- কাওরান বাজারে দৈনিক দুই থেকে তিন কোটি টাকা চাঁদাবাজি : জামায়াত
- চাঁদাবাজের পাঁচটা নাম দিতে না পারলে, অভিযোগ প্রত্যাখ্যান : বিএনপি
- কর আদায় না বাড়িয়ে ব্যয় বাড়ালে অর্থনৈতিক চাপ বাড়বে : সিপিডি
- বাজেটে অর্থনৈতিক বিষয়গুলোর রাজনৈতিক বিষয় বেশি আসছে : দেবপ্রিয়
- মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, মানুষের কষ্ট বাড়ছে : ক্যাব সভাপতি
বাজেট আলোচনায় রাজধানীর কাওরান বাজারে চাঁদাবাজি নিয়ে জামায়াতে ইসলামী এবং বিএনপি এমপির মধ্যে বাহাস হয়। ঢাকা-১২ আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান বলেন, প্রতিদিন প্রায় দুই থেকে তিন কোটি টাকার চাঁদাবাজি হয়। এর মধ্যে এই বাজারের কয়েকটি পাইকারি মুরগির দোকান থেকেই মাসে প্রায় ৬০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। এমন দাবি করেছেন বিরোধী দল। আর বিএনপির সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য মাহ্মুদা হাবীবা জামায়াতের এমপির দাবিকে ‘ঢালাও অভিযোগ’ হিসেবে অভিহিত করে তাকে সরাসরি আইনি পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান। পাঁচটা চাঁদাবাজের নাম দিতে না পারলে এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করলাম। জবাবে জামায়াতের এমপি বলেন, আগেও সরকারি দলের লোকেরা চাঁদাবাজি করত, এখনো সরকারি দলের লোকেরাই চাঁদাবাজি করছে।
বাজেটে ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার কার্ড ইত্যাদি নিয়ে যতখানি রাজনৈতিক অঙ্গীকারের বাহ্যিক দিকগুলো আছে, খাল খনন আলোচনা হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সুদহার কমানো, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, একই সাথে টাকার বিনিময় হারকে স্থিতিশীল রাখা ইত্যাদি বিষয়গুলো কিন্তু বৃহৎভাবে মনোযোগের ভেতরে আসছে না। বিশেষ করে মানুষের রুটি রুজির বিষয়।
রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল সোমবার নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ : রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও নাগরিক প্রত্যাশা’ শীর্ষক প্রাক-বাজেট আলোচনার সঞ্চালনায় বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো এবং নাগরিক প্ল্যাটফর্ম’র আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফ, সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শরমিন্দ নীলোর্মি, নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক প্রমুখ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডি অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান।
আমি চাঁদাবাজি এরিয়ার এমপি : জামায়াতের সাইফুল
নিজের সংসদীয় এলাকা তেজগাঁও-কাওরান বাজারের পরিস্থিতি তুলে ধরে জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান বলেন, আমি তো আসলে চাঁদাবাজি এরিয়ার এমপি। কাওরান বাজারের চাঁদাবাজি নিয়ে বলতে গেলে একদিন সময় লাগবে। তিনি বলেন, এই চাঁদাবাজি যারা করে, ওপরে তারা রাজনৈতিক নেতা, ভেতরে চাঁদাবাজ। এটা আগের সরকারের লোকেরা করত, এখন কারা করে তা আর এখানে বলছি না।
সাইফুল আলম বলেন, আমার এলাকার সবচেয়ে বড় চাঁদাবাজির এলাকা হলো কাওরান বাজার। আগে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজে চাঁদাবাজিতে জড়িত ছিলেন। তিনি আমার মহল্লার লোক, আমি সব পরিষ্কার জানি। কাওরান বাজারে চাঁদাবাজি কেন্দ্র করে যুবদলের একজন নেতা (মুসাব্বির) নিহত হয়েছিলেন। বিএনপির এমপি মামলা করার কথা বলেছেন। কিন্তু পুলিশ চাঁদাবাজি নিয়ে সরকারি দলের লোকের বিরুদ্ধে মামলা নেয় না।
