বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, বাংলাদেশে যেকোনো নির্বাচনের আগে খুনিদের বিচার দৃশ্যমান হতে হবে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে হবে। এ দু’টি কাজ ছাড়া বাংলাদেশে কোনো নির্বাচন জনগণ মেনে নেবে না। যারা দেশকে ভালোবাসে তারা দেশ ছেড়ে পালায় না, দেশের টাকা বিদেশে পাচার করে না। পতিত স্বৈরাচারগোষ্ঠী সবই করেছে। ফ্যাসিবাদীদের পতন হলেও ফ্যাসিবাদ এখনো বিদায় নেয়নি। এখনো মানুষ নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, ভয়াবহ চাঁদাবাজিতে মানুষ অতিষ্ঠ। চাঁদাবাজ দখলদারদের বিরুদ্ধে একসাথে এগিয়ে যাবো আমরা।
গতকাল শনিবার লালমনিরহাট জেলা শহরের কালেক্টর মাঠে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, জেলার পরিত্যক্ত বিমানবন্দর, স্থলবন্দর ও মহাসড়ক ফোরলেন, কারাবন্দী জামায়াত নেতা এ টি এম আজহারুল ইসলামের মুক্তি, দলের নিবন্ধন ফেরত, সীমান্তে হত্যা বন্ধ, অ্যাভিয়েশন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের বিচার বৈষম্যমুক্ত রাষ্ট্র নির্মাণের প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে নির্বাচনসহ ১১ দফা দাবিতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী লালমনিরহাট জেলা শাখার আয়োজনে বিশাল জনসভায় এ কথা বলেন তিনি। তিনি আরো বলেন, এর আগে জামায়াতের দু’জন মন্ত্রী ছিলেন, তাদের কারো বিরুদ্ধে কেউ দুর্নীতির অভিযোগ তুলতে পারেননি। জামায়াত ক্ষমতায় গেলে মহিলাদের সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। আগামীতে আমরা এমন দেশ চাই যেন কোনো প্রতিষ্ঠানে পাহারা দেয়া না লাগে। সংখ্যালঘু বলে যারা বেশি মায়াকান্না করেছে তারাই সবচেয়ে বেশি অপকর্ম করেছে। যারা এ দেশে জন্মগ্রহণ করেছে সবাই এ দেশের গর্বিত নাগরিক, সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগুরু বলে কিছু নেই।
বাংলাদেশের বুক থেকে চিরতরে ফ্যাসিবাদ নির্মূল দেখতে চাই। এ টি এম আজহার কবে মুক্তি পাবে জনগণ তা জানতে চায়, এ বিষয়ে জনগণ কোনো ধানাইপানাই কথা শুনতে চায় না।
সীমান্ত হত্যা বন্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান জামায়াত আমির। আমরা আধিপত্যবাধের কালো ছায়া আর দেখতে চাই না। ভারতের সাথে প্রতিবেশী হিসেবে সমতার ভিত্তিতে বসবাস করতে চাই, সেই পরিবেশ ভারতকেই নিশ্চিত করতে হবে, আমাদের ন্যায্য অধিকারগুলো দিতে হবে। কোনো ধরনের গড়িমসি না করে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। লালমনিরহাটে কৃষিনির্ভর শিল্পকারখানা গড়ে তুলতে হবে।
বাংলাদেশে যেকোনো নির্বাচনের আগে খুনিদের বিচার দৃশ্যমান হতে হবে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে হবে। এই দু’টি কাজ ছাড়া বাংলাদেশে কোনো নির্বাচন জনগণ মেনে নিবে না। পেশিশক্তির নির্বাচন জনগণ দেখতে চায় না। নির্বাচনের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে হবে।
ধর্মের ভিত্তিতে বাংলাদেশকে আর খণ্ড করতে দেয়া হবে না। আগামী দিনে দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে চাই।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী লালমনিরহাট জেলা শাখার আমির কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্য অ্যাডভোকেট আবু তাদেরের সভাপতিত্বে সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলা আবদুল হালিম, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অধ্যক্ষ মাওলানা মমতাজ উদ্দিন, কেন্দ্রীয় কর্ম পরিষদ সদস্য মো: মাহবুবুর রহমান বেলাল, কেন্দ্রীয় নেতা গোলাম রব্বানী, এ টি এম আজম খান, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের মধ্য থেকে বক্তব্য রাখেন হিন্দু বললাম ট্রাস্টের লালমনিরহাট জেলার সভাপতি পুস্বাজিৎ বর্মা।
