আদানির সাথে বিদ্যুৎ চুক্তির সংশোধন বিবেচনাধীন

সংসদে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী

Printed Edition

সংসদ প্রতিবেদক

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, ভারতের আদানি পাওয়ার (ঝাড়খণ্ড) লিমিটেডের সাথে স্বাক্ষরিত চুক্তিটি বিগত আওয়ামী লীগ সরকার দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় অস্বাভাবিক মূল্যে স্বাক্ষর করেছে মর্মে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত জাতীয় কমিটি তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে। কমিটির প্রতিবেদনের আলোকে ওই চুক্তির বিষয়ে আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের দ্বারস্থ হওয়া অথবা আদানি পাওয়ারের সাথে আলোচনাক্রমে চুক্তিটির সংশোধন ইত্যাদি বিষয়গুলো সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনের প্রশ্নোত্তর পর্বে এ তথ্য জানান মন্ত্রী। স্পিকার মেজর (অব:) হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশনে এ সংক্রান্ত প্রশ্নটি উত্থাপন করেন চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত জামায়াত দলীয় সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ভারতের আদানি পাওয়ারের সাথে ২০১৭ সালে বিদ্যুৎ ক্রয়ের যে চুক্তি হয়েছে ওই চুক্তিটি পর্যালোচনার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সুপ্রিম কোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় কমিটি কর্তৃক পর্যালোচনা করা হয়েছে। ওই কমিটিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, আইন বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ছিলেন এবং কমিটি এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক চুক্তি বিশেষজ্ঞ আইনি প্রতিষ্ঠানের মতামত গ্রহণ করেছে। ওই পর্যালোচনায় আদানি পাওয়ারের সাথে স্বাক্ষরিত চুক্তিটি বিগত আওয়ামী লীগ সরকার দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় অস্বাভাবিক মূল্যে স্বাক্ষর করেছে মর্মে জাতীয় কমিটি তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে।

চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুতের ঘাটতি নেই : দেশে চাহিদা অনুযায়ী বর্তমানে বিদ্যুতের কোনো ঘাটতি নেই বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তবে গ্রীষ্মকালে প্রাথমিক জ্বালানির ঘাটতি ও সঞ্চালন সীমাবদ্ধতায় মাঝে মধ্যে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটে।

ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এ তথ্য জানান।

বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেন, ‘চাহিদা অনুযায়ী বর্তমানে বিদ্যুতের কোনো ঘাটতি নেই। তবে গ্রীষ্মকালে সর্বোচ্চ চাহিদার সময় বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রাথমিক জ্বালানির ঘাটতি, সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, রণাবেণ ও ঝড়-বৃষ্টির কারণে মাঝে মাঝে কিছুটা বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটে। ফলে ওই সময়ে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হয় না।’

স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা : বিদ্যুতের চাহিদা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাওয়ায় লোডশেডিং বন্ধে বিদ্যুৎ বিভাগের গৃহীত বিভিন্ন কার্যক্রম ও পরিকল্পনার কথা সংসদে তুলে ধরেন ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি জানান, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর সাথে সমন্বয় রেখে সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো নির্মাণ ও উন্নয়ন করা হচ্ছে। এ ছাড়া প্রাথমিক জ্বালানির চাহিদা মোকাবেলায় জ্বালানি বহুমুখীকরণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

জ্বালানিসাশ্রয়ে সরকারি উদ্যোগের কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, প্রথম ধাপে ময়মনসিংহ, ঘোড়াশাল এবং নারায়ণগঞ্জের ৭৪টি মনোনীত ভোক্তার স্থাপনায় জ্বালানি নিরীাকার্যক্রম চলছে। শিল্প ও বাণিজ্যিক স্থাপনায় এ কার্যক্রম জোরদারের ল্েয সরকার ইতোমধ্যে ৪২ জন সনদপ্রাপ্ত জ্বালানি নিরীক এবং ১৭৮ জন সনদপ্রাপ্ত জ্বালানি ব্যবস্থাপক তৈরি করেছে। বিদ্যুৎসাশ্রয়ে নানা পদপে নেয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন মন্ত্রী।

