মুহা: আব্দুল আউয়ালরাজশাহী ব্যুরো
জ্যৈষ্ঠের শুরুতেই রসালো আম নামানোর উৎসবকে কেন্দ্র করে আবারো প্রাণচাঞ্চল্যে ভরে উঠেছে উত্তরের জনপদ রাজশাহী। জেলার বাগানজুড়ে এখন চলছে আম পাড়া, বাছাই, প্যাকেটজাত ও বাজারজাতকরণের ব্যস্ততা। আমকে ঘিরে কৃষক, ব্যবসায়ী, শ্রমিক, পরিবহনকর্মী, আড়তদার ও কুরিয়ার সেবায় যুক্ত হাজারো মানুষের কর্মচাঞ্চল্যে মুখর হয়ে উঠেছে পুরো অঞ্চল। সংশ্লিষ্টদের আশা, অনুকূল আবহাওয়া বজায় থাকলে চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে প্রায় ৮০০ কোটি টাকার আমের বাণিজ্য হতে পারে।
জেলা প্রশাসনের নির্ধারিত ‘ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার’ অনুযায়ী গত ১৫ মে থেকে গুটি জাতের আম বাজারে আসতে শুরু করেছে। এরপর পর্যায়ক্রমে ২২ মে থেকে গোপালভোগ, ২৫ মে রানীপছন্দ ও লক্ষ্মণভোগ, ৩০ মে থেকে হিমসাগর বা খিরসাপাত, ১০ জুন থেকে ল্যাংড়া ও ব্যানানা ম্যাঙ্গো এবং ১৫ জুন থেকে আম্রপালি ও ফজলি বাজারে আসবে। জুলাই পর্যন্ত চলবে বিভিন্ন জাতের আম সংগ্রহ ও বিপণন কার্যক্রম।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ১৯ হাজার ৬২ হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়েছে। এসব বাগান থেকে প্রায় দুই লাখ ৪৩ হাজার ৯৯৩ মেট্রিকটন আম উৎপাদনের ল্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ উৎপাদিত আম বিক্রি করে ৭৮০ থেকে ৮০০ কোটি টাকার বাণিজ্য হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
রাজশাহীর সবচেয়ে বড় আমের মোকাম পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বর হাট; সেখানে ইতোমধ্যে জমে উঠতে শুরু করেছে বেচাকেনা। মৌসুমের শুরুতে গুটি আম মণপ্রতি ৮০০-এক হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। বর্তমানে বড় আকারের গুটি আমের দাম এক হাজার দুই শ’ থেকে এক হাজার চার শ’ টাকার মধ্যে রয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, উন্নত জাতের আম বাজারে এলে বেচাকেনা আরো বাড়বে এবং বাজারে নতুন গতি আসবে।
পুঠিয়া উপজেলার এক ব্যবসায়ী জানান, এবারের আমের সাইজ মাঝারি হলেও স্বাদ ও গুণগত মান বেশ ভালো। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা রাজশাহীতে আসতে শুরু করেছেন। প্রতিদিন ট্রাক ও কুরিয়ারযোগে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে আম পাঠানো হচ্ছে। পাশাপাশি অনলাইনভিত্তিক আম বিক্রিও আগের চেয়ে কয়েকগুণ বেড়েছে।
চাষিদের ভাষ্য, মৌসুমের শুরুতে তীব্র তাপদাহে কিছু গুটি ঝরে পড়লেও পরবর্তী সময়ে হওয়া বৃষ্টিতে আমের বৃদ্ধি ভালো হয়েছে। ফলে অধিকাংশ বাগানেই এবার ভালো ফলনের আশা দেখা যাচ্ছে।
বাঘা উপজেলার একাধিক আমচাষি জানান, গত বছরের তুলনায় অনেক বাগানে ফলন বেশি হয়েছে। তবে উৎপাদন খরচ, শ্রমিকের মজুরি, সার, কীটনাশক ও সেচ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় লাভ নিয়ে কিছুটা শঙ্কাও রয়েছে।
বাঘা পৌর এলাকার আম ব্যবসায়ী আবদুল খালেক বলেন, আমি প্রায় ১৫ লাখ টাকার আমের বাগান কিনেছি। গত তিন মাস পরিচর্যা করতে গিয়ে আরো প্রায় দুই লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এখন প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এবং আমের দাম ভালো থাকলে এ বছর লাভের আশা করছি।
আমকে ঘিরে রাজশাহীর অর্থনীতিতেও তৈরি হয়েছে বড় ধরনের গতি। শুধু আম বিক্রিই নয়, এর সাথে জড়িত পরিবহন খাত, বাঁশের ঝুড়ি ও প্লাস্টিক ক্যারেট ব্যবসা, প্যাকেজিং, আড়ত এবং কুরিয়ার সেবাতেও বেড়েছে কর্মসংস্থান। ফলে আম মৌসুমকে কেন্দ্র করে রাজশাহীর গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতোমধ্যে প্রাণ ফিরে এসেছে।
আম বিশেষজ্ঞ ও নদী-পরিবেশ গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, রাজশাহীর আম শুধু একটি সুস্বাদু ফল নয়; এটি এ অঞ্চলের অর্থনীতি, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রার সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর চাষাবাদ, মানসম্মত সংরণ ব্যবস্থা ও পরিকল্পিত বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে রাজশাহীর আম দেশের অর্থনীতিতে আরো বড় অবদান রাখতে পারবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও ‘রাজশাহীর আম’ একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে।



