গ্যাসকূপ খননে নতুন উচ্চতা

১৮ হাজার ফুট নিচে তিতাসে ‘ডিপ ড্রিলিং’, মিলতে পারে ২ টিসিএফ গ্যাস, জ্বালানি সঙ্কট কাটানোর নতুন আশা

দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রায় ৫৬০০ মিটার বা ১৮ হাজার ৩৭২ ফুট গভীরে কূপ খননের কাজ শুরু হয়েছে তিতাস-৩১ কূপে। সংশ্লিষ্টরা একে বলছেন বাংলাদেশের ‘ডিপ ড্রিলিং যুগের’ সূচনা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অনুসন্ধান সফল হলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। কারণ, সম্ভাব্য ২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) গ্যাস পাওয়া গেলে তা শিল্প, বিদ্যুৎ ও গৃহস্থালি খাতে দীর্ঘদিনের সঙ্কট লাঘবে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

Printed Edition

আশরাফুল ইসলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ফিরে

বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে। দীর্ঘদিনের গ্যাস সঙ্কট, আমদানি-নির্ভরতা এবং ক্রমবর্ধমান এলএনজি ব্যয়ের চাপে যখন দেশের অর্থনীতি ভারসাম্য রক্ষায় লড়ছে, ঠিক সেই সময় মাটির আরো গভীরে নতুন গ্যাসের সন্ধানে নেমেছে রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল)।

দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রায় ৫৬০০ মিটার বা ১৮ হাজার ৩৭২ ফুট গভীরে কূপ খননের কাজ শুরু হয়েছে তিতাস-৩১ কূপে। সংশ্লিষ্টরা একে বলছেন বাংলাদেশের ‘ডিপ ড্রিলিং যুগের’ সূচনা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অনুসন্ধান সফল হলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। কারণ, সম্ভাব্য ২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) গ্যাস পাওয়া গেলে তা শিল্প, বিদ্যুৎ ও গৃহস্থালি খাতে দীর্ঘদিনের সঙ্কট লাঘবে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

তিতাসে কর্মচঞ্চল নতুন এক যুদ্ধক্ষেত্র

সোমবার সকালে ঢাকা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা। কয়েক ঘণ্টার পথ পেরিয়ে তিতাস-৩১ কূপ এলাকায় পৌঁছাতেই চোখে পড়ে ভিন্ন এক দৃশ্য- বিশাল কর্মযজ্ঞে ব্যস্ত দেশি-বিদেশী প্রকৌশলী, টেকনিশিয়ান ও শ্রমিকরা।

চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি সিডিসির কর্মীদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছেন বাংলাদেশী প্রকৌশলীরা। দূর থেকে দেখা যায়, বিশালাকৃতির আধুনিক রিগ অবিরাম শব্দে ঘুরছে। ২৬৮২ হর্সপাওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন এই রিগ যেন মাটির বুক চিরে পৃথিবীর গভীরে প্রবেশ করছে।

এই ‘অদৃশ্য যাত্রা’র গন্তব্য-পৃথিবীর গভীরে লুকিয়ে থাকা সম্ভাব্য গ্যাসভাণ্ডার। পুরো এলাকায় এখন একধরনের প্রত্যাশা কাজ করছে। স্থানীয় মানুষও আশাবাদী- নতুন গ্যাসের সন্ধান দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ এই ‘ডিপ ড্রিলিং’ : বাংলাদেশে এর আগে সর্বোচ্চ প্রায় ৪৯০০ মিটার গভীরতায় কূপ খনন করা হয়েছিল। এবার সেই সীমা অতিক্রম করে ৫৬০০ মিটার পর্যন্ত যাওয়ার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গভীর স্তরে বড় গ্যাস মজুদের সম্ভাবনা বেশি থাকে। উপরিভাগের অনেক গ্যাসক্ষেত্র ইতোমধ্যে নিঃশেষ বা উৎপাদন হ্রাস পাওয়ায় এখন নজর দেয়া হচ্ছে গভীর স্তরে।

তবে এই ধরনের ড্রিলিংয়ে যেমন প্রযুক্তিগত ঝুঁকি বেশি, তেমনি ব্যয়ও অনেক। কিন্তু সফল হলে এর সুফল দীর্ঘমেয়াদি। বিজিএফসিএল কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রের নিচে বড় মজুদের সম্ভাবনার কথা আলোচনায় ছিল, কিন্তু প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতায় এতদিন সেখানে পৌঁছানো যায়নি। এবার সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে গভীর অনুসন্ধানে নামা হয়েছে।

‘২ টিসিএফ গ্যাস পাওয়ার আশা’

তিতাস কূপ এলাকা পরিদর্শনের সময় বিজিএফসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী আব্দুল জলিল প্রামাণিক জানান, তিতাস-৩১ কূপের কাজ শেষে একই রিগ ব্যবহার করে বাখরাবাদ-২১ কূপেও খনন কার্যক্রম চালানো হবে।

দুই প্রকল্প মিলিয়ে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫৯৪ কোটি টাকা।

তার ভাষায়, “সব কিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে দু’টি কূপ মিলিয়ে প্রায় ২ টিসিএফ গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে চূড়ান্তভাবে কতটুকু গ্যাস পাওয়া যাবে এবং তার কতটুকু উত্তোলনযোগ্য হবে, তা খনন ও পরীক্ষার পরই নিশ্চিতভাবে বলা যাবে।’

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, ২ টিসিএফ গ্যাস বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হতে পারে, কারণ দেশের বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ক্রমেই কমে আসছে।

গ্যাস সঙ্কটে অর্থনীতিতে চাপ

বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা কাগজে-কলমে প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট হলেও বাস্তবে তা ৫০০ কোটি ঘনফুট ছাড়িয়ে গেছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। অন্য দিকে সরবরাহ করা যাচ্ছে মাত্র ২৬০ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট। এই ঘাটতি পূরণে সরকারকে উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে ৮০-৮৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস এলএনজি থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে।