পাম্প বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, গাড়ির দীর্ঘ সারি মন্ত্রী কি দেখতে পাচ্ছেন না : কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ একটি সম্পূরক প্রশ্ন করেন। এতে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী বলেছিলেন কোনো জ্বালানি সঙ্কট নেই। কিন্তু কী হচ্ছে? যারা তেল সংগ্রহ করতে যাচ্ছে তারা যথাযথভাবে তাদের স্বাভাবিক যে সার্ভিস তা পাচ্ছে না। আমরা দেখতে পাচ্ছি গ্র্যাজুয়ালি পাম্পগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আজকে সিলেটের পাম্প বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা দেখছি যে রাস্তায় রাইডের গাড়ির দীর্ঘ সারি এবং আমরা বারবার করে দেখতে পারছি যে সবাই প্রত্যাশিত সেবা পাচ্ছে না। কিন্তু দুঃখজনক বিষয়, সরকার এই বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছে। মন্ত্রী এই প্রবলেমটি অ্যাকনলেজ করার পরিবর্তে আগের মতো যেভাবে অ্যাভয়েড অব প্রবলেম সেটা হচ্ছে। প্রবলেম যেভাবে আমরা এড়িয়ে যেতাম, মন্ত্রীদের মাধ্যমে এ ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে যে তারা প্রবলেম অ্যাভয়েড করছে। মন্ত্রী মহোদয়ের কাছে প্রশ্ন, উনি কি দেখতে পাচ্ছেন না যে গাড়ির দীর্ঘ সারি এবং গ্র্যাজুয়ালি যে পাম্পগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে? সেবাকার্যক্রম বিঘিœত হচ্ছে, স্কুল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে? সেই জায়গাতে উনি কবে নাগাদ এই সমস্যাগুলোর যথাযথভাবে সমাধান দিবেন এবং উনি প্রবলেমটি অ্যাকনলেজ করবেন কি-না?

জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘প্রতিটি পাম্পে যে পরিমাণ তেল প্রতিদিন দেয়ার কথা সেই পরিমাণ তেল আমাদের পাম্পগুলোতে সাপ্লাই করা হচ্ছে। কিন্তু ইরানের ঘটনার পর থেকে হঠাৎ করে বিক্রি বেড়ে গেছে। বিক্রি বেড়ে যাওয়ার ফলে যে পেট্রলপাম্পে যে পরিমাণ তেল দিতাম একদিন দেড় দিন লাগত বিক্রি হতে, এখন দুই ঘণ্টায় শেষ হয়ে যায়। সেজন্য মানুষের যে প্যানিক বায়িংটা শুরু হয়েছে লাইন দেখা যায়। কিন্তু পেট্রল সাপ্লাই হয় না এটা ঠিক না, পেট্রল প্রতিদিন সাপ্লাই করা হয়।

বিদ্যুৎকেন্দ্র ১৩৬টি, উৎপাদন মতা ২৮ হাজার মেগাওয়াট : ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, দেশের বিদ্যুৎ খাতে সমতার নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছে সরকার। বর্তমানে সারা দেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে মোট ১৩৬টি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র সচল রয়েছে। এসব কেন্দ্রের সম্মিলিত উৎপাদন মতা দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াটে।

কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমানের এক প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী এসব তথ্য জানান। তিনি জানান, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতেরই শক্তিশালী অংশগ্রহণ রয়েছে। বর্তমানে দেশে সরকারি মালিকানাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে ৬৪টি। এসব কেন্দ্রের মোট উৎপাদন মতা ১২ হাজার ৩০২ মেগাওয়াট। সেই সাথে বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে উঠেছে ৬৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্র। এগুলোর সম্মিলিত উৎপাদনমতা ১০ হাজার ৮৫৩ মেগাওয়াট। এ ছাড়া সরকারি ও বেসরকারি যৌথ মালিকানায় রয়েছে তিনটি বিশাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, যেগুলোর উৎপাদনমতা তিন হাজার ৬৮ মেগাওয়াট। সব মিলিয়ে দেশের বর্তমান বিদ্যুৎ উৎপাদনমতা এখন ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট।

