ইউরোপের দেশগুলোতে পাড়ি জমানোর আগে হাজার হাজার বাংলাদেশী দেশেই নামধারী রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক এবং তাদের মনোনীত দালাল চক্রের হাতে লাখ লাখ টাকা তুলে দিয়ে প্রতারিত ও নিঃস্ব হচ্ছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাকের ডগায় বসে এসব অপকর্ম তারা মাসের পর মাস চালাতে থাকলেও রহস্যজনক কারণে তাদের বিষয়ে কার্যকর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের নজির খুব কমই রয়েছে বলে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে। পরবর্তীতে বিদেশে যেতে না পারা অসহায় বাংলাদেশীরা দালালদের হাতে জমা দেয়া লাখ লাখ টাকা তুলতেই বছরের পর বছর ঘুরতে থাকেন। এরপরও অনেকেই তাদের কষ্টের টাকা ঠিকমতো ফেরত পান না।
অভিবাসন বিশ্লেষক ও পেশাদার রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকরা ইউরোপের শ্রমবাজারের বিষয়ে নয়া দিগন্তকে বলেন, ইউরোপগামীদের মধ্যে শতকরা ৮০ শতাংশই কোনো না কোনোভাবে দেশেই দালালদের হাতে প্রতারিত হচ্ছেন। আর এই দালাল চক্রের বেশির ভাগ সদস্যই ঢাকার প্রাণকেন্দ্র নয়া পল্টনের চায়না টাউন এবং পল্টনের কালভার্ট রোডের জামান টাওয়ারে নীরবে আখড়া গেড়ে দেদার প্রতারণার ব্যবসা চালাচ্ছে। তাদের মতে ইউরোপের শ্রমবাজারে বৈধ ভিসা সংগ্রহ করে লোক যাওয়া খুবই কঠিন বিষয়। ১০০টি পাসপোর্ট সংশ্লিষ্ট দেশের কোম্পানিতে পাঠালে সেখান থেকে কখনো একজনের আবার কখনো ২-৩ জনের নামে ভিসা অনলাইনে সঠিক পাওয়া যায়। এরপর দালালরা বাকি যেগুলো দেখায় সেগুলোর সবই ফকিরাপুলের তৈরি করা জাল ভিসা। এসব ভিসাতেই বিদেশগামীরা অহরহ প্রতারিত হচ্ছেন। তাই যারা ইউরোপ যাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন, তাদের বুঝে শুনে এই পথে পা বাড়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন তারা। তাদের মতে, ইউরোপের শ্রমবাজার দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। এ ব্যাপারে এখনই সরকারের নজর দেয়া উচিত।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইউরোপের দেশ ইতালি, সার্বিয়া, পর্তুগাল, পোল্যান্ড, বেলারুশ ও রোমানিয়া যেতে ইচ্ছুকদের মধ্যে যারা রিক্রুটিং এজেন্সি ও দালালদের হাতে টাকা দিয়ে প্রতারিত হয়েছেন তাদের কারো কারো অভিযোগ বিচার সালিসের মাধ্যমে বিএমইটি সংশ্লিষ্ট সেল নিষ্পত্তি করে দিচ্ছে। এতে কেউ কেউ টাকার কিছু অংশ ও আটকে থাকা পাসপোর্ট উদ্ধারে সক্ষম হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে টাকা আদায়কারী দালাল চক্রের সদস্যদের ধরা সম্ভব হচ্ছে না।
