নয়া দিগন্ত ডেস্ক
দেশে ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরো ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে বলে নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। বাকি পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে উপসর্গ নিয়ে।
গতকাল স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে এ তথ্য জানানো হয়।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চের পর থেকে এ পর্যন্ত হামে ৭৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সন্দেহভাজন হামজনিত মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৮৪ জনে।
১৫ মার্চের পর থেকে এ পর্যন্ত নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছেন সাত হাজার ৭৬৭ জন। একই সময়ে সন্দেহভাজন হামে আক্রান্তের সংখ্যা ৫৭ হাজার ৮৪৬ জন।
এখন পর্যন্ত হাম সন্দেহে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪২ হাজার ৯২ জন এবং সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছেন ৩৭ হাজার ৭৪৪ জন। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি। এ বিভাগের হাম ও উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ২০০ জন ও আক্রান্ত ৩১ হাজার ৫৬৫ জন।
রমেক মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ৫
রংপুর ব্যুরো জানায়, রংপুর মেডিক্যাল কলেজ (রমেক) হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে হামের উপসর্গ নিয়ে আরো এক শিশু মারা গেছে। এ নিয়ে এই হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেল মোট পাঁচ শিশু। এ ছাড়াও এই বিভাগে হাম শনাক্ত হয়েছে ৬০ জনের।
গতকাল বেলা ১১টায় এই তথ্য জানান রমেক হাসপাতালের হাম চিকিৎসার বিশেষ কমিটির ফোকালপার্সন ডা: আনম তানভীর চৌধুরী। তিনি জানান, শনিবার দিবাগত রাতে আইসোলেশন বিভাগের চিকিৎসাধীন ৯ মাসের শিশু মনি আক্তার মারা যায়। হামের পাশাপাশি সে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ছিল। তার একটি অপারেশনও হয়েছিল। ঠাকুরগাঁও হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার পর ১০ মে শিশুটিকে এই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। তার বাবার নাম মাহবুব হোসেন। বাড়ি ঠাকুরগাঁও সদরে। এ নিয়ে এই হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে মোট পাঁচ শিশু মৃত্যু হলো। রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ডা: ওয়াজেদ আলী জানান, আমরা সতর্ক আছি। মাঠকর্মীরাও কাজ করছেন। উপসর্গ দেখামাত্রই হাসপাতালে নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। তবে এই বিভাগে হামের পরিস্থিতি এখনো ভালো আছে। ভবিষ্যতে কী হবে সেটা বলা যাচ্ছে না।
মমেকে হাম প্রদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণহীন
ময়মনসিংহ অফিস জানায়, ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ (মমেক)-হাসপাতালে হাম ও উপসর্গে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যু এখন যেন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। টিকা নেয়ার আগেই একের পর এক শিশুর প্রাণ ঝরে পড়ছে যা দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভয়াবহ দুর্বলতাকে নগ্নভাবে সামনে এনেছে।
গত ১৩ মে পর্যন্ত তথ্যে দেখা যায়, এই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে ৩১ শিশু। উদ্বেগজনক বিষয় হলো তাদের প্রায় ৭৭ শতাংশই ৯ মাসের কম বয়সী, অর্থাৎ যাদের হামের টিকা নেয়ার ন্যূনতম বয়সই পূর্ণ হয়নি। প্রশ্ন উঠছে, এই শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে কে?
