্যবহারিক অনুশীলন। এটি মানুষকে শেখায়, বাইরের শত্রুর চেয়ে নিজের ভেতরের দুর্বলতাগুলো অনেক বেশি ভয়ংকর এবং সবার আগে সেই ভেতরের শয়তানকে জয় করতে হবে। আত্মশুদ্ধির এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে মানুষকে আল্লাহভীরু, বিনয়ী এবং সমাজের প্রতি ন্যায়পরায়ণ করে তোলে।

এর পাশাপাশি কোরবানির আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক শিক্ষা হলো কৃতজ্ঞতা বা শোকর। মানুষ যখন গভীরভাবে উপলব্ধি করে যে তার সম্পদ, তার জীবন, তার সুস্থতা, সবকিছুই মহান আল্লাহর দেয়া এক একটি অমূল্য নিয়ামত, এবং সেই নিয়ামতের সামান্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্যই সে কোরবানি আদায় করছে, তখন তার অন্তরে এক অনাবিল প্রশান্তি ও কৃতজ্ঞতার অনুভূতি জাগ্রত হয়। এই কৃতজ্ঞতাবোধই মানুষকে সম্পদের মোহ ও অহংকার থেকে বহু দূরে রাখে এবং তাকে বিনয়ী ও পরোপকারী করে তোলে।

অর্থনৈতিক ভারসাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় কোরবানি
কোরবানি শুধু একটি আধ্যাত্মিক ইবাদতই নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক অর্থনৈতিক চিন্তাভাবনাকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ইসলামী অর্থব্যবস্থার অন্যতম মূলনীতি হলো সম্পদ যেন কেবল সমাজের গুটিকয়েক ধনীর হাতে কুক্ষিগত না থাকে, বরং তা যেন সমাজের সর্বস্তরে আবর্তিত হয়। কোরবানি এই নীতিরই একটি চমৎকার প্রায়োগিক রূপ। এটি আমাদের শেখায়, কষ্টার্জিত সম্পদ শুধু নিজের ও নিজ পরিবারের ভোগের জন্য নয়; বরং সমাজের বৃহত্তর কল্যাণে তা ব্যয় করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। একজন সামর্থ্যবান মানুষ যখন তার হালাল অর্থ দিয়ে কোরবানি করে এবং তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সমাজের অভাবী ও দরিদ্রদের মধ্যে হাসিমুখে বিতরণ করে, তখন সে প্রকৃত অর্থে সম্পদের ওপর তার আসক্তিকে জয় করে এবং সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে।

বর্তমান আধুনিক বিশ্বে অর্থনৈতিক বৈষম্য বা অসমতা একটি ভয়াবহ বৈশ্বিক সঙ্কট হিসেবে দেখা দিয়েছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ফলে একদিকে অল্প কিছু মানুষের হাতে পাহাড়সম সম্পদ জমা হচ্ছে, অন্যদিকে অসংখ্য মানুষ ন্যূনতম পুষ্টি ও দারিদ্র্যের চরম কষ্টে দিনাতিপাত করছে। এই আকাশ-পাতাল বৈষম্য সমাজে চুরি, ছিনতাই, হতাশা ও নানাবিধ অস্থিরতা সৃষ্টি করে। কোরবানি এই বৈষম্য কমানোর একটি অত্যন্ত বাস্তবধর্মী ও কার্যকর উপায় হিসেবে কাজ করে। এই ইবাদত ধনীকে তার সামাজিক দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করে এবং দরিদ্রকে এই অনুভূতি দেয় যে সমাজে তারও সম্মান ও অধিকার রয়েছে। এর ফলে সমাজে এক ধরনের অর্থনৈতিক ভারসাম্য তৈরি হয়।