আরো বক্তব্য রাখেন লালমনিরহাটের তিনটি সংসদীয় আসনের জামায়াত মনোনীত সদস্য প্রার্থী পাটগ্রাম-হাতীবান্ধা লালমনিরহাট-১ আসনে বিশিষ্ট শিল্পপতি মো: আনোয়ারুল ইসলাম রাজু, কালিগঞ্জ-আদিতমারী লালমনিরহাট-২ আসনে জেলা জামায়াতের জেলা সেক্রেটারি ও বিশিষ্ট আইনজীবী অ্যাডভোকেট ফিরোজ হায়দার লাভলু, লালমনিরহাট সদর-৩ আসনে জামায়াত মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী সাবেক ছাত্রনেতা হারুন-অর রশিদ। আরো বক্তব্য রাখেন জামায়াতে ইমলামী, ইসলামী ছাত্রশিবির, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনসহ বিভিন্ন স্তরের নেতৃবৃন্দ।
নৃশংস হত্যার শিকার জান্নাতির পরিবারের কাছে জামায়াতের আমির : লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার ভোটমারি ইউনিয়নের শৌলমারির চরের ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী মোছা: জান্নাতি খাতুনকে ধর্ষণ ও নিশংসভাবে হত্যার খবর পেয়ে তার পরিবারের সাথে সাক্ষাৎ ও আর্থিক সহযোগিতা করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান।
গতকাল শনিবার বিকেলে মোছা: জান্নাতি খাতুনের স্কুল ভোটমারি হাইস্কুল প্রাঙ্গণে পরিবারের সাথে সাক্ষাৎ করেন জামায়াত আমির ও মামলার সার্বিক বিষয়ে পরিবারের সাথে একান্ত কথা বলেন তিনি।
এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন, কালীগঞ্জ উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা রুহুল আমিন, ভোটমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক বেবু মিয়া, কালিগঞ্জ আদিতমারী লালমনিরহাট-২ আসনের জামায়াত মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী অ্যাডভোকেট ফিরোজ হায়দার লাভলু, হাতীবান্ধা পাটগ্রাম লালমনিরহাট-১ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী বিশিষ্ট শিল্পপতি আনোয়ারুল ইসলাম রাজু ও লালমনিরহাট জেলা জামায়াতের আমির বিশিষ্ট আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবু তাহের।
দ্রুত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন চাই
নীলফামারী প্রতিনিধি জানান, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, আমরা চাই দ্রুত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হোক। এটি আমাদের অধিকার। স্বাধীন আমাদের বাংলাদেশ। আমরা আমাদের দেশের প্রয়োজনে উন্নয়ন কর্মসূচি হাতে নিব, অবকাঠানো তৈরি করব। এখানে কারো নাক গলানো সুযোগ নেই। আমরা কারো ব্যাপারে নাক গলাই না। আমরা আমাদের দেশ নিয়ে চিন্তা করি।
গতকাল শনিবার বিকেলে নীলফামারীর জলঢাকা স্টেডিয়াম মাঠে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী জলঢাকা শাখার উদ্যোগে আয়োজিত এক জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের নির্মম নির্যাতনের শিকার জামায়াত নেতা এ টি এম আজহারুল ইসলাম এখনো কারাগারের ভেতরে। আমরা কোনো ধানাইপানাই চাই না। তাকে দ্রুত মুক্তি দিয়ে জনগণের মাঝে ফিরে দিয়ে তাকে কাজ করার সুযোগ করে দিন। তিনি বলেন, এরকম নিরপরাধ মানুষগুলোকে যারা দোষী সাজিয়েছিল, আল্লাহ তায়ালা জনগণের অন্তর থেকে তাদের গায়েব করে দিয়েছেন। হাসিনা সরকার হাজারো মায়ের বুক খালি করেছে, হাজারো বোনকে বিধবা করেছে, হাজারো সন্তানকে এতিম বানিয়েছে। তারা আয়না ঘর তৈরি করে মানুষের ওপর নির্মম নির্যাতন চালিয়েছিল। তাদের পুরো শাসনামলে মানুষ সুশাসন পায়নি। তারা সোনার বাংলা বানানোর সেøাগান দিয়ে এই বাংলাকে শ্মশান বাংলায় পরিণত করেছিল। মানুষের কথা বলার অধিকার ছিল না। প্রতিবাদী মানুষের ওপর জুলুমের পাহাড় নেমে আসত। সাড়ে ১৫ বছরে তারা খুন করেছে, গুম করেছে তারা ধর্ষণ ও লুণ্ঠনের মহা রাজত্ব কায়েম করেছিল।
ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ফ্যাসিস্ট সরকার সবচেয়ে আঘাত দিয়েছিল জামায়াতে ইসলামীর ওপর। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে আঘাত দেয়ার জন্য জামায়াতে ইসলামীকে বেচে নেয়। তারা জামায়াতের ১১ জন দায়িত্বশীল নেতাকে জুডিশিয়াল ক্লিনিংয়ের মাধ্যমে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দিয়েছে। পাঁচজনকে অন্যায়ভাবে ফাঁসি দিয়েছে। মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীসহ ছয়জনকে জেলের ভেতর মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। আমরা এসব হত্যার বিচার চাই।
জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলী সম্পর্কে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, মীর কাসেম আলী আমেরিকায় ছিলেন। তার পরিবারের সদস্যরা বলেছিল বাংলাদেশে এখন আসবেন না। আসলে আপনার নেতাদের মতো আপনাকেও ফাঁসি দেয়া হবে। তিনি বলেছিলেন, আমি বাংলার সন্তান আমি বাংলাদেশে ফিরে যাবো। আদালতে মোকাবেলা করব। ফাঁসির রশি তার গলায় ঝুলতে পারে এটি জেনেও তিনি দেশে ফিরে আসেন। তিনি দেশপ্রেমিক মানুষ ছিলেন, নিরপরাধ মানুষ ছিলেন। তার সৎ সাহস ছিল। তিনি দেশকে ভালোবাসতেন। তিনি যুবকদের হাতে কাজ তুলে দেয়ার এক মহান কারিগর ছিলেন। ফ্যাসিস্ট সরকার এই সাহসী মানুষটিকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসি দেন।
ডা: শফিকুর রহমান আরো বলেন, আমরা জুলাই হত্যাকাণ্ডে দৃশ্যমান বিচার দেখতে চাই।
আমরা প্রয়োজনীয় সংস্কার ও জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচারের পর নির্বাচন চাই। আগে এ দুটো হবে তার পরে নির্বাচন। এ দুটো ছাড়া জনগণ নির্বাচন মেনে নেবে না। মানুষ ফ্যাসিস্ট সরকারের মতো আর কোনো নির্বাচন দেখতে চায় না।
জলঢাকা উপজেলা জামায়াতের আমির মোখলেছুর রহমানের সভাপতিত্বে ও উপজেলা সেক্রেটারি মোয়াম্মার আল হাসানের সঞ্চালনায় জনসভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম, কেন্দ্রীয় কর্ম পরিষদ সদস্য ও রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলের সহকারী অঞ্চল পরিচালক অধ্যক্ষ মাওলানা মমতাজ উদ্দিন, রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলের টিম সদস্য আব্দুর রশীদ, নীলফামারী জেলা জামায়াতের আমির অধ্যক্ষ মাওলানা আবদুস সাত্তার ও জেলা জামায়াতের মজলিসে শূরা সদস্য ওবায়দুল্লাহ সালাফী। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির ড. খায়রুল আনাম, জেলা সেক্রেটারি আন্তাজুল ইসলাম, সহকারী সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট আল ফারুক আব্দুল লতীফ, জেলা কর্মপরিষদ সদস্য প্রভাষক ছাদের হোসেন, মনিরুজ্জামান মন্টু, জলঢাকা উপজেলা জামায়াতের নায়েবে আমির কামারুজ্জামান, জেলা শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশেনের সভাপতি মনিরুজ্জামান জুয়েল, ডোমার উপজেলা আমির খন্দকার আহমুদুল হক মানিক, ডিমলা আমির মজিবুর রহমান, জেলা ছাত্রশিবির সভাপতি তাজমুল হাসান। এ সময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল, জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি প্রভাষক আনোয়ারুল ইসলাম, আব্দুল কাদিম প্রমুখ।