চিকিৎসা বিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী, শিশুদের ৯ মাস বয়সে হামের প্রথম ডোজ দেয়া হয়। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, সেই বয়সে পৌঁছানোর আগেই সংক্রমণে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মৃত ৩১ শিশুর মধ্যে ২৪ জনের বয়স ছিল ০ থেকে ৯ মাস। তাদের মধ্যে ১৮ জন ছেলে ও ছয়জন মেয়ে। ১০ থেকে ১৫ মাস বয়সী চারজন সবাই ছেলে। ১৫ মাসের বেশি বয়সের দুইজনের মধ্যে একজন ছেলে ও একজন মেয়ে। একটি শিশুর বয়সের তথ্যই অনুপস্থিত- যা তথ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
মৃতদের বেশির ভাগই ময়মনসিংহ জেলার বাসিন্দা। এ ছাড়া নেত্রকোনা, জামালপুর, কিশোরগঞ্জ, শেরপুর ও টাঙ্গাইল থেকেও মৃত্যুর খবর এসেছে। অর্থাৎ এটি কোনো একক জেলার সমস্যা নয়, পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া এক ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৯ মাসের আগে টিকা দেয়া না গেলেও প্রতিরোধের বিকল্প পথ রয়েছে। গর্ভবতী মায়েদের টিকাদান নিশ্চিত করা, শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়ানো এসব ক্ষেত্রেই বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে।
চৌদ্দগ্রামে শিশুর মৃত্যু
চৌদ্দগ্রাম(কুমিল্লা) সংবাদদাতা জানান, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে হামে আক্রান্ত হয়ে সাজিদ আল নাহিয়ান নামে সাত মাসের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সে উপজেলার মুন্সিরহাট ইউনিয়নের সিংরাইশ গ্রামের দুবাইয়ের ব্যবসায়ী পারভেজ আহমেদ সুমনের ছেলে। রোববার বিকেলে তথ্য নিশ্চিত করেছেন নিহতের মামা সাংবাদিক এএফএম রাসেল পাটোয়ারি।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, সাজিদ আল নাহিয়ানের জ্বর, সর্দি-কাশি শুরু হলে গত ১৪ এপ্রিল চৌদ্দগ্রাম বাজারস্থ একটি প্রাইভেট হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে এন্টিবায়োটিক ওষুধ খাওয়ানোর পর কিছুটা সুস্থ হয়। এরপর আবারো ১২ মে অসুস্থ হলে চৌদ্দগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। সেখানে দুই দিন চিকিৎসার পর অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তাকে ঢাকা শিশু হাসপাতাল, ন্যাশনাল হেলথ কেয়ার হসপিটাল ও পরে তেজগাঁও ইনপালস্ হসপিটালে ভর্তি করা হয়। সেখানে পরীক্ষা-নীরক্ষা শেষে সাজিদ হামে আক্রান্ত হয়েছে জানায়। রোববার সকালে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সে মারা যায়।
চট্টগ্রামে ৩ শিশুর মৃত্যু
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, হামের উপসর্গ নিয়ে ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম জেলায় ৭৭ শিশু নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। গতকাল এ তথ্য জানিয়েছেন চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তসলিম উদ্দীন। তিনি জানান, ২৪ ঘণ্টায় এ হাসপাতালে হাম সন্দেহে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হামের চিকিৎসায় হাসপাতালে সব ধরনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। হাম রোগীদের জন্য আলাদা ইউনিটও করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
এ দিকে, চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন কার্যালয়ের প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জেলায় বর্তমানে সন্দেহজনক হাম রোগে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি রয়েছেন ৭৭ জন। এর মধ্যে মহানগরে ৭২ জন এবং ১৫ উপজেলায় পাঁচজন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম নিয়ে মোট ভর্তি হয়েছেন এক হাজার ৫৮৩ জন। এ ছাড়া সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন এক হাজার ৪৫৩ জন।
সিলেটে আরো ১ শিশুর মৃত্যু
সিলেট ব্যুরো জানায়, সিলেটে হামের উপসর্গ নিয়ে আরো এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া ৯ মাসের শিশু নিজাম সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার বাসিন্দা।
এ নিয়ে সিলেট বিভাগে হামে আক্রান্ত হয়ে ও উপসর্গ নিয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫ জনে। এর মধ্যে চারজনের হাম নিশ্চিত হওয়া গেছে। বাকি ৩১ শিশু হাম উপসর্গে মারা যান।
গতকাল এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের সিলেট বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা: নুরে আলম শামীম।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদফতর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ল্যাব পরীক্ষায় সিলেট বিভাগে নতুন কারো হাম নিশ্চিত না হলেও এই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৭৮ শিশু। এ দিকে বর্তমানে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন মোট ৩২১ জন শিশু।
২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১৭ মে পর্যন্ত সিলেট বিভাগে মোট ১৪৯ জন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে হবিগঞ্জ ১৬ (২ জন রুবেলা), মৌলভীবাজারের ১৬, সুনামগঞ্জের ৭৫ ও সিলেটের ৪২ জন রয়েছেন।