এলএনজি আমদানির ফলে বছরে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা সরাসরি দেশের বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে প্রভাব ফেলছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার না হলে ভবিষ্যতে এই সঙ্কট আরো তীব্র হতে পারে।

খননে সময় ও মাটির নিচে চার স্তরে সম্ভাবনা

বিজিএফসিএল সূত্রে জানা গেছে, তিতাস-৩১ কূপ খননে মোট সময় ধরা হয়েছে ২১০ দিন। গত ১৯ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু হয়েছে এবং ইতোমধ্যে প্রায় ২২ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

অন্য দিকে বাখরাবাদ-২১ কূপ খননে সময় লাগবে প্রায় ১৮০ দিন। খনন শেষে টেস্টিং, লগিং এবং রিজার্ভ মূল্যায়নের কাজ হবে। সব কিছু বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক প্রমাণিত হলে শুরু হবে গ্যাস উত্তোলন এবং পরে তা জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা হবে। তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে ভূতাত্ত্বিক জরিপে চারটি সম্ভাবনাময় স্তরের সন্ধান পাওয়া গেছে। সাধারণত ৩৭০০ থেকে ৫৪০০ মিটার গভীরতায় গ্যাসের উপস্থিতির সম্ভাবনা বেশি। প্রথম স্তর ৩৭৩৬-৩৭৬৫ মিটারের মধ্যে, আর সবচেয়ে গভীর স্তর ৫৩১৫-৫৩৪৪ মিটারের মধ্যে। এ ছাড়া মাঝামাঝি আরো দু’টি স্তরে গ্যাস থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রতিটি স্তরের চাপ, তাপমাত্রা ও গঠন আলাদা হওয়ায় প্রতিটি ধাপে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে কাজ পরিচালনা করতে হচ্ছে।

যত গভীর, তত ঝুঁকি

গভীর কূপ খননের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে উচ্চচাপ নিয়ন্ত্রণ। ৩৭৫০ মিটারের পর থেকেই উচ্চচাপের স্তর শুরু হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই চাপ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি রয়েছে। এজন্য এবার ব্যবহার করা হচ্ছে ১৫ হাজার পিএসআই সক্ষমতার অত্যাধুনিক ব্লো-আউট প্রিভেন্টার (বিওপি)। বাংলাদেশে আগে সাধারণত ১০ হাজার পিএসআই সক্ষমতার যন্ত্র ব্যবহৃত হতো। বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়া এত গভীরে ড্রিলিং প্রায় অসম্ভব।

চীনের অভিজ্ঞতা, বাংলাদেশের প্রত্যাশা

এই প্রকল্প বাস্তবায়নে যুক্ত রয়েছে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সিডিসি, যাদের নিজ দেশে ১০ হাজার মিটার পর্যন্ত কূপ খননের অভিজ্ঞতা রয়েছে।

বিজিএফসিএলের কর্মকর্তারা বলছেন, এই প্রকল্প শুধু গ্যাস অনুসন্ধান নয়, বরং দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিরও একটি বড় পদক্ষেপ। বাংলাদেশী প্রকৌশলীরা সরাসরি কাজের মাধ্যমে গভীর কূপ খননের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন।

জ্বালানি নিরাপত্তার নতুন সমীকরণ

বাংলাদেশের শিল্পায়ন, নগরায়ন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের সাথে গ্যাসের চাহিদা দ্রুত বেড়েছে। কিন্তু নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের হার সেই তুলনায় অনেক কম। একসময় দেশের জ্বালানি খাত প্রায় পুরোপুরি দেশীয় গ্যাসনির্ভর ছিল। এখন সেই চিত্র বদলে গেছে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় আমদানিনির্ভরতা বেড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, নতুন বড় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার না হলে আগামী এক দশকে বাংলাদেশকে আরো বেশি এলএনজি আমদানি করতে হবে, যা অর্থনীতির ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করবে।

এই প্রেক্ষাপটে তিতাস ও বাখরাবাদে গভীর অনুসন্ধান শুধু একটি প্রকল্প নয়- এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কৌশলগত উদ্যোগ।

সফল হলে কী লাভ

প্রত্যাশিত পরিমাণ গ্যাস পাওয়া গেলে- এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ বাড়বে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্থিতিশীলতা আসবে, নতুন বিনিয়োগ উৎসাহিত হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন গ্যাসের সন্ধান দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

অপেক্ষা নতুন সম্ভাবনার

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাসে এখন প্রতিটি দিনই গুরুত্বপূর্ণ। রিগের প্রতিটি ঘূর্ণন, প্রতিটি ফুট অগ্রগতি যেন নতুন আশার বার্তা বয়ে আনছে। মাটির গভীরে কী আছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। কিন্তু সম্ভাবনার দ্বার খুলতেই চলছে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ। দেশের জ্বালানি সঙ্কটের এই সময়ে তিতাসের গভীর অনুসন্ধান এক প্রতীকী লড়াই- নিজস্ব সম্পদ খুঁজে পাওয়ার লড়াই, আমদানিনির্ভরতা কমানোর লড়াই এবং ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লড়াই।

হয়তো তিতাসের গভীরেই লুকিয়ে আছে নতুন শক্তির ভাণ্ডার। আর সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন প্রকৌশলী ও শ্রমিকরা।

এখন পুরো দেশের দৃষ্টি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সেই গভীর কূপে- যেখানে ১৮ হাজার ফুট নিচে খোঁজা হচ্ছে বাংলাদেশের নতুন জ্বালানি ভবিষ্যৎ।