স্বাস্থ্যে সুজন বড়–য়ার একসাথে দুই চাকরির তদন্ত ঝুলে আছে রিটে

রিটের জবাব না দিয়ে আদালত অবমাননা করছেন ডিজি! মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ মানছে না অধিদফতর

Printed Edition

আরফাত বিপ্লব চট্টগ্রাম ব্যুরো

বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ থেকে দশম গ্রেডে জেলা স্যানিটারি ইন্সপেক্টর হিসেবে পদোন্নতি নিয়েছেন কক্সবাজারের উখিয়ার হলদিয়া পালং ইউনিয়নের বাসিন্দা সুজন বড়ুয়া। এরপর নারী কেলেঙ্কারিতে বরখাস্ত অবস্থায় আরো এক পদোন্নতি নিয়ে হয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা স্বাস্থ্য তত্ত্বাবধায়ক। বিষয়টি জানার পর সুজন বড়ুয়ার অবৈধ পদোন্নতি বাতিল এবং ভোগকৃত সব অর্থ ফেরত নিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমার জন্য ২০২৫ এর ৩১ আগস্ট চট্টগ্রামের সিভিল সার্জনকে পত্র পাঠায় বান্দরবান জেলা অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফিন্যান্স অফিসারের দফতর। এই চিঠি পাওয়ার পর প্রায় এক বছর অতিবাহিত হতে চললেও কোনো ব্যবস্থা নেননি চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা: জাহাঙ্গীর আলম। উল্টো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ও স্বাস্থ্যের মহাপরিচালকসহ ১৯ জনকে হাইকোর্ট দেখানো সুজন বড়ুয়াকে বুকে আগলে নিয়ে বন্ধ থাকা বেতন-ভাতা ছাড়ের ব্যবস্থা করে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে সিভিল সার্জনের বিরুদ্ধে।

এদিকে তিন পিতা, দুই মাতা, দুই ঠিকানা, দুই জাতীয়তা, দুই জন্মনিবন্ধন ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বাসিন্দা তথা বোমাং চিফ সার্কেলের জালসনদে কক্সবাজারের উখিয়া ও বান্দরবানের নাই্যংছড়ির পৃথক ঠিকানায় স্বাস্থ্য বিভাগে দুই চাকরি নেয়ার ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন স্বাস্থ্যের চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক। সেসময় এ নিয়ে নয়া দিগন্তে সংবাদ প্রকাশিত হলে চট্টগ্রাম স্বাস্থ্যবিভাগে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ২০২৩ এর ১৪ মে গঠনকৃত তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা: আবদুল মান্নানকে। তবে এই কমিটি তদন্ত কাজ শুরু করার পরপরই স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য ১৫ দিনের ছুটি নিয়ে নেন সুজন।

এর মধ্যে স্বাস্থ্য সচিব, স্বাস্থ্যের ডিজি, স্বাস্থ্যের চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান ও রাঙামাটি সিভিল সার্জন এবং তদন্ত কমিটিসহ ১৯ জনকে বিবাদি করে রিট করেন সুজন বড়ুয়া। হাইকোর্ট ছয় মাসের জন্য তদন্ত কার্যক্রম বন্ধের আদেশ প্রদানসহ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে এর জবাব দেয়ার আদেশ প্রদান করেন। এর পরিপ্রেেিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় রিটের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল, রিটের জবাব, নিয়মিত রিটের অবস্থা সম্পর্কে জানাতে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মাধ্যমে উপপরিচালক আইনকে নির্দেশনা প্রদান করেন। এরপর প্রায় তিন বছর হয়ে গেলেও স্বাস্থ্য অধিদফতরের আইন শাখার উপপরিচালক পরিমল কুমার পাল এই বিষয় কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। ফলে ঝুলন্ত রিটের আড়ালে পৃথক জেলায় নেয়া দুই চাকরিতে বহাল তবিয়তে থেকে রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাৎ করে চলেছেন সুজন বড়ুয়া।

যা বলছেন আইনজীবী : উচ্চ আদালতের আদেশ না মেনে নীরব থাকা বা রিট ধামাচাপা দেয়ার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান বলেন, হাইকোর্টের আদেশ বাস্তবায়ন না করে দায়িত্বশীল পদে থেকে এভাবে নীরব থাকা গুরুতর আদালত অবমাননার শামিল। তিনি বলেন, নির্দিষ্ট সময় পার হওয়ার পরও আদেশ অমান্য করা হলে, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে সুনির্দিষ্টভাবে আদালত অবমাননার মামলা হবে। বিষয়টি অতিদ্রুত উচ্চ আদালতের দৃষ্টিতে আনা জরুরি।

পিবিআইর প্রতিবেদনে দুই চাকরির চিত্র : সুজনের দায়েরকৃত মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা ও পিবিআই প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, ২০২৪-এর ৬ নভেম্বর চট্টগ্রাম জেলার সাবেক স্বাস্থ্য তত্ত্বাবধায়ক সুজন বড়ুয়া মানহানির অভিযোগ এনে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক জামালুদ্দিন হাওলাদারসহ দু’জনের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট-১ এর আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। আদালত মামলাটি পিবিআইকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। মামলাটি তদন্ত করেন পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রো অঞ্চলের এসআই শরীফ উদ্দিন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সুজন বড়ুয়ার কক্সবাজার সিভিল সার্জন কার্যালয়ে স্বাস্থ্য সহকারী পদে যোগদানকালীন জমা দেয়া কাগজপত্র সংগ্রহ করে পর্যালোচনা করা হয়।

