হারুন ইসলাম
ঢাকার শাহবাগ মোড়, বাংলাদেশের রাজনীতির এক ঐতিহাসিক ‘নার্ভ সেন্টার’। ২০১৩ সালের এক আন্দোলন থেকেই তৈরি হয়েছিল এক বিশেষ বয়ান, যা দীর্ঘ এক দশক ধরে বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। কিন্তু ২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানের পর সেই শাহবাগের চরিত্র আমূল বদলে গেছে। আর এই পরিবর্তনের নেপথ্য নায়ক, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি, মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এক নতুন ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লবে’র জন্ম দিয়েছেন। তার বিপ্লব শাহবাগের চিরায়ত মেরু ভেঙে দিয়ে তরুণদের কাছে ‘আধিপত্যবাদ বনাম ইনসাফে’র নতুন সমীকরণ সামনে এনেছে।
চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে শরিফ ওসমান হাদি কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা নন, বরং তিনি ‘আজাদি’ বা মুক্তির এক নতুন ও পূর্ণাঙ্গ সংজ্ঞার প্রতীক হয়ে উঠেছেন। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর তার মৃত্যুর পর থেকে শাহবাগের রাজপথ যে স্লোগানে প্রকম্পিত, তার মূল সুর হলো রাষ্ট্রীয় ও সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষা। হাদির রাজনৈতিক দর্শনে ‘আজাদি’ মানে কেবল ক্ষমতার পালাবদল বা সরকার পরিবর্তন ছিল না; বরং তিনি লড়াই করেছেন এমন এক বাংলাদেশের জন্য, যা ভিনদেশী আধিপত্যবাদের শিকল ছিঁড়ে সত্যিকার অর্থে স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাশীল হবে। তার কণ্ঠে বারবার ধ্বনিত হয়েছে দিল্লির প্রভাবমুক্ত এক সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতির দাবি, যেখানে বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত ঢাকাতেই নেয়া হবে, সীমান্তের ওপার থেকে আসা কোনো ইশারায় নয়। তার এই আপসহীন আধিপত্যবাদ বিরোধী অবস্থানই তাকে তরুণ প্রজন্মের কাছে এক অকুতোভয় নায়কে পরিণত করেছে।
ওসমান হাদির এই লড়াইয়ের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাত্ত্বিক দিক ছিল ‘সাংস্কৃতিক আজাদি’। বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে শাহবাগ থেকে যে একপক্ষীয় এবং তথাকথিত প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক বয়ান তৈরি করা হয়েছিল, হাদি তাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছিলেন। তিনি তরুণ প্রজন্মকে শিখিয়েছেন যে, নিজস্ব ধর্ম, ঐতিহ্য ও বিশ্বাসকে বিসর্জন দিয়ে বা ঘৃণা করে আধুনিক হওয়া যায় না। তার নেতৃত্বে ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ যে বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন গড়ে তোলে, তা তরুণদের দীর্ঘদিনের ধর্মহীনতার মনোজাগতিক হীনম্মন্যতা দূর করতে বড় ভূমিকা রেখেছে। শাহবাগ মোড়কে ‘শহীদ ওসমান হাদি চত্বর’ হিসেবে ঘোষণার মধ্য দিয়ে মূলত সেই পুরনো ‘সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের’ পতনেরই বার্তা দেয়া হয়েছে। আজকের শাহবাগ তাই আর নির্দিষ্ট কোনো ‘এলিট’ গোষ্ঠীর ড্রয়িংরুম নয়, বরং তা গণমানুষের ইনসাফ, ফিলিস্তিন সংহতি এবং নিজস্ব স্বকীয়তার জয়গানে মুখরিত এক উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ।
২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে এসেও হাদির ‘আজাদি’র লড়াই থামেনি, বরং তার শাহাদতের পর তা আরো তীব্র ও প্রাসঙ্গিক আকার ধারণ করেছে। তার হত্যাকাণ্ডকে নিছক কোনো অপরাধমূলক ঘটনা হিসেবে না দেখে, তরুণ প্রজন্ম একে দেখছেন জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াইয়ের অংশ হিসেবে। সম্প্রতি পুলিশি তদন্ত ও চার্জশিটকে ‘হাস্যকর’ ও ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা’ বলে আখ্যা দিয়ে আন্দোলনকারীরা যে কঠোর কর্মসূচির পালন করেছে, তা প্রমাণ করে যে ওসমান হাদি একটি নিভবে না এমন স্ফুলিঙ্গ রেখে গেছেন। তিনি রাষ্ট্রযন্ত্রের সংস্কার, বিচারহীনতার সংস্কৃতি রোধ এবং জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়নের যে স্বপ্ন দেখতেন, তা এখন রাজপথে লক্ষ তরুণের দাবির মুখে জীবন্ত। হাদি আজ শারীরিকভাবে অনুপস্থিত থাকলেও, তার রেখে যাওয়া ‘সার্বভৌমত্ব ও ইনসাফ’-এর চেতনা আগামী দিনের বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মানচিত্র নির্ধারণে প্রধান নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের দেয়াল ভাঙার লড়াই : ওসমান হাদি ও তার সংগঠন ‘ইনকিলাব মঞ্চে’র প্রধান লড়াই ছিল তথাকথিত ‘সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের’ বিরুদ্ধে। দীর্ঘকাল ধরে শাহবাগকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা যে ন্যারেটিভ তৈরি করেছিলেন, হাদি তাকে ‘জনবিচ্ছিন্ন’ ও ‘দিল্লি-তোষণকারী’ হিসেবে চিহ্নিত তিনি করেছিলেন।
তার নেতৃত্বে তরুণরা প্রশ্ন তুলতে শুরু করে, কেন প্রগতিশীলতা মানেই ধর্মবিদ্বেষ হতে হবে? কেন প্রগতিশীলতা মানেই শেকড় বিচ্ছিন্নতা হবে? ওসমান হাদি তার বক্তৃতায় বারবার বলেছিলেন, ‘আমাদের লড়াই শুধু ভোটের অধিকারের জন্য নয়, আমাদের লড়াই মনোজাগতিক দাসত্বের বিরুদ্ধে। আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে, ইনসাফের পক্ষে। গোলামীর বিপক্ষে আজাদির পক্ষে। যেই সংস্কৃতি আমাদের নিজস্বতাকে অস্বীকার করে, তা আমরা মানি না।’
শিক্ষার্থীদের চোখে হাদির দেখানো ‘নয়া আজাদি’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী তানভীর আহমেদ বলেন, ‘আমরা আগে শাহবাগে আসতে ভয় না পেলেও অস্বস্তি বোধ করতাম। মনে হতো এখানে আমাদের বিশ্বাস ও মূল্যবোধকে ব্যঙ্গ করা হয়। ওসমান ভাই আমাদের শিখিয়েছেন যে, শাহবাগ কারো পৈতৃক সম্পত্তি নয়। তিনি আমাদের ‘সাংস্কৃতিক হীনম্মন্যতা’ থেকে মুক্তি দিয়েছেন। এখন আমরা গর্বের সাথে বলি, আমরা আধুনিক, কিন্তু আমরা আমাদের দ্বীন ও দেশের প্রশ্নে আপসহীন।’
আরেক শিক্ষার্থী হারুন ইসলাম বলেন, ‘জুলাই বিপ্লব আমাদের শরীরকে স্বাধীন করেছে, আর ওসমান হাদির আন্দোলন আমাদের মগজকে স্বাধীন করছে। এটা হলো আমাদের সেকেন্ড ওয়ার অব ইনডিপেন্ডেন্স, কালচারাল ওয়ার।’
তরুণ বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ : প্যারাডাইম শিফট
সমাজ ও রাজনীতি বিশ্লেষকরা এই ঘটনাপ্রবাহকে বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি বড় ‘প্যারাডাইম শিফট’ বা বাঁক বদল হিসেবে দেখছেন।
তরুণ রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক আসাদুজ্জামান বলেন, ‘ওসমান হাদি যেটা করেছেন, সেটাকে তাত্ত্বিক ভাষায় ‘ডি-কলোনাইজেশন’ বি-উপনিবেশায়ন বলা যায়। তিনি দেখিয়েছেন যে, ঢাকার সংস্কৃতি কলকাতার এক্সটেনশন হতে পারে না। তিনি শাহবাগকে ‘এলিটদের ড্রয়িংরুম’ থেকে বের করে সাধারণ মানুষের ‘ইনসাফ চত্বরে’ রূপান্তর করেছেন। তার মৃত্যু এই আবেগকে বারুদে পরিণত করেছে।’
লোকপ্রশাসন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শেহরীন আমিন মোনামী বলেন, ‘ভূরাজনীতির প্রেক্ষাপটে হাদির আন্দোলন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ভারতীয় সফট পাওয়ার বা সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী ‘কাউন্টার কালচার’ দাঁড় করিয়েছেন, যা বিগত ৫০ বছরে কোনো রাজনৈতিক দল সেভাবে পারেনি।’
আগামীর বাংলাদেশ ও ওসমান হাদির উত্তরাধিকার : শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর পর শাহবাগের নাম ‘শহীদ ওসমান হাদি চত্বর’ ঘোষণা করা নিছক আবেগের বশবর্তী হয়ে নাম পরিবর্তন নয়। এটি একটি বার্তা। বার্তাটি হলো, বাংলাদেশে আর কোনো একপক্ষীয় সাংস্কৃতিক বয়ান চলবে না। আজকের শাহবাগ আর ২০১৩ সালের শাহবাগ এক নয়। আজকের শাহবাগে আজানের ধ্বনি আর বিপ্লবের স্লোগান মিলেমিশে একাকার। বিশ্লেষকদের মতে, ওসমান হাদি হয়তো শারীরিকভাবে নেই, কিন্তু তিনি তরুণ প্রজন্মের মনে যে ‘সাংস্কৃতিক সাহসের’ বীজ বপন করে গেছেন, তা আগামী কয়েক দশক বাংলাদেশের রাজনীতি ও সমাজনীতিকে প্রভাবিত করবে। এটিই হলো চব্বিশ পরবর্তী বাংলাদেশের নতুন বাস্তবতা।



