ডা: আহাদ আদনান
নবজাতক থেকে শুরু করে জন্মের প্রথম কয়েক সপ্তাহ, এমনকি প্রথম বছরের পরও মায়েরা শিশুর বুক ঘর্ঘর সমস্যা নিয়ে আমাদের কাছে আসেন। তাদের ভাষায় সমস্যাটি কয়েকভাবে প্রকাশ পায়। যেমন- শিশুর বুকে (অথবা নাক কিংবা গলা) ঘর্ঘর শব্দ হয়। কারো ভাষায় শিশুর শুকনো ঠাণ্ডা লেগেছে, যেখানে কাশি বা নাকে পানি নেই কিন্তু ঘুমের সময় প্রচণ্ড শব্দ হয়। অনেকেই বুকের উপরের অংশ শ্বাস ভেতরে টানার সময় ভেতরে ঢুকে যেতে দেখেন।
আমরা কয়েকটি ব্যাপার নিশ্চিত হতে চাই। শিশুর খাওয়া, ওজন বৃদ্ধি ঠিকমতো হচ্ছে কি-না। সাথে অন্য সমস্যা, যেমন- জ্বর, শ্বাসকষ্ট, ঘনঘন অসুস্থতা আছে কিনা। শিশুকে চিৎ অবস্থা থেকে কাত করে শোয়ালে শব্দ কম হয় কি-না। অধিকাংশ মা জানান, কাত করে শুইয়ে দিলে ঘর্ঘর হয় না বললেই চলে। ঘুম থেকে জাগলে শিশু হাসিখুশি সুস্থ থাকে। এরকম আপাত সুস্থ শিশুর গলা/বুকের ঘর্ঘর সমস্যা আমরা প্রায়ই নির্ণয় করি ‘ল্যারিঙ্গোম্যালাশিয়া’।
আমাদের গলার সামনের দিকে পাইপের মতো যে অঙ্গ থাকে তাকে বলে শ্বাসনালি বা ট্র্যাকিয়া। এর মধ্য দিয়ে অক্সিজেন ফুসফুসে প্রবেশ করে। নাক আর ট্র্যাকিয়ার মধ্যে একটি পর্দার মতো অঙ্গ থাকে, যাকে বলে ল্যারিংক্স। এটা যদি কারো নরম বা দুর্বল থাকে তাহলে শ্বাস টানার সময় ভেতরের দিকে ঢুকে যায় আর বাঁশির মতো শব্দ হয়। এটিই ল্যারিঙ্গোম্যালাশিয়া।
জন্মের কয়েক দিন বা সপ্তাহ থেকে সমস্যাটি শুরু হতে পারে, ছয়-সাত মাসের দিকে সবচেয়ে বেশি শব্দ হয় আবার এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে ওষুধ ছাড়াই ভালো হয়ে যায়। চিৎ হয়ে শোয়া ছাড়াও কান্না এবং খাওয়ার সময় নাকের শব্দ বাড়তে পারে। অধিকাংশ শিশু অন্য সময় ভালো থাকলেও কেউ কেউ সমস্যা অনুভব করে। যেমন- অনেকেরই খাওয়ার সময় বমি হয় (রিফ্লাক্স বমি), ঠিকমতো ওজন বাড়ে না, ঘনঘন ঠাণ্ডা-কাশি লেগে থাকে, ঘুমের সমস্যা হয়, এমনকি সাময়িক দম বন্ধ হতেও পারে। এসব লক্ষণ খুবই দুর্লভ কিন্তু জেনে রাখা ভালো। আরেকটি গুরুতর সমস্যায় ল্যারিংক্সের ঠিক নিচের অঙ্গ ট্র্যাকিয়া (শ্বাসনালি) নরম, দুর্বল আর চেপে থাকে। একে আমরা বলি ট্র্যাকিওম্যালাশিয়া। এসব রোগে অভিজ্ঞ চিকিৎসক ছাড়া এসব সমস্যা নির্ণয় বিলম্বিত হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং সাথে জীবাণুর সংক্রমণ না থাকলে অযথা এন্টিবায়োটিক খাওয়াবেন না।
সাধারণত নিরীহ ল্যারিঙ্গোম্যালাশিয়া সমস্যায় কোনো পরীক্ষা করা হয় না। তবে উপরের গুরুতর সমস্যাগুলো দেখা দিলে ল্যারিঙ্গোস্কোপি, ব্রঙ্কোস্কোপি পরীক্ষা করা যেতে পারে (শিশু-মাতৃস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, মাতুয়াইলে করা হয়। অনেকের ল্যারিংক্স অঙ্গটি জন্মগতভাবে বাঁকা (ওমেগা অক্ষরের মতো) থাকতে পারে, যা এই পরীক্ষায় ধরা পড়ে। অধিকাংশ শিশুর তেমন কোনো ওষুধ লাগে না। কাত করে শোয়ানো, নাক পরিষ্কার রাখা, ঘাড় উঁচু করে বসে খাওয়ানো, ছয় মাসের পর ঘন খাবার অল্প করে বারেবারে খাওয়ালে উপকার পাওয়া যায়। সাথে অপুষ্টি থাকলে তার চিকিৎসা জরুরি। সবচেয়ে বড় ব্যাপার মাকে আশ্বস্ত করা। যেই রোগ একটি নির্দিষ্ট বয়সে ওষুধ ছাড়াই ভালো হয়ে যায়, সেখানে একাধিক এন্টিবায়োটিক, কাশির ওষুধ, নাকের পানি শুকানোর ওষুধ খেয়ে ওষুধের পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়ায় অসুস্থ হওয়া একান্তই অনাকাক্সিক্ষত।
লেখক : শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ, ফয়সল হাসপাতাল, আড়াইহাজার, নারায়ণগঞ্জ



