খাদ্যনিরাপত্তায় কালো মেঘ

সার কারখানা বন্ধের মাশুল দিচ্ছে কৃষি

আধুনিক কৃষিব্যবস্থায় রাসায়নিক সার বাংলাদেশের খাদ্য উৎপাদনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। কিন্তু দীর্ঘদিনের গ্যাস সঙ্কট, জরাজীর্ণ যন্ত্রপাতি এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের অভাবে দেশের সরকারি সার কারখানাগুলো বারবার উৎপাদন বন্ধ বা সীমিত করতে বাধ্য হচ্ছে। এর ফলে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে এবং কৃষি খাত ক্রমশ আমদানিনির্ভর হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষকের ওপর, আর রাষ্ট্রকে গুনতে হচ্ছে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ও ভর্তুকির চাপ- যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্যনিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক সঙ্কেত বহন করছে।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

আধুনিক কৃষিব্যবস্থায় রাসায়নিক সার বাংলাদেশের খাদ্য উৎপাদনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। কিন্তু দীর্ঘদিনের গ্যাস সঙ্কট, জরাজীর্ণ যন্ত্রপাতি এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের অভাবে দেশের সরকারি সার কারখানাগুলো বারবার উৎপাদন বন্ধ বা সীমিত করতে বাধ্য হচ্ছে। এর ফলে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে এবং কৃষি খাত ক্রমশ আমদানিনির্ভর হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষকের ওপর, আর রাষ্ট্রকে গুনতে হচ্ছে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ও ভর্তুকির চাপ- যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্যনিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক সঙ্কেত বহন করছে।

উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও কৃষকের নাভিশ্বাস

গ্যাস সরবরাহে ঘাটতির কারণে যমুনা ও আশুগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ সার কারখানাগুলো নিয়মিত উৎপাদন চালু রাখতে পারছে না। এর সুযোগে বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে সরকার নির্ধারিত দামের বাইরে গিয়ে কৃষকদের প্রতি বস্তা সারে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত মূল্য দিতে হচ্ছে।

এই মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ছে উৎপাদন ব্যয়ে। ধান, আলু ও সবজি চাষে খরচ ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। অনেক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক বাড়তি ব্যয় বহন করতে না পেরে আবাদ কমিয়ে দিচ্ছেন বা বিকল্প ফসলের দিকে ঝুঁকছেন। এর ফলে সামগ্রিক কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থায় একটি নেতিবাচক প্রবণতা তৈরি হচ্ছে।

আমদানিনির্ভরতা ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপ

একসময় দেশের ইউরিয়া সারের বড় অংশই দেশীয় কারখানাগুলো থেকে সরবরাহ করা হতো। কিন্তু উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় এখন কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশ থেকে উচ্চমূল্যে সার আমদানি করতে হচ্ছে। গত দুই বছরে এই আমদানির কারণে সরকারকে অতিরিক্ত কয়েক হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি দিতে হয়েছে। ডলার সঙ্কটের প্রেক্ষাপটে এই ব্যয় জাতীয় অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে এবং অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়নেও বাধা তৈরি করছে।

মাটির উর্বরতা হুমকির মুখে

টিএসপি (ঞঝচ) ও ডিএপি (উঅচ) সারের সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয়ায় অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে কেবল ইউরিয়ার ওপর নির্ভর করছেন। কৃষিবিদদের মতে, সুষম সার ব্যবহারের অভাব এবং অতিরিক্ত ইউরিয়া প্রয়োগ মাটির জৈবগঠন ও পুষ্টি ভারসাম্য নষ্ট করছে।

এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী এক দশকে দেশের বহু আবাদি জমি উর্বরতা হারিয়ে উৎপাদনক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে যা খাদ্য উৎপাদনের জন্য দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

কারখানার বর্তমান অবস্থা : একটি উদ্বেগজনক চিত্র

দেশের সার কারখানাগুলো মূলত প্রাকৃতিক গ্যাসনির্ভর। গ্যাস রেশনিংয়ের ফলে এই খাতই প্রথম ধাক্কা খায়। বর্তমানে পরিস্থিতি সংক্ষেপে নি¤œরূপ :

যমুনা সার কারখানা (জেএফসিএল): ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে গ্যাস সঙ্কটের কারণে উৎপাদন অনিয়মিত।

চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) ও আশুগঞ্জ : যান্ত্রিক জরাজীর্ণতা ও গ্যাসসঙ্কটে দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে।

ঘোড়াশাল-পলাশ : সচল থাকলেও গ্যাসের চাপ কমে গেলে উৎপাদন ঝুঁকির মুখে পড়ে।

ফেঞ্চুগঞ্জ ও পুরাতন পলাশ : যান্ত্রিক ত্রুটি ও আধুনিকায়ন প্রকল্পের কারণে কার্যত বন্ধ বা সংস্কারাধীন।

সম্ভাব্য উৎপাদন ঘাটতি : আশঙ্কার হিসাব

কৃষি গবেষণায় দেখা গেছে, সারের ব্যবহার ও ফসলের ফলনের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। সারের সরবরাহ ২০-৩০ শতাংশ কমে গেলে বোরো ধানের উৎপাদন ১০-১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।

বাংলাদেশে বছরে প্রায় চার কোটি মেট্রিক টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলে, ১০ শতাংশ ঘাটতি মানে প্রায় ৪০ লাখ মেট্রিক টন চালের অভাব। আলু ও সবজির ক্ষেত্রেও উৎপাদন ২৫-৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে, যা বাজারে মূল্যস্ফীতি ও খাদ্য সঙ্কটকে আরো তীব্র করতে পারে।

সরকারি অবস্থান ও বাস্তব চ্যালেঞ্জ

কৃষি মন্ত্রণালয়ের দাবি- দেশে সারের কোনো ঘাটতি নেই, বাফার স্টকের মাধ্যমে চাহিদা পূরণ করা হচ্ছে। তবে বাস্তবতায় তারা কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে- আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি ও টাকার অবমূল্যায়নের কারণে ভর্তুকির চাপ দ্রুত বাড়ছে। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় জি-টু-জি চুক্তির মাধ্যমে আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। কৃষকদের ন্যানো-ইউরিয়া ও জৈব সার ব্যবহারে উৎসাহ দেয়া হলেও এর বিস্তার এখনও সীমিত।

সমাধানের পথ : নীতিগত ও কৌশলগত উদ্যোগ জরুরি

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সার কেবল একটি কৃষি উপকরণ নয়- এটি একটি কৌশলগত সম্পদ। পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হয়ে পড়া দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যসহ বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে সরবরাহব্যবস্থা বিঘিœত হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

করণীয় পদক্ষেপ : ১. সার কারখানাগুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা। ২. পুরনো ও অকার্যকর কারখানাগুলো দ্রুত আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তি উন্নয়ন করা। ৩. সার আমদানির জন্য বহুমুখী উৎস নিশ্চিত করে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করা। ৪. অন্তত তিন মাসের চাহিদা মেটাতে সক্ষম এমন বাফার স্টক গড়ে তোলা।

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি কৃষি। এই ভিত্তি টিকিয়ে রাখতে সারের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এটি কেবল কৃষি খাতের সমস্যা নয়, বরং জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সার্বিক নিরাপত্তার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

সময়ের আগেই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আজকের সঙ্কট আগামী দিনে বড় ধরনের খাদ্যসঙ্কটে রূপ নিতে পারে। তাই সার কারখানাগুলো সচল রাখা এখন শুধু অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি একটি জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয়।