মন্ত্রী আরো জানান, সমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও বিদ্যুৎ উৎপাদন মূলত নির্ভর করে প্রতিদিনের চাহিদার ওপর। বর্তমানে দেশের বিদ্যুতের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে এই কেন্দ্রগুলো থেকে প্রতিদিন গড়ে ১৪ হাজার ৫০০ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে বলে জানান তিনি।

তেলের মজুদদার ধরতে পুলিশ ডাকার পরামর্শ মন্ত্রীর : জ্বালানি সংগ্রহ করতে গিয়ে সংসদ সদস্যদের অসম্মানিত হওয়া ও সঙ্কটে পড়ার বিষয়টি সংসদে তুলে ধরেছেন পটুয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ। একইসাথে তার এলাকায় ডিলারদের কারসাজি করে বাড়িতে লুকিয়ে তেল বিক্রির অভিযোগও তোলেন তিনি।

জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী বলেছেন, ডিলাররা লুকিয়ে রাখলে আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীর সাহায্যে তাদের ধরে এনে তেল সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। এ ছাড়া রাত ৮টায় দোকানপাট বন্ধ রাখার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক সঙ্কটের কারণে গোটা বিশ্বই এখন সাশ্রয়ী হচ্ছে।

সম্পূরক প্রশ্নে ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, ‘গতকালই দেখলাম আমাদের একজন সম্মানিত সংসদ সদস্য জ্বালানি সংগ্রহ করতে গিয়ে কিছুটা অসম্মানিত হয়েছেন। এর আগে আরেকজন সংসদ সদস্য তেল না পেয়ে সঙ্কটে পড়েছিলেন। আমরা ছোটখাটো জনপ্রতিনিধি, দিনে অন্তত ৩০ থেকে ৪০টা ফোন পাচ্ছি। আমার এলাকা বাউফলে পেট্রলপাম্প না থাকায় ডিলাররা কারসাজি করছেন। তারা দোকান বন্ধ করে দিয়ে নিজেদের বাড়িতে তেল বিক্রি করছেন। সেখানে ম্যাজিস্ট্রেট গেলে তাদের কাউকে পাওয়া যায় না।’

মন্ত্রীর বক্তব্যের বিরোধিতা করে তিনি আরো বলেন, ‘আজকে মন্ত্রী যে কথা বলেছেন, তার সাথে আমাদের এলাকার পরিস্থিতির কোনো মিল নেই। রাত ৮টার মধ্যে বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দিতে বলা হচ্ছে। আমার এলাকা বাউফলে জ্বালানি সঙ্কটে যে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, তা উত্তরণে মন্ত্রণালয় কী পদপে নিচ্ছে?’

জবাবে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘আমাদের যে মজুদ আছে এবং যে এলাকায় প্রতিদিন যতটুকু তেল দেয়ার কথা, আমরা তা সরবরাহ করছি। সংসদ সদস্য নিজেই বললেন, ডিলাররা ইচ্ছে করে পালিয়ে যাচ্ছেন। সেেেত্র স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীকে জানালে তারা ওই ডিলারকে ধরে এনে তেল সরবরাহের ব্যবস্থা করতে পারে।’

রাত ৮টার পর দোকানপাট বন্ধের নির্দেশনার বিষয়ে মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘সারা পৃথিবীতেই এখন সবাই সাশ্রয়ী হয়েছে। আমরা তো পৃথিবীর বাইরে নই। তাই আমরাও সাশ্রয় করার জন্য জনগণকে অনুরোধ করছি। আশা করি জনগণ আমাদের এই অনুরোধ রা করবেন।’