মুহাম্মদ হানিফ ভুঁইয়া নোয়াখালী অফিস
দীর্ঘ কয়েক যুগ অতিবাহিত হওয়ার পরও ৫০০ শয্যার নোয়াখালী মেডিক্যাল কলেজ ‘হাসপাতালের অবকাঠামো এখনো নির্মিত হয়নি।’ এতে বৃহত্তর নোয়াখালীর লাখ লাখ মানুষ উন্নত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তার পাশাপাশি মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থীদেরকে ১০ কিলোমিটার দূরের ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে প্রাক্টিক্যাল করতে হচ্ছে।
১৯৮০ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান জেলা শহর মাইজদী জেনারেল হাসপাতাল সড়কের পাশে মধুপুর মৌজায় নোয়াখালী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জন্য সরকার ভূমিও অধিগ্রহণ করে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর প্রেসিডেন্ট এরশাদ ক্ষমতায় এসে নোয়াখালী মেডিক্যাল কলেজ এবং হাসপাতালের পুরো প্রজেক্ট বাতিল করে দেন। মাইজদী মধুপুর হীরামন কুঠিরে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পাথরটি এখনো কালের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে।
এদিকে বেগমগঞ্জ উপজেলাধীন ঢাকা-নোয়াখালী মহাসড়কের পশ্চিম পাশে মনোরম পরিবেশে বিশিষ্ট শিল্পপতি পারটেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান ১৯৯৯ সালে এম এ হাসেম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল নির্মাণের জন্য ২৬ একর ১৫ শতাংশ ভূমি সরকার থেকে বন্দোবস্ত নেন। এরপর এম এ হাসেম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সাইন বোড ঝুলিয়ে দিয়ে তিনি ভূমি ভরাটের কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু ১/১১ সরকার এসে এম এ হাসেমের বন্দোবস্তটি বাতিল করে দিয়ে সেখানে পুনরায় নোয়াখালী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করে।
কিন্তু পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল নির্মাণের স্থান কোথায় হবে, মাইজদী নাকি বেগমগঞ্জে- এটা নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে শুরু হয় রশি টানাটানি। বেশ কিছুদিন অঘোষিত যুদ্ধ চলে আওয়ামী নেতাদের মধ্যে। অবশেষে বেগমগঞ্জে এই মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু নোয়াখালী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের নাম বাতিল করে জাতীয় সংসদের আওয়ামী লীগের সাবেক স্পিকার আ: মালেক উকিলের নামে মেডিক্যাল কলেজটির নামকরণ করা হয় ‘আ: মালেক উকিল মেডিক্যাল কলেজ’।
এরপর বেগমগঞ্জে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য নুরুল হক মিয়ার নামে শুধু হাসপাতালটির নামকরণ করা হয় ‘নুরুল হক আধুনিক হাসপাতাল’। এতে আ: মালেক উকিল মেডিক্যাল কলেজটি চালু হলে ও নুরুল হক মিয়ার নামে করা হাসপাতালটি আর চালু হয়নি। এমনকি হাসপাতালের অবকাঠামোও নির্মিত হয়নি।
অন্যদিকে ২০১৭ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন স্বাস্থ্য মন্ত্রী মো: নাসিম মেডিক্যাল কলেজের পাশে নুরুল হক হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। কিন্তু ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পর দীর্ঘ ৮ বছর অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত অবকাঠামো নির্মাণের কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এরপর শুরু হয় জুলাই বিপ্লব। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী সরকারের পতনের পর পুরো প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করে শুধু নোয়াখালী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল করা হয়।
এখানে হাসপাতাল নির্মিত না হওয়ায় মেডিক্যাল কলেজের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীদের নোয়াখালী ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে প্রাক্টিক্যাল করার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দেয়া হয়েছে। ফলে মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থীরা প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে প্রাক্টিক্যাল করতে গিয়ে নানা দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। হাসপাতাল না হওয়ায় নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুরের প্রায় কোটি মানুষ উন্নত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। হাসপাতাল না হওয়ায় উন্নত চিকিৎসায় জন্য জটিল রোগীরা ১২০ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করে ঢাকা আসতে হয়। প্রচুর ব্যস্ত ও যানজটপূর্ণ সড়ক পথে ঢাকায় আসতে গিয়ে ধকল সামলাতে না পেরে অনেক রোগী পথিমধ্যেই মৃত্যুমুখে পতিত হন।
হাসপাতালের বিষয় জানতে চাইলে নোয়াখালী মেডিক্যাল কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ডা: আমিনুর রহমান বলেন, আমি নতুন এসেছি। হাসপাতালের বিষয় সম্পর্কে কিছুই জানি না। এ বিষয় হাসপাতালের প্রজেক্ট ডিরেক্টর আমার চেয়ে ভালো বলতে পারবেন।
নোয়াখালী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের প্রজেক্ট ডিরেক্টর ডা: আমজাদুল হক বলেন, হাসপাতালটির কাজ বর্তমানে স্থগিত। সম্প্রতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে স্থগিত আদেশ প্রত্যাহার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অবকাঠামো নির্মাণের জন্য বিদ্যুতের দু’টি লাইন সরানোরও প্রয়োজন। তার মধ্যে একটি লাইন সরানো হয়েছে। অন্যটি সরানোর কাজ এখনো শুরু হয়নি। আশা করা যায় কিছু দিনের মধ্যে অবকাঠামো নির্মাণের কাজ শুরু হবে।



