নিজস্ব প্রতিবেদক
শ্রাবণের আকাশ সেদিন গুমোট হয়েছিল, ঠিক যেমনটা ছিল আরিশা আফরোজের বুকের ভেতরটা। চার দিকে বারুদের গন্ধ আর গগনবিদারী চিৎকারের মধ্যে এক মা পথ চেয়ে বসে ছিলেন তার কিশোর সন্তানের জন্য। কিন্তু সেই প্রতীক্ষার অবসান হলো এক ভয়াবহ স্থিরচিত্রে; মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা ব্যান্ডেজ জড়ানো নিথর এক মুখ। যে কানে মা আদর করে ফিসফিসিয়ে ডাকতেন, সেই কানের এক পাশ দিয়ে ঢুকে যাওয়া ঘাতকের বুলেট অন্য পাশ দিয়ে বের করে নিয়ে গেছে তার কিশোর সন্তানের প্রাণ।
গতকাল বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাঁড়িয়ে নিজের কলিজা ছেঁড়া আর্তনাদ তুলে ধরেন শহীদ আশিকুল ইসলামের মা আরিশা আফরোজ। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সেই রক্তঝরা দিনগুলোতে রাজধানীর রামপুরায় ২৮ জনকে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত বিজিবি কর্মকর্তা ও পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দেয়া জবানবন্দীতে ফুটে ওঠে এক পৈশাচিক অধ্যায়।
বনশ্রীর নিবরাস মাদরাসার নবম শ্রেণীর ছাত্র ১৪ বছরের কিশোর আশিকুল। মা আরিশা আফরোজ পেশায় একজন টেইলর। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই জুমার নামাজ শেষে মা-ছেলে একসাথে খেয়েছিলেন। জবানবন্দীতে আরিশা বলেন, ‘আন্দোলনকারীদের আওয়াজ শুনে আমার ছেলে মিছিলে যোগ দিতে যায়। আমি দেখছিলাম ও অ্যাভিনিউ রোডে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ করেই শুরু হলো গোলাগুলি। দেখলাম মানুষকে পাখির মতো মারা হচ্ছে। কেউ হাতে, কেউ পায়ে, কেউ মাথায় গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়ছে। রাস্তাজুড়ে অনেক লাশ পড়ে থাকতে দেখি।’
রাত ১০টা পর্যন্ত ছেলে বাড়ি না ফেরায় ব্যাকুল মা বনশ্রীর একটি হাউজিংয়ের গ্যারেজে পায়চারী করছিলেন। এমন সময় অচেনা এক যুবক মোবাইল ফোনে একটি ছবি দেখিয়ে জানতে চান- এটাই তার ছেলে কি না। জবানবন্দীতে আরিশা বলেন, ‘ছবিতে দেখলাম ওর মাথায় ব্যান্ডেজ, চোখ দুটো বন্ধ। ওই ছবি দেখা মাত্রই আমি অজ্ঞান হয়ে যাই।’
রাত ১২টার দিকে অ্যাডভান্স হাসপাতালে গিয়ে তিনি খুঁজে পান আদরের সন্তানকে। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। আরিশা ট্রাইব্যুনালকে জানান, তার ছেলের ডান কানের ভেতর দিয়ে গুলি ঢুকে বাম কান দিয়ে বের হয়ে গেছে। রাতেই সেই নিথর দেহ নিয়ে তারা রওনা হন দিনাজপুরের বিরামপুর থানার নিজ গ্রামের উদ্দেশে। ২০ জুলাই সেখানেই তাকে দাফন করা হয়।
বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল-১-এ এই জবানবন্দী রেকর্ড করা হয়। আরিশা আফরোজ তার সাক্ষ্যে সরাসরি অভিযোগ করেন যে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে এবং আসাদুজ্জামান খান কামাল ও ওবায়দুল কাদেরের মদদে এই নৃশংসতা চালানো হয়েছে। তিনি এই হত্যাকাণ্ডের জন্য কর্নেল রেদোয়ান, মেজর রাফাত, এডিসি রাশেদ এবং ওসি মশিউরকে দায়ী করে ন্যায়বিচারের দাবি জানান।
রাজধানীর রামপুরায় গণহত্যামূলক গুলি বর্ষণের ঘটনায় বিজিবি কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদোয়ানুল ইসলাম, মেজর মো: রাফাত বিন আলম, ডিবির সাবেক এডিসি মো: রাশেদুল ইসলাম এবং রামপুরা থানার সাবেক ওসি মো: মশিউর রহমানসহ চারজনের বিরুদ্ধে এই মামলাটি চলমান। আরিশা আফরোজ ছিলেন এই মামলার পঞ্চম সাক্ষী। তিন সদস্যের এ ট্রাইব্যুনালের অপর দুই বিচারক হলেন- মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী ও মো: শাহিনুর ইসলাম।
জবানবন্দী শেষে ট্রাইব্যুনাল কক্ষ থেকে বের হওয়ার সময়ও আরিশার চোখে ছিল পানি, আর কণ্ঠে ছিল একটাই চাওয়া ‘আমি আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই।’
এ দিন এই মামলার জেরা সম্পন্ন হয়েছে। মামলার পরবর্তী সাক্ষী নেয়া হবে ১৯ মে।