ভ্রাতৃত্ববোধ ও সামাজিক সম্প্রীতির নবজাগরণ
কোরবানির সামাজিক তাৎপর্য কোনোভাবেই অস্বীকার করার উপায় নেই। ইসলামী শরীয়তের নির্দেশনা ও মুস্তাহাব আমল অনুযায়ী, কোরবানির গোশত সাধারণত তিন ভাগে বিভক্ত করে একটি অংশ সম্পূর্ণ দরিদ্র ও অসহায়দের মধ্যে বিতরণ করা হয়, একটি অংশ আত্মীয়স্বজনের জন্য রাখা হয় এবং অবশিষ্ট অংশ নিজের পরিবারের জন্য বরাদ্দ থাকে। এই সুষম বণ্টনব্যবস্থার ফলে সমাজের সেই সকল সুবিধাবঞ্চিত মানুষ, যারা হয়তো সারা বছর গোশত কিনে খাওয়ার সামর্থ্য রাখে না, তারাও ঈদের এই পবিত্র আনন্দে সমানভাবে শরিক হওয়ার সুযোগ পায়। তারা এই দিনে শুধু পুষ্টিকর খাদ্যই পায় না; বরং সমাজের মূলধারার সাথে নিজেদের গভীরভাবে সম্পৃক্ত অনুভব করে।

এই অভাবনীয় বণ্টনব্যবস্থা মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা, সহানুভূতি ও নিবিড় ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি করে। যখন একজন সচ্ছল মানুষ নিজ হাতে দরিদ্র প্রতিবেশীর দোরগোড়ায় গিয়ে গোশত পৌঁছে দেয় এবং অন্যের মুখে হাসি ফোটাতে শেখে, তখন তার মধ্যে সুপ্ত থাকা মানবিকতা পূর্ণরূপে জাগ্রত হয়। এই জাগ্রত মানবিকতাই একটি সুস্থ, সুন্দর ও অপরাধমুক্ত সমাজ গঠনের মূল ভিত্তিপ্রস্তর।

কোরবানি আমাদের দুর্বল হয়ে যাওয়া পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনকেও অত্যন্ত দৃঢ় করে। যান্ত্রিক এই যুগে মানুষ যখন নিজের কর্মব্যস্ততায় আবদ্ধ, তখন ঈদের এই সময়টিতে মানুষ আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও দীর্ঘদিনের বন্ধুদের সাথে সম্পর্ক পুনর্গঠনের (হাদিসের ভাষায়- ‘সিলাতুর রাহিম’) সুবর্ণ সুযোগ পায়। একে অপরের বাড়িতে যাওয়া, একসাথে বসে খাবার ভাগাভাগি করা, হাসিমুখে খোঁজখবর নেয়া, এসব ছোট ছোট সামাজিক শিষ্টাচারের মাধ্যমে সমাজে এক ধরনের অভাবনীয় উষ্ণতা, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য সৃষ্টি হয়।

প্রযুক্তিনির্ভর এই আধুনিক যুগে, যেখানে মানুষ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে ক্রমেই একাকীত্ব ও বিষণ্ণতায় ভুগছে, সেখানে কোরবানি আমাদের এই বাস্তব ও শারীরিক সামাজিক যোগাযোগ পুনরুজ্জীবিত করতে সহায়তা করে। এটি প্রতিটি ব্যক্তিকে মনে করিয়ে দেয়, সে একা কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপের বাসিন্দা নয়; বরং সে একটি বৃহৎ, প্রাণবন্ত ও দায়িত্বশীল সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই সামাজিক অন্তর্ভুক্তি মানুষের মানসিক প্রশান্তি ও সুস্থতার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মুসলিম বিশ্বের মিলনমেলা : হজের সাথে কোরবানির আত্মিক সেতুবন্ধন
কোরবানির আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বৈশ্বিক দিক হলো এর ঐক্যের অবিস্মরণীয় বার্তা। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে, বিভিন্ন টাইম জোনে বসবাসকারী কোটি কোটি মুসলিম যখন একই জিলহজ মাসে, একই তারিখে, একই অভিন্ন উদ্দেশ্যে কোরবানি আদায় করে, তখন এটি এক বিরল ও অভূতপূর্ব ঐক্যের প্রতীক হয়ে ওঠে। ভৌগোলিক সীমারেখা, ভাষাগত পার্থক্য, গায়ের রঙ বা সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য অতিক্রম করে সমগ্র মুসলিম উম্মাহ একটি একক ও অভিন্ন চেতনায় একত্রিত হয়।

