নাগরপুরে বাঁশ-কাঠের সাঁকোতে ৯ গ্রামের মানুষের পারাপার

সেতুর জন্য দুই দশকের অপেক্ষা

Printed Edition
স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মিত নড়বড়ে বাঁশ ও কাঠের সেতু : নয়া দিগন্ত
স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মিত নড়বড়ে বাঁশ ও কাঠের সেতু : নয়া দিগন্ত

মো: তারিকুল ইসলাম নাগরপুর (টাঙ্গাইল)

টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার মোকনা ইউনিয়নের পংবাইজোড়া-দেইল্লা সড়কে ধলেশ্বরী নদীর শাখা অংশের ওপর নির্মিত বাঁশ ও কাঠের একটি নড়বড়ে সাঁকোই এখন ৯ গ্রামের মানুষের একমাত্র পারাপারের উপায়। প্রায় পাঁচ বছর আগে স্থানীয়রা স্বেচ্ছাশ্রমে সাঁকোটি নির্মাণ করলেও সেটি এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একটি স্থায়ী সেতুর অভাবে দীর্ঘদিন ধরে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন এলাকাবাসী। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, কৃষক ও রোগীদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি।

স্থানীয়রা জানায়, প্রায় ২০ বছর আগে এ পথ দিয়ে ধলেশ্বরী নদী প্রবাহিত হতো। সময়ের সাথে নদী তার গতিপথ পরিবর্তন করে পূর্বদিকে সরে গেছে। পরে এখানে সরু খালের মতো একটি শাখা নদী রয়ে যায়। নদীর পাশে জেগে ওঠা চরে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে বসতি। কিন্তু একটি সেতুর অভাবে এসব এলাকার মানুষের যাতায়াত এখনো অনিশ্চয়তা আর ঝুঁকির ওপরই রয়ে গেছে।

মোকনা ইউনিয়নের লাড়ুগ্রাম এলাকায় নির্মিত সাঁকোটি বর্তমানে স্থানীয়দের প্রধান চলাচলের উপায়। পংবাইজোড়া, লাড়ুগ্রাম, দেইল্লা, স্বল্প লাড়ুগ্রাম, চৌহালীপাড়া, পংবড়টিয়া ও ঘুণিসহ আশপাশের অন্তত নয় গ্রামের হাজারো মানুষ প্রতিদিন এই পথটিই ব্যবহার করেন। স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, কৃষক ও সাধারণ পথচারীদের জন্য এটি হয়ে উঠেছে একমাত্র যোগাযোগ মাধ্যম।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্ষা মৌসুম এলেই দুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। প্রবল স্রোতে অস্থায়ী সাঁকোর কাঠ ও বাঁশ ভেঙে কিংবা ভেসে যায়। তখন নৌকা কিংবা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করতে হয়। এতে জরুরি রোগী, প্রসূতি নারী এবং শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হন।

৭১ নম্বর লাড়ুগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো: আব্দুল বাতেন মিয়া বলেন, সামান্য বৃষ্টি হলেই শিক্ষার্থীদের কাদা ও পানি পেরিয়ে স্কুলে আসতে হয়। বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে ওঠে। তখন শিক্ষার্থীরা ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকো কিংবা নৌকায় চলাচল করে। অনেক সময় দুর্ঘটনাও ঘটে।

স্থানীয় ইউপি সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা রিয়াজ উদ্দিন খান রাজা বলেন, পাঁচ বছর আগে এলাকাবাসী মিলে অস্থায়ীভাবে সাঁকোটি নির্মাণ করেছিল। এরপর থেকে এই বাঁশের সাঁকোতে ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে। নির্বাচনের সময় অনেক প্রতিশ্রুতি মিললেও বাস্তবে দৃশ্যমান কোনো কাজ হয়নি। তবে ৮০ মিটার দৈর্ঘ্যরে একটি সেতু ও সড়ক উন্নয়নের জন্য বর্তমান সংসদ সদস্য রবিউল আউয়াল লাভলু ডিও লেটার দিয়েছেন বলে তিনি জানান।

চানপাড়া এলাকার বাসিন্দা মো: শাহজাহান মিয়া বলেন, একটি সেতুর অভাবে আমরা দীর্ঘদিন ধরে জীবনের সাথে যুদ্ধ করছি। গুরুতর রোগী বা প্রসূতিকে দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া সম্ভব হয় না। ভারী বৃষ্টি হলেই পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়।

এলাকাবাসীর ভাষ্য, সাঁকোটির দুই পাশে রয়েছে শত শত বিঘা আবাদি জমি। কৃষিপণ্য পরিবহনেও চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। দীর্ঘদিনের অবহেলা ও উন্নয়নবঞ্চনার কারণে বাধ্য হয়ে স্থানীয়রাই চাঁদা তুলে সাঁকোটি নির্মাণ করেছিল। কিন্তু দুই দশকের অপেক্ষার পরও স্থায়ী সেতু নির্মিত হয়নি এখানে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এলজিইডির কার্যকর উদ্যোগের অভাবে সেতু নির্মাণের কাজ বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে। আশ্বাস মিললেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে।

নাগরপুর উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী ইফতেখার সারোয়ার ধ্রুব বলেন, পংবাইজোড়া-দেইল্লা সড়কে সেতু নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট দফতরে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে পরবর্তী কার্যক্রম শুরু হবে।

মোকনা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো: শরিফুল ইসলাম বলেন, সেতু নির্মাণের দাবিতে একাধিক প্রস্তাবনা ও চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। এখন শুধু অনুমোদনের অপেক্ষা। এলাকাবাসীর দাবি, জরুরি ভিত্তিতে একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ করে দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান ঘটানো হোক।