উখিয়ায় প্রথম চাকরি : ২০০৪ সালে স্বাস্থ্য সহকারী পদে উখিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগদান করেন। এই পদে তিনি আট বছর চাকরি করেন। আদালতে দেয়া প্রতিবেদনে বলা হয়, সুজন বড়ুয়ার জন্মনিবন্ধন নম্বর অনুযায়ী তার জন্মস্থান মরিচ্যা পালং, পিতার নাম- বিমল চন্দ্র বড়ুয়া, মাতা- প্রীতি রানী বড়ুয়া, স্থায়ী ঠিকানা-মরিচ্যা পালং, হলদিয়া পালং ইউনিয়ন, থানা-উখিয়া, জেলা-কক্সবাজার।

রাঙ্গামাটির রাজস্থলীতে দ্বিতীয় চাকরি : একইভাবে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে স্যানিটারি ইন্সপেক্টর পদে যোগদানকালীন কাগজপত্রাদি সংগ্রহ করে পর্যালোচনা করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা।

এখানে সুজনের জমাদানকৃত দলিলপত্রে জন্মনিবন্ধন অনুযায়ী তার জন্মস্থান উত্তর ঘুমধুম, বড়ুয়া পাড়া, ঘুমধুম, নাই্যংছড়ি, বান্দরবান। পিতার নাম-বিমল চন্দ্র বড়ুয়া, মাতার নাম-প্রিতি রাণী বড়ুয়া, স্থায়ী ঠিকানা- উত্তর ঘুমধুম, বড়ুয়া পাড়া, ঘুমধুম, নাই্যংছড়ি, বান্দরবান। ইস্যুকারী দীপক বড়ুয়া, চেয়ারম্যান, ৩ নম্বর ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদ, নাই্যংছড়ি, বান্দরবান।

যখন জালজালিয়াতি শুরু : আট বছর চাকরি করার পর হঠাৎ ২০১২ সালের এপ্রিলে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলায় স্যানিটারি ইন্সপেক্টর হিসেবে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিলে সুজন বড়ুয়া রাঙ্গামাটি জেলার স্থায়ী নাগরিকত্ব ও আইডি সৃষ্টি করে আরো একটি সরকারি চাকরি বাগিয়ে নেন। রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলায় স্যানিটারি ইন্সপেক্টর পদে চাকরি গ্রহণের সময় কক্সবাজার জেলায় নেয়া চাকরি ও প্রদত্ত ঠিকানা গোপন করা হয়। সুজন বড়ুয়া রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার রাজস্থলী উপজেলায় যোগদান করেন। এ নিয়োগের ৮ নম্বর শর্তে উল্লেখ ছিল যে, উক্ত পদে যোগদানের আগে সরকারি চাকরি থেকে অব্যাহতিপত্র গ্রহণ করতে হবে।

পিবিআইর মতামত : আদালতে দেয়া পিবিআইর মতামতে বলা হয়েছে, সুজন বড়ুয়া নিজেকে কক্সবাজার জেলার উখিয়া থানার হলদিয়া পালং ইউনিয়নের মরিচ্যা পলিং এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা দেখিয়ে স্বাস্থ্য সহকারী পদে যোগদান করে ৮ বছর চাকরি করে। এরপর নতুনভাবে সৃজিত বান্দরবান জেলার নাই্যংছড়ি উপজেলার উত্তর ঘুমধুম এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা ও জন্মস্থান সংবলিত জন্ম সনদ, জাতীয়তা সনদ, বোমাং চিফ সার্কেলের জাল সনদ সৃজন করেন। আর এসব ব্যবহার করে স্যানিটারি ইন্সপেক্টর পদে আবেদন করেন এবং এই চাকরিতে যোগদান করেন তিনি। তদন্তকালে তার দু’টি চাকরিতে যোগদানকালে ভিন্ন ভিন্ন দু’টি জন্ম সনদ, জাতীয়তা সনদ উপস্থাপনের সত্যতা পাওয়া গেছে।

এখতিয়ার বর্হিভূত পদোন্নতি : গত বছরের ৩১ আগস্ট বান্দরবান জেলার অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফিন্যান্স অফিসার মোহাম্মদ এমরান বাহাদুর চট্টগ্রামের সিভিল সার্জনকে একটি পত্র পাঠান। ওই পত্রে বলা হয়- বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন ১৯৮৯ এর ৩২ নং ধারা মোতাবেক কেবল তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণী তথা (১১-২০তম গ্রেড) পদে কর্মচারী নিয়োগ ও পদায়ন করতে পারবে। তবে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের পদোন্নতির সুপারিশের আলোকে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় বন্দরবান হতে জেলা স্যানিটারি ইন্সপেক্টর (১০তম গ্রেড) পদে সুজন বড়ুয়াকে স্যানিটারি ইন্সপেক্টর (১১তম গ্রেড) হতে দেয়া পদোন্নতি এখতিয়ার বর্হিভূত ও সম্পূর্ণ অবৈধ। বান্দরবান সিভিল সার্জনের কার্যালয়ের জারিকৃত পদোন্নতির আদেশ যথাযথ কর্তৃপ কর্তৃক হয়নি বিধায় সুজন বড়ুয়ার পদোন্নতির আদেশ বাতিল পূর্বক অতিরিক্ত ভোগকৃত বেতন-ভাতাদি সরকারি কোষাগারে জমার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চট্টগ্রাম সিভিল সার্জনকে পত্র দেন বান্দরবান জেলার অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফিন্যান্স অফিসার মোহাম্মদ এমরান বাহাদুর।