জিলহজ মাসের চাঁদ উদিত হওয়ার পর থেকেই এবং বিশেষত আরাফার দিন থেকে সারা বিশ্বে ধ্বনিত হতে থাকে তাকবিরে তাশরিক- ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ।’ এই ধ্বনি শুধু একটি প্রথাগত ধর্মীয় উচ্চারণই নয়; এটি সমগ্র মুসলিম বিশ্বের একতার এক জীবন্ত স্পন্দন। আফ্রিকার উত্তপ্ত মরুপ্রান্তর থেকে শুরু করে এশিয়ার সবুজ জনপদ, ইউরোপের তুষারাবৃত নগর থেকে আমেরিকার ব্যস্ত শহর, সর্বত্র একই সুরে, একই ভাষায় উচ্চারিত হয় মহান স্রষ্টার মহিমা। এই ধ্বনি প্রমাণ করে যে, ভাষা ও ভূখণ্ডের ভিন্নতা থাকলেও মুমিনদের হৃদয় এক সুতোয় গাঁথা।

এই ঐক্যের চূড়ান্ত ও সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন রূপ আমরা হজের পবিত্র আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে দেখতে পাই। মক্কার পবিত্র ভূমিতে যখন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসা লাখ লাখ মুসলিম একত্রিত হয়, তখন সেখানে সৃষ্টি হয় এক অনন্য ও বর্ণনাতীত দৃশ্যপট। সমস্ত পার্থিব পোশাক ও পদমর্যাদা ত্যাগ করে, দুই টুকরো সাদা সেলাইবিহীন ইহরামের পোশাকে আবৃত হয়ে সবাই এক কাতারে দাঁড়ায় আল্লাহর সামনে। এখানে কোনো দেশের রাষ্ট্রপতির সাথে একজন সাধারণ দিনমজুরের কোনো পার্থক্য থাকে না; ধনী ও দরিদ্রের কোনো ভেদাভেদ থাকে না। এই দৃশ্য মানবতার সমতা ও সাম্যের এক মহৎ বার্তা বহন করে।

আরাফাতের বিস্তীর্ণ ময়দানে এই বিশাল সমাবেশ যেন কিয়ামতের দিনের হাশরের ময়দানেরই এক ক্ষুদ্র ঝলক। এখানে মানুষ তার সকল পার্থিব অহংকার, পদবি ও পরিচয় ভুলে গিয়ে কেবল ‘বান্দা’ হিসেবে পরম করুণাময়ের সামনে কান্নায় ভেঙে পড়ে। হজের এই অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা মানুষকে পাপমুক্ত করে এবং নতুনভাবে, পরিশুদ্ধ চিত্তে জীবন শুরু করার এক অদম্য প্রেরণা দেয়। হজ ও কোরবানি মিলে জিলহজ মাসকে পরিণত করে মুসলিম উম্মাহর এক বিশাল আন্তর্জাতিক মিলনমেলায়।

সমকালীন বিশ্ববাস্তবতা ও উম্মাহর সংকট উত্তরণে কোরবানির শিক্ষা
সমসাময়িক বিশ্বে আমরা যদি দৃষ্টি নিবদ্ধ করি, তবে দেখতে পাই, মুসলিম উম্মাহ আজ বহুমুখী নানা সংকটে জর্জরিত। কোথাও চলছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আগ্রাসন ও যুদ্ধ, কোথাও চরম দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষ, আবার কোথাও রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল। এই ভয়াবহ ও হতাশাজনক পরিস্থিতিতে কোরবানি এবং ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর ইতিহাস আমাদের ধৈর্য, চরম ত্যাগ ও কেবল এক আল্লাহর ওপর ভরসা (তাওয়াক্কুল) করার গুরুত্ব নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়।

