হুন্ডি সিন্ডিকেটে রেমিট্যান্স : নেপথ্যে ফ্যাসিস্ট আমলের প্রভাবশালীরা

এস আলম গ্রুপের ১৮ হাজার কোটি টাকা পাচারের চাঞ্চল্যকর তথ্য

অভিযোগ রয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মন্ত্রী, এমপি এবং বড় বড় ব্যবসায়ীরাই এই হুন্ডি ও মানিলন্ডারিং বাজার নিয়ন্ত্রণ করতেন। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতের আলোচিত খলনায়ক এস আলমের বিরুদ্ধে হুন্ডি ও অফশোর ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিপুল অর্থ পাচারের অভিযোগ দীর্ঘ দিনের। সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া প্রবাসী ব্যবসায়ীদের দাবি, এস আলমের লোকজন বিদেশে অফিস খুলে হুন্ডির ব্যবসা পরিচালনা করেছেন। কুয়ালালামপুরের অত্যন্ত ব্যয়বহুল এলাকায় অবস্থিত ‘রেনিসন’ নামক ৪-স্টার হোটেলের মালিকানা এবং সেখানে বসে হুন্ডি নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও উঠেছে এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও আমেরিকা থেকে আসা রেমিট্যান্সের বড় একটি অংশ এখন বৈধ চ্যানেলের পরিবর্তে হুন্ডি সিন্ডিকেটের দখলে চলে যাচ্ছে। ব্যাংকিং চ্যানেল, বিকাশ ও নগদের মতো ডিজিটাল পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অভিনব কৌশলে এই অবৈধ অর্থ পৌঁছে যাচ্ছে গ্রাহকের হাতে। প্রবাসীদের অভিযোগ, রাষ্ট্রীয় তদারকি সংস্থার ব্যর্থতা এবং একশ্রেণীর ব্যাংক কর্মকর্তার যোগসাজশে এই চক্রের শিকড় গভীরে ছড়িয়েছে।

যেভাবে কাজ করছে ‘ডিজিটাল হুন্ডি’ সিন্ডিকেট

বিদেশে থাকা মানি এক্সচেঞ্জ সংশ্লিষ্ট প্রবাসীরা জানান, হুন্ডি চক্র এখন আর নগদ টাকার ব্যাগে সীমাবদ্ধ নেই। তারা প্রবাসীদের কাছ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা (দিনার, রিংগিট বা ডলার) সংগ্রহ করে তা বিদেশে রেখে দিচ্ছে। পরিবর্তে দেশে থাকা সিন্ডিকেট সদস্যদের নির্দেশনা দিচ্ছে সমপরিমাণ টাকা নির্দিষ্ট ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা করতে।

কুয়েত সিটির একটি রেমিট্যান্স হাউজের ব্যবস্থাপক এ কে এম আজাদ হোসেন জানান, হুন্ডি চক্রের গডফাদারেরা প্রবাসীদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থ ইউরোপ, আমেরিকা ও কানাডার বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দিচ্ছে। সেই অর্থ দিয়ে সেখানে কেনা হচ্ছে দামি বাড়ি ও গাড়ি। আর বাংলাদেশে থাকা চক্রটি দেশীয় টাকা ব্যবহার করে গ্রাহকের চাহিদা মেটাচ্ছে। এর ফলে এক দিকে রেমিট্যান্স থেকে বঞ্চিত হচ্ছে রাষ্ট্র, অন্য দিকে দেশীয় মুদ্রা পাচার হয়ে যাচ্ছে বিদেশে।

এস আলম ও ফ্যাসিস্ট আমলের প্রভাব

অভিযোগ রয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মন্ত্রী, এমপি এবং বড় বড় ব্যবসায়ীরাই এই হুন্ডি ও মানিলন্ডারিং বাজার নিয়ন্ত্রণ করতেন। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতের আলোচিত খলনায়ক এস আলমের বিরুদ্ধে হুন্ডি ও অফশোর ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিপুল অর্থ পাচারের অভিযোগ দীর্ঘ দিনের।

সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া প্রবাসী ব্যবসায়ীদের দাবি, এস আলমের লোকজন বিদেশে অফিস খুলে হুন্ডির ব্যবসা পরিচালনা করেছেন। কুয়ালালামপুরের অত্যন্ত ব্যয়বহুল এলাকায় অবস্থিত ‘রেনিসন’ নামক ৪-স্টার হোটেলের মালিকানা এবং সেখানে বসে হুন্ডি নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও উঠেছে এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে।

সিআইডির অনুসন্ধান ও ভয়াবহ তথ্য

সিআইডি সূত্র জানিয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং আইনে বড় ধরনের অনুসন্ধান চলছে। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে: এস আলম গ্রুপ নামসর্বস্ব কোম্পানি খুলে অফশোর ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা পাচার করেছে।

সঙ্ঘবদ্ধ অপরাধ, জালিয়াতি এবং ওভার ও আন্ডার ইনভয়েজিংয়ের মাধ্যমে সর্বমোট প্রায় এক লাখ ১৩ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগ খতিয়ে দেখছে সিআইডি।

পাচারকৃত অর্থে সিঙ্গাপুরে প্রায় ২৪৫ কোটি ৭৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘ক্যানালি লজিস্টিক প্রাইভেট লিমিটেড’ নামক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছেন সাইফুল আলম।

নজরদারির অভাব ও বিএফআইইউ’র ভূমিকা

প্রবাসী বাংলাদেশীদের মতে, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর নজরদারি থাকলে এই পাচার রোধ করা সম্ভব ছিল। তাদের দাবি, কোন অ্যাকাউন্টে অস্বাভাবিক লেনদেন হচ্ছে, তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষে সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব। কিন্তু সদিচ্ছার অভাবে পাচারকারীরা পার পেয়ে গেছে।

আক্ষেপ করে একজন প্রবাসী ব্যবসায়ী বলেন, ‘ভারত বর্তমানে বিশ্বের পঞ্চম রেমিট্যান্স আহরণকারী দেশ। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, ভারতের রেমিট্যান্সের একটি বড় উৎস হিসেবে বাংলাদেশের নাম উঠে এসেছে। এটি কীভাবে সম্ভব তা তদন্ত করলেই থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে।’

সিআইডির বক্তব্য

এ বিষয়ে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার ও মুখপাত্র জসিম উদ্দিন খান জানান, মানিলন্ডারিং নিয়ে তাদের তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, ‘তদন্তে যাদেরই নাম আসছে, আমরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি। এক-দু’জন অসাধু ব্যাংক কর্মকর্তার যোগসাজশ থাকতে পারে, যা তদন্তে বেরিয়ে আসবে। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো এই অবৈধ লেনদেনের চূড়ান্ত সুবিধাভোগী বা ‘বেনিফিশিয়ারি’ কারা, তাদের খুঁজে বের করা।’

বর্তমানে এস আলম এবং তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে সঙ্ঘবদ্ধ মানিলন্ডারিং অপরাধের প্রাথমিক প্রমাণ সিআইডির হাতে রয়েছে বলে জানা গেছে। ক্রাইম কনফারেন্স ও তদন্ত শেষে এই বিষয়ে আরো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের আশ্বাস দিয়েছে সংস্থাটি।