গতকাল বৃহস্পতিবার জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর অভিযোগ সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিজের পরিচয় না প্রকাশের শর্তে নয়া দিগন্তকে বলেন, নয়াপল্টনের চায়না টাউনের সীমা আক্তার নামের একজন মহিলার নামে সার্বিয়াগামী তাপস আমাদের দফতরে এসে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগকারী তাপস দেবনাথের বাড়ি ভৈরব এলাকায়। তার অভিযোগের প্রেক্ষিতে ওই নারীকে টেলিফোন করে আমাদের অফিসে আসতে বলা হয়। তারা দু’জনে উপস্থিত হলে মহিলার কাছে জানতে চাওয়া হয় তিনি কোন অফিস ও লাইসেন্স না থাকলেও কেন সার্বিয়ায় লোক পাঠানোর কথা বলে ছয় মাস আগে তাপসের কাছ থেকে পাসপোর্ট ও নগদ টাকা নিয়েছেন? তখন মহিলা স্বীকার করেন এবং না পাঠাতে পারার কারণ আমার কাছে বলেন। এরপর তাকে বলা হয় এসব আর করবেন না। এখনই আপনি তাপসের পাসপোর্ট এবং নগদ টাকাগুলো ফেরত দিবেন। তখন ওই নারী টাকা ফেরত দিতে সময় চান এবং তার সার্বিয়ায় লোক পাঠানোর প্রসেসিং করতে কিছু টাকা খরচ হয়েছে। সেটি বাদ দিয়ে বাকি টাকা তিনি ঈদের পর ফেরত দেবেন। তবে আটকে রাখা পাসপোর্ট তিনি ফেরত দিয়ে দেবেন বলে জানান। এক প্রশ্নের উত্তরে ওই কর্মকর্তা বলেন, ইউরোপ যেতে টাকা দেয়ার পরও না যেতে পারা এমন অনেক অভিযোগের বিচার সালিস প্রায়ই তার কাছে আসছে। তিনি যেগুলো পারছেন সেগুলো সমাধান করে দিচ্ছেন।
নয়াপল্টনের খাদেম গ্রুপের একজন কর্মী গত বুধবার ইউরোপের শ্রমবাজারের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা সুন্দরভাবে ব্যবসা করতে চাচ্ছি। কিন্তু প্রতারকদের কারণে পারছি না।
দালালদের খপ্পরে পড়ে অনেক মানুষ ঢাকায় এসে প্রতারিত ও নিঃস্ব হয়েছে। এই চক্রের বেশির ভাগ সদস্যই এখন অবস্থান করছে চায়না টাউনের বিভিন্ন ফ্লোরে এবং কালভার্ট রোডের জামান টাওয়ারের বিভিন্ন ফ্লোরে। সেখানে গেলে পাওয়া যাবে টাকা দিয়েও মাসের পর মাস ঘোরা অসংখ্য ইউরোপগামী প্রতারিতদের। তারা ইউরোপ তো যেতেই পারেনি, বরং দালালদের কাছে অগ্রিম জমা দেয়া টাকা তুলতে ধরনা দিতে হচ্ছে। তাদের মধ্যে কাউকে কাউকে মাসের পর মাস ঘুরিয়ে কিছু টাকা ফেরত দেয় বলে শুনি। সরকারের ইউরোপের বাজারের ওপর কঠোর মনিটরিং বাড়ানো উচিত বলে তিনি মনে করেন।
কাকরাইলের রৌমারি ওভারসিসের মালিক মোহাম্মদ সেলিম মিয়া গত বুধবার নয়া দিগন্তকে বলেন, আমার মতে ইউরোপের বাজারে কর্মী পাঠাতে যারা লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে তাদের বেশির ভাগই রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক না, এরা মূলত দালাল চক্র। তাদের কাছেই টাকা দিয়ে বেশির ভাগ লোক প্রতারিত হচ্ছে। তিনি বলেন, আমার জানা মতে, ইউরোপের কোম্পানিতে ডিএইচএলের মাধ্যমে ৫০টি পাসপোর্ট ও ডকুমেন্ট পাঠালে সেখান থেকে সর্বোচ্চ ২-৩টি জেনুইন ভিসা হচ্ছে। বাকি সবই ফলস।
এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমার জানা মতে শতকরা ৮০ শতাংশ লোকই দালালদের হাতে টাকা দিয়ে ইউরোপের দেশে যাওয়াতো দূরের কথা, তারা দেশেই প্রতারিত হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, যারা ইউরোপের দেশে যেতে চান তাদের বুঝে শুনে ঝুঁকি নেয়া উচিত।
অভিবাসন বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউরোপে লোক পাঠানোর নামে যেসব এলাকায় দালালদের বিরাট আস্তানা গড়ে উঠেছে সব এলাকায় প্রশাসনের দ্রুত অভিযান চালানো উচিত। নতুবা অনেক বিদেশগামীর স্বপ্ন দেশেই শেষ হয়ে যাবে।