ফিলিস্তিনের গাজা, সিরিয়া, ইয়েমেন বা অন্য যেকোনো সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে বসবাসকারী আমাদের মজলুম মুসলিম ভাই-বোনদের যে অবর্ণনীয় জীবন সংগ্রাম, তা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, বড় কোনো আদর্শিক বিজয় বা স্বাধীনতা চরম ত্যাগ স্বীকার ছাড়া কখনোই সম্ভব নয়। তারা প্রতিদিন তাদের জান, মাল ও সন্তান-সন্ততিকে আল্লাহর রাহে উৎসর্গ করছে। তাদের এই বাস্তব জীবন আমাদের জন্য ইবরাহিমি ত্যাগের এক জীবন্ত ও সমকালীন পাঠ।

এই রূঢ় বাস্তবতায় কোরবানি আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, পরিস্থিতি যতই প্রতিকূল ও শ্বাসরুদ্ধকর হোক না কেন, চূড়ান্ত ফয়সালার জন্য কেবল আল্লাহর ওপরই ভরসা রাখতে হবে এবং বাতিলের সামনে মাথা নত না করে সত্যের পথে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকতে হবে। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম যেমন অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হওয়ার সময়ও অবিচল ছিলেন, ঠিক তেমনি মুমিনকেও তার ঈমানের ওপর অটল থাকতে হবে। এই নিঃস্বার্থ ত্যাগই একদিন সমস্ত জুলুমের অবসান ঘটিয়ে সফলতার রুদ্ধদ্বার উন্মুক্ত করে দেবে।

কোরবানি এক পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন
আমরা যদি প্রথাগত আনুষ্ঠানিকতার খোলস থেকে বেরিয়ে সত্যিকার অর্থে কোরবানির অন্তর্নিহিত শিক্ষা ও দর্শন গ্রহণ করতে পারি, তবে আমাদের ব্যক্তিগত জীবন, আমাদের পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র সবক্ষেত্রেই একটি যুগান্তকারী ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে বাধ্য। ব্যক্তিজীবনের দুর্নীতি, সামাজিক অন্যায়, অপরের সম্পদ গ্রাস করার লোভ ও আত্মকেন্দ্রিক স্বার্থপরতা দূর করে একটি ইনসাফভিত্তিক ও কল্যাণকামী সমাজ গড়ে তোলা কেবল তখনই সম্ভব, যখন প্রতিটি নাগরিকের অন্তরে ত্যাগের এই মানসিকতা জাগ্রত হবে।

পরিশেষে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলা যায়, কোরবানি স্রেফ একটি বাৎসরিক আনুষ্ঠানিক ইবাদত বা গোশত খাওয়ার উৎসব নয়; এটি মুমিনের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন। এটি আমাদের হাতে-কলমে শেখায়, কিভাবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের সবচেয়ে প্রিয় ও কাঙ্ক্ষিত জিনিসটি ত্যাগ করতে হয়, কিভাবে নিজের ভিতরের অদম্য নফস বা প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয় এবং কিভাবে আত্মকেন্দ্রিকতার দেয়াল ভেঙে সমাজের বৃহত্তর কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করতে হয়।

জিলহজ মাসের এই মহান বৈশ্বিক মিলনমেলা আমাদের আত্মিক ঐক্যকে আরো সুদৃঢ় ও শক্তিশালী করে, আমাদের কলুষিত আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে এবং আমাদেরকে একটি ভ্রাতৃত্বপূর্ণ, সুন্দর ও আলোকিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে নিরন্তর অনুপ্রাণিত করে।

ত্যাগের এই মহান, শাশ্বত ও ইবরাহিমি শিক্ষা যদি আমাদের ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনের প্রতিটি স্তরে সত্যিকার অর্থে প্রতিফলিত হয়, তবে সমাজ থেকে যাবতীয় অন্যায়, অবিচার, জুলুম ও স্বার্থপরতার ঘন অন্ধকার চিরতরে দূর হয়ে যাবে এবং সেখানে প্রতিষ্ঠিত হবে ইনসাফ, সাম্য, মানবতা ও শান্তির এক অনাবিল পরিবেশ।

মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে নিছক আনুষ্ঠানিকতার ঊর্ধ্বে উঠে কোরবানির প্রকৃত ঐশী শিক্ষা ও দর্শন গভীরভাবে অনুধাবন করার এবং তা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে বাস্তবায়ন করার পূর্ণ তাওফিক দান করুন। আমীন।