চাঁদাবাজি নিয়ে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সাথে কথা হয়েছে বলে উল্লেখ করে সাইফুল আলম খান বলেন, আমি তার সহযোগিতা চেয়েছি। একজন মন্ত্রী আমাকে পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলাপ করতে। আমি চাচ্ছি কাওরান বাজার, মহাখালী বাসস্ট্যান্ড ও তেজগাঁও অঞ্চলে যে চাঁদাবাজি হচ্ছে, তা বন্ধ হোক।
চাঁদাবাজদের স্পষ্ট তালিকা দেন, বিএনপির হাবীবা
বিএনপির সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য মাহ্মুদা হাবীবা বলেন, এমপি সাহেব বলছেন, তার এলাকায় চাঁদাবাজি হচ্ছে এবং সেটা তিনি জানেন না, কারা করছেন। এর চেয়ে দুঃখজনক আর কিছু হতে পারে না। কারা চাঁদাবাজি করছে তার একটা স্পষ্ট তালিকা তার (জামায়াতের এমপি) কাছে থাকা উচিত। এই তালিকা নিয়ে তার আইনের কাছে যাওয়া উচিত। তিনি বলেন, টকশোতে বা গোলটেবিলে বসে এ ধরনের আলোচনায় আমরা কথা বলতেই পারি। কিন্তু পাঁচটা নাম যখন দিতে পারি না, সেটা তখন ঢালাও বক্তব্য হয়ে যায়। আমার সংসদীয় এলাকায় যারা চাঁদাবাজি করবে, সে সরকারি দল হোক বা বাইরের দল হোক, আমি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করব। সেখানে আমি অবশ্যই আইনের আশ্রয় নেব। তাই আমি জামায়াত এমপির দাবি প্রত্যাখ্যান করছি।
জাকাতের বিষয়ে তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয়ভাবে জাকাতের টাকা দিতে মানুষ বিশ^াস পায় না। কারণ এই টাকা কোথায় খরচ হয় তা নিয়ে তাদের সন্দেহ।
আগামী বাজেট ভিন্ন রকমের পরিস্থিতিতে আসছে : দেবপ্রিয়
ড. দেবপ্রিয় ভট্টচার্য্য বলেন, আগামী বছরের যে বাজেট আসছে এটা যেকোনো বছরের বাজেটের চেয়ে ভিন্ন রকমের একটি পরিস্থিতিতে আসছে। আমি আগেই বলেছি যে উত্তরাধিকার সূত্রে বিভিন্ন ধরনের চাপের মধ্যে এই আর্থিক ব্যবস্থাপনা করতে হচ্ছে। একই রকমভাবে বৈশ্বিক বিভিন্ন ধরনের সমস্যা আমাদের এই অর্থনীতির ওপর চাপ এবং অনেক বিভিন্ন ধরনের অনিশ্চয়তায় সৃষ্টি করছে। তিনি বলেন, একই সাথে আমরা যেটা লক্ষ করছি, বিভিন্ন শর্তসাপেক্ষে আমরা ঋণ নিয়েছি বিদেশ থেকে। সেগুলোকে পরিপালন করার জন্য বিভিন্ন ধরনের চাপের মধ্যে আমরা আছি। সর্বোপরি যেহেতু একটি সদ্য নির্বাচিত সরকার সেহেতু জনমানুষের প্রত্যাশায় এবং তাদের যে সমস্ত রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি আছে সেগুলোকে তাদের মিটানোর একটা ব্যাপার আছে। এইরকম একটি পরিস্থিতিতে বাজেটটা তাহলে কিরকম প্রয়োজন সেটা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
দেবপ্রিয় বলেন, একটা একটা পা আমরা পেছনে যেয়ে যেখানে বলতে চাই তিন থেকে চার মাস হলো এই সরকার দিয়েছে দায়িত্ব নিয়েছে। এক নম্বর যেটা গুরুত্বপূর্ণ হয় সেটা হলো তারা কী অবস্থায় এই অর্থনীতিকে পেয়েছেন। তার কিন্তু উনারা কোনো প্রামাণ্য দলিল তৈরি করেননি। অর্থমন্ত্রী বাজেটের সম্পর্কে বা অর্থনীতির পরিস্থিতি সম্বন্ধে সংসদে বিভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। কিন্তু একত্রভাবে এই অর্থনীতির কি পরিস্থিতিতে আমরা যেটাকে বেঞ্চমার্কিং বলি সেটা কিন্তু উনারা করেননি। যদি ওটা উনারা করতেন তাহলে কিন্তু আরো অনেক বেশি সম্মুখভাবে সেই অর্থনৈতিক যে চ্যালেঞ্জগুলো ওটে আসত।
তিনি বলেন, যে বিষয়টি আসছে সেটা হলো, পুরো বাজেটে সমাজ কল্যাণমূলক কাজের ভেতরে আসছেন। অথচ প্রতি জায়গায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করার যে মূল জায়গাটা সেই জায়গাটা যথেষ্টভাবে গুরুত্ব পায় না। কারণ হলো, আপনি সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা না বলে বিভিন্ন এই যে গুরুত্বপূর্ণ এটার আবেদনপূর্ণ কিন্তু তাদের অর্থনৈতিক তাৎপর্য সামগ্রিকতায় কতখানি সেটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে আমাদের চোখের সামনে আমরা সেই ভাবে দেখি নাই।
