বিশেষ সংবাদদাতা
বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়লেও এখনো তা উগান্ডা-ঘানার মতো দেশের পেছনে পড়ে রয়েছে। আঙ্কটাডের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগ এসেছে ১৮০ কোটি মার্কিন ডলার। এর আগের বছর অর্থাৎ, ২০২৪ সালে যার পরিমাণ ছিল ১২৩ কোটি মার্কিন ডলার। শতকরা হিসাবে এক বছরের বিদেশী বিনিয়োগ বেড়েছে ৪৮ শতাংশ।
তবে এর বিপরীতে ২০২৫ সময়ে উগান্ডা ৩৪০ কোটি ডলার এবং ঘানা ও ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো (ডিআর কঙ্গো) প্রত্যেকে ১৯০ কোটি ডলার করে বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং ৫০০ কোটি ডলারের বেশি জিডিপি থাকা সত্ত্বেও সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণে উগান্ডা ও ঘানার মতো আফ্রিকার ছোট অর্থনীতির দেশগুলোর তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফ্রিকার এই তিন দেশ জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদ-সংক্রান্ত বড় বড় প্রকল্পে বিনিয়োগ পেয়ে লাভবান হলেও বাংলাদেশ তার ম্যানুফ্যাকচারিং ও সেবা খাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিনিয়োগ টানতে হিমশিম খাচ্ছে। আঙ্কটাড প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশের মোট স্থাবর মূলধন গঠনের (জিএফসিএফ) মাত্র ১.৪ শতাংশ আসছে বিদেশী বিনিয়োগ থেকে। এর অর্থ হলো- দেশের বিনিয়োগের বিশাল অংশ এখনো অভ্যন্তরীণ উৎসের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে, নতুন বা ‘স্ক্র্যাচ থেকে’ শুরু হওয়া গ্রিনফিল্ড প্রকল্পের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। ২০২৪ সালে যেখানে গ্রিনফিল্ড প্রকল্পের মূল্য ছিল ১৭৩ কোটি ডলার, ২০২৫ সালে তা ২২.৯ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১৩৩ কোটি ডলারে। এটি নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ না থাকা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এদিকে, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলনে একের পর এক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ), শত শত কোটি ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগের ঘোষণা এবং বিদেশী উদ্যোক্তাদের আগ্রহের কথা বলা হয়। প্রতিবারই বিভিন্ন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, বাংলাদেশ এখন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ গন্তব্য। কিন্তু ঘোষণার পর বাস্তবে কতটুকু বিনিয়োগ দেশে আসে? অনুসন্ধানে দেখা যায়, ঘোষিত বিনিয়োগের বড় একটি অংশ বাস্তব প্রকল্পে রূপ নেয় না। আর যেগুলো বাস্তবায়নের পথে এগোয়, সেগুলোর অনেকগুলোই দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, জমি, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও নীতিগত জটিলতায় আটকে পড়ে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ড্রাটির (বিসিসিসিআই) সভাপতি খোরশেদ আলম এক সংলাপে বলেছেন, ‘আমরা দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে চাইছি; কিন্তু বাস্তব চিত্র অত্যন্ত হতাশাজনক। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় একটি বড় চীনা কোম্পানি ছয় বছর আগে জমির বরাদ্দ পেলেও আজ পর্যন্ত তাদের গ্যাস সংযোগ দেয়া হয়নি। এভাবে চলতে থাকলে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা এ দেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে।’
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিদেশী প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিএ) নতুন শিল্প স্থাপন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। অথচ প্রতিবেশী ভিয়েতনাম, ভারত কিংবা ইন্দোনেশিয়ার তুলনায় বাংলাদেশ এখনো অনেক কম বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হচ্ছে। বহু বছর ধরেই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশের সম্ভাবনার পাশাপাশি একই ধরনের কাঠামোগত দুর্বলতার কথাও তুলে ধরছে।
কেন বিনিয়োগ কম?
১. গ্যাস ও বিদ্যুৎ সঙ্কট
বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘদিন ধরে শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ না পাওয়াকে অন্যতম বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করছেন।
২. প্রশাসনিক জটিলতা
একটি কারখানা চালু করতে অনেকগুলো সংস্থার অনুমোদন লাগে। ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ চালু হলেও বাস্তবে অনেক সেবা এখনো সম্পূর্ণ ডিজিটাল বা সমন্বিত নয়।
৩. বৈদেশিক মুদ্রার সঙ্কট
২০২২-২৪ সময়ে ডলার সঙ্কটের কারণে কাঁচামাল আমদানি, মুনাফা দেশে পাঠানো এবং এলসি খোলার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয়, যা বিদেশী বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়ায়।
৪. নীতিগত অনিশ্চয়তা
করনীতি, শুল্ক, আমদানি-নীতি ও ব্যবসায়-সংক্রান্ত বিধি-বিধানের ঘন ঘন পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।
তবে শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে জ্বালানি নিরাপত্তা ও দীর্ঘসূত্রতা। একটি শিল্প স্থাপনের জন্য নিবন্ধন, পরিবেশগত ছাড়পত্র, কর নিবন্ধন, ইউটিলিটি সংযোগ, আমদানি অনুমতি- সব মিলিয়ে একাধিক সরকারি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন নিতে হয়। ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ চালুর উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবে অনেক সেবা এখনো পুরোপুরি সমন্বিত নয়। আন্তর্জাতিক মূল্যায়নেও বাংলাদেশে ব্যবসায় পরিচালনার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক জটিলতা, অনুমোদনে বিলম্ব এবং একাধিক সংস্থার ওপর নির্ভরতার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
শুধু প্রশাসনিক জটিলতাই নয়, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের কারণ। শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সংযোগের অনিশ্চয়তা, বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা, বন্দরে পণ্য খালাসে বিলম্ব এবং অভ্যন্তরীণ পরিবহন ব্যয় উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয়। বিদেশী বিনিয়োগকারীদের সংগঠনগুলোর সাম্প্রতিক মূল্যায়নেও অনুমোদনে দীর্ঘ সময়, বন্দর বিলম্ব, গ্যাস সঙ্কট এবং আর্থিক খাতের দুর্বলতাকে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) অবশ্য বলছে, পরিস্থিতির উন্নয়নে ধারাবাহিকভাবে সংস্কার কার্যক্রম চলছে। ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ, বিনিয়োগকারীদের জন্য সমন্বিত সেবা, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা এবং আন্তর্জাতিক প্রচারণার মাধ্যমে বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ানোর চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে শুধু প্রচারণা নয়, বাস্তবায়নের সক্ষমতাই এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। তারা বলছেন, বাংলাদেশে শ্রমশক্তি, ভৌগোলিক অবস্থান এবং বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বাজার বড় সুবিধা হলেও দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি, বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা, চুক্তি বাস্তবায়নে বিলম্ব এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতার অভাব বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়ে দেয়।



