শ্রম আইন লঙ্ঘনে ঝুঁকিতে কারখানার কমপ্লায়েন্স

ওভারটাইম, নিরাপত্তাহীনতা ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে বাড়ছে উদ্বেগ

শাহ আলম নূর
Printed Edition

বাংলাদেশের শিল্প খাতে আন্তর্জাতিক মানের কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করার কথা দীর্ঘদিন ধরে বলা হলেও বাস্তবে এখনো শ্রম আইন লঙ্ঘনের বিস্তর অভিযোগ রয়ে গেছে। বিশেষ করে তৈরী পোশাক, চামড়া, প্লাস্টিক, ইলেকট্রনিকস ও হালকা প্রকৌশল খাতে অতিরিক্ত ওভারটাইম, অগ্নি ও ভবন নিরাপত্তার ঘাটতি এবং চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মাধ্যমে শ্রমিকদের অধিকার সীমিত করার প্রবণতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে হলে শুধু উৎপাদন নয়, শ্রম আইন মেনে চলাও এখন বড় শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ অনুযায়ী একজন শ্রমিকের দৈনিক কর্মঘণ্টা আট ঘণ্টা, এর সাথে অতিরিক্ত দুই ঘণ্টা ওভারটাইমসহ সর্বোচ্চ ১০ ঘণ্টা কাজের সুযোগ রয়েছে। এতে সপ্তাহে মোট কর্মঘণ্টা ৬০ ঘণ্টার বেশি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু বাস্তব চিত্র অনেক ক্ষেত্রেই ভিন্ন। শিল্পাঞ্চল গাজীপুর, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বহু প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের প্রতিদিন ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় আট কোটি কর্মক্ষম মানুষের মধ্যে প্রায় ৪৫ লাখ শ্রমিক সরাসরি তৈরী পোশাক শিল্পে কাজ করছেন। এর মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ নারী। দেশের মোট রফতানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ আসে এই খাত থেকে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে পোশাক রফতানি থেকে আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এত বড় শিল্প খাতে উৎপাদনের চাপ বাড়ার সাথে সাথে শ্রমিকদের ওপর কাজের চাপও বাড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শ্রম অধিকার সংগঠনগুলোর একাধিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অনেক কারখানায় শ্রমিকদের সম্মতি ছাড়াই বাধ্যতামূলক ওভারটাইম করানো হয়। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) জরিপে অংশ নেয়া শ্রমিকদের প্রায় ৫২ শতাংশ জানিয়েছেন তারা নিয়মিত আইনসিদ্ধ সীমার বাইরে কাজ করেন। একইসাথে প্রায় ৩৭ শতাংশ শ্রমিকের অভিযোগ, ওভারটাইমের পূর্ণ অর্থ তারা সময়মতো পান না।

গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানার শ্রমিক রিনা আক্তার নয়া দিগন্তকে বলেন, সকাল ৮টায় কাজে ঢুকি, অনেক দিন রাত ৯টা-১০টার আগে বের হতে পারি না। টার্গেট পূরণ না হলে ছুটি নেই, অসুস্থ হলেও কাজ করতে হয়। শুধু ওভারটাইম নয়, কারখানার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ কমেনি। ২০১৩ সালের রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর বাংলাদেশে কারখানা নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের সংস্কার শুরু হয়। ওই দুর্ঘটনায় সরকারি হিসাব অনুযায়ী এক হাজার ১৩৪ জন শ্রমিক নিহত হন আহত হন দুই হাজারের বেশি। এরপর আন্তর্জাতিক জোট অ্যাকর্ড ও অ্যালায়ান্স প্রায় দুই হাজারের বেশি কারখানায় নিরাপত্তা পরিদর্শন করে। তবে শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, বড় রফতানিমুখী কারখানায় কিছু উন্নয়ন হলেও ছোট ও সাব-কন্ট্রাক্ট কারখানাগুলোতে এখনো ঝুঁকি রয়েই গেছে। শ্রম অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত শিল্পকারখানার সংখ্যা প্রায় ৫৫ হাজারের বেশি হলেও নিয়মিত পরিদর্শনের আওতায় আসে সীমিতসংখ্যক প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে দেশে শ্রম পরিদর্শকের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এদিকে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে শিল্পকারখানায় অগ্নিকাণ্ডে শতাধিক শ্রমিক হতাহত হয়েছেন। অনেক কারখানায় জরুরি নির্গমন পথ সঙ্কুচিত, অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র অকার্যকর এবং নিরাপত্তা মহড়া অনিয়মিত বলেও অভিযোগ রয়েছে। নারায়ণগঞ্জের একটি কারখানার শ্রমিক সোহেল রানা নয়া দিগন্তকে বলেন, আগুন লাগলে কিভাবে বের হতে হবে, তা অনেক শ্রমিকই জানেন না। ফায়ার ড্রিল কাগজে হয়, বাস্তবে হয় না। শ্রম আইন লঙ্ঘনের আরেকটি বড় অভিযোগ হচ্ছে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ। শ্রম আইন অনুযায়ী স্থায়ী প্রকৃতির কাজে দীর্ঘ সময় নিয়োজিত শ্রমিককে স্থায়ী সুবিধা দেয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক প্রতিষ্ঠান শ্রমিকদের অস্থায়ী, ক্যাজুয়াল বা চুক্তিভিত্তিক কর্মী হিসেবে বছরের পর বছর ধরে কাজ করাচ্ছে।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী, কিছু শিল্পাঞ্চলে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ শ্রমিক চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছেন। এতে শ্রমিকরা প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, চিকিৎসাসুবিধা এবং চাকরির নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

শ্রমিক নেত্রী নাজমা আকতার নয়া দিগন্তকে বলেন, স্থায়ী শ্রমিক নিয়োগ দিলে মালিকদের দায়বদ্ধতা বাড়ে। তাই অনেক কারখানা ইচ্ছাকৃতভাবে শ্রমিকদের চুক্তিভিত্তিক রেখে দেয়। এতে শ্রমিকরা ইউনিয়ন গঠন বা অধিকার দাবি করতেও ভয় পান। বাংলাদেশে শ্রম অধিকার পরিস্থিতি উন্নয়নে অগ্রগতি হলেও ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রম, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং কর্মঘণ্টা নিয়ন্ত্রণ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। আইএলও বলছে, টেকসই শিল্প উন্নয়নের জন্য শ্রমিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার ক্রেতারা এখন সাপ্লাই চেইনে মানবাধিকার পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। শ্রম আইন লঙ্ঘনের ঘটনা বাড়লে বাংলাদেশী পণ্যের ওপর বাড়তি নজরদারি বা বাণিজ্যিক চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন করপোরেট সাসটেইনেবিলিটি ডিউ ডিলিজেন্স নীতিমালার কারণে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোকে তাদের সরবরাহ শৃঙ্খলে শ্রম অধিকার নিশ্চিত করার প্রমাণ দিতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের কারখানাগুলোর ওপরও চাপ বাড়ছে। ক্রেতারা এখন শুধু কারখানার কাগুজে সনদ নয়, বাস্তব পরিস্থিতিও যাচাই করছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের শিল্প খাতকে টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক রাখতে হলে কম্প্লায়েন্সকে কেবল বিদেশী ক্রেতাদের শর্ত হিসেবে নয়, শিল্প সংস্কৃতির অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শ্রমিকের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে উৎপাদনশীলতা, বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের ভাবমূর্তি সবকিছুই ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে তারা মনে করছেন।