পরিচালন ব্যয় বাড়ালে সরকারের ওপর চাপ বাড়বে : তৌফিক
তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, কর আদায় না বাড়িয়ে পরিচালন ব্যয় বাড়ালে সরকারের ওপর চাপ বাড়বে। উন্নয়ন বাজেট বাড়াতে হলে অবশ্যই সরকারের কর আদায়ও বাড়াতে হবে। কর আদায় না বাড়লে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যে বাণিজ্য চুক্তিতে আমরা আবদ্ধ হয়েছি, সেটিও সরকারের ওপর চাপ বাড়াবে। তিনি বলেন, সরকারের ঋণ বাড়ছে, বিপরীতে উন্নয়ন চাহিদাও বাড়ছে। আগামী বাজেটে ঋণের চাপ আরো বাড়তে পারে।
সিপিডির তৌফিক বলেন, দীর্ঘ বিরতির পর আবার সম্পদ কর চালুর বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ধারণা করা হচ্ছে, ৪ কোটি টাকার বেশি নিট সম্পদের ওপর শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে ১ শতাংশ হারে এই কর আরোপ করা হতে পারে। যা থেকে বছরে ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত বাড়তি রাজস্ব আয় সম্ভব। তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পদের ওপর কোনো কর নেই। যা আন্তঃপ্রজন্ম সম্পদ কুক্ষিগত হওয়ার একটি বড় কারণ। তাই উচ্চমূল্যের সম্পত্তি হস্তান্তরের ওপর উত্তরাধিকার কর আরোপের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়েছে।
তিনি বলেন, ২০২২ অর্থবছরে ই-কমার্স খাতের লেনদেন ৯৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন টাকায় পৌঁছালেও, এর বড় একটি অংশ এখনো করের আওতার বাইরে।
বাজেট ঋণ নির্ভরতা কমাতে হবে : ড. মোস্তাফিজ
অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাজেটে জনগণ কতটা দিচ্ছে এবং কতটা ফেরত পাচ্ছে, সেটির মূল্যায়ন হওয়া উচিত। এখানে জনগণের থেকে নিয়ে কতটা দুর্নীতি হচ্ছে তার মেজারমেন্ট হওয়া উচিত। তিনি বলেন, আগামী বাজেটে এক লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা ঋণের সুদ হিসেবে ব্যয় করতে হবে। এরকম ঋণ নির্ভরতা কমিয়ে আনতে হবে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বোয়িং বিমান চুক্তিসহ যেসব চুক্তি হয়েছে, তাতে শুল্কছাড়ের কথা বলা হচ্ছে। বস্তুতপক্ষে শুল্কহার কমবে কিনা, সেটির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন হওয়া উচিত।
খাতভিত্তিক বরাদ্দ না বাড়িয়ে কোয়ালিটিতে জোর দেয়া : ফজলুল হক
বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি মো: ফজলুল হক বলেন, খাতভিত্তিক বরাদ্দ দুই-এক বছর না বাড়িয়ে কোয়ালিটিতে জোর দেয়া উচিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বরাদ্দ বাড়লেও লক্ষ্য ও বাস্তবায়নের মধ্যে বড় তফাত দেখা গেছে। মাঝখানে বড় অঙ্কের দুর্নীতি হয়। বস্তুতপক্ষে বরাদ্দ না বাড়িয়ে কোয়ালিটি বজায় রেখে ব্যয় হলে আমাদের বাজেট ঘাটতিও কমে আসবে। তিনি বলেন, আমাদের ব্যাংকিং খাতে তারল্য সঙ্কট ও বিদ্যুৎ সমস্যা এখনো দূর হয়নি। বর্তমান সরকারের বয়স যেহেতু মাত্র তিন মাস, সেহেতু আমরা এখনই তাদের দোষ দিতে চাই না। তবে এর মধ্যে বেশ কিছু উন্নতিও আমরা দেখেছি।
মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, মানুষের কষ্ট বাড়ছে : ক্যাব
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, মানুষের কষ্ট বাড়ছে। এ জন্য বাজেটে প্রয়োজনীয় দ্রব্যের আমদানি শুল্ক কমানো প্রয়োজন। এ ছাড়া জ্বালানির দাম আর না বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি।



