জলবায়ু ঝুঁকির মুখে বাংলাদেশ অর্থায়ন বাড়ানোর দাবি

এসবি-৬৪ সম্মেলন

Printed Edition

শাহ আলম নূর জার্মানির বন থেকে

জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সাথে ঝুঁকির মুখে পড়ছে বাংলাদেশ। এই ঝুঁকি মোকাবেলায় অর্থায়ন বাড়ানোর দাবি জোরালো হচ্ছে। জার্মানির বন শহরে অনুষ্ঠিত জাতিসঙ্ঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মধ্যবর্তী বৈশ্বিক আলোচনা (এসবি-৬৪)-এ জলবায়ু অভিযোজন অর্থায়ন বৃদ্ধি, জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে ন্যায়সঙ্গত উত্তরণ, স্বাস্থ্য খাতের সুরক্ষা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রতিশ্রুত সহায়তা বাস্তবায়নের বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। আগামী নভেম্বরে তুরস্কের আনতালিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য কপ-৩১ সম্মেলনের আগে এ বৈঠককে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা।

৮ জুন শুরু হওয়া সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারি প্রতিনিধি, জলবায়ু বিশেষজ্ঞ, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশও এ আলোচনার ফলাফলের দিকে গভীরভাবে নজর রাখছে।

জাতিসঙ্ঘ জলবায়ু পরিবর্তন কাঠামো কনভেনশনের (ইউএনএফসিসিসি) নির্বাহী সচিব সাইমন স্টিল উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য জলবায়ু অর্থায়ন প্রাপ্তির প্রক্রিয়া সহজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বলেছেন, অভিযোজনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর কাছে পৌঁছাতে হবে এবং প্রতিশ্রুত সহায়তা বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরো কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।

সম্মেলনে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য ও জলবায়ু সংগঠনগুলোর জোট গ্লোবাল ক্লাইমেট অ্যান্ড হেলথ অ্যালায়েন্স (জিসিএইচএ) অভিযোজন তহবিল তিনগুণ বাড়িয়ে ২০৩৫ সালের মধ্যে ১২০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বর্তমান অর্থায়ন জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তব ক্ষতি মোকাবেলার জন্য পর্যাপ্ত নয়। ফলে স্বাস্থ্যব্যবস্থা, খাদ্যনিরাপত্তা, নিরাপদ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন এবং দুর্যোগ মোকাবেলা সক্ষমতা ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের জন্য এ দাবি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নিরাপদ পানির সঙ্কট, ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগের বিস্তার, তাপপ্রবাহ এবং ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার মতো দুর্যোগের ঝুঁকি ক্রমাগত বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় স্বাস্থ্য খাতে অতিরিক্ত বিনিয়োগের প্রয়োজন হলেও অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা বড় বাধা হয়ে রয়েছে।

বাংলাদেশের অংশগ্রহণমূলক গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্রের (সিপিআরডি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো: শামসুদ্দোহা নয়া দিগন্তকে বলেন, আগামী এক দশকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অভিযোজন সক্ষমতা বাড়াতে সরকারি ও অনুদানভিত্তিক অর্থায়ন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করতে হবে। অন্যথায় জীবনরক্ষাকারী খাতগুলো প্রয়োজনীয় সহায়তা থেকে বঞ্চিত হবে।

তিনি বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখতে নতুন জীবাশ্ম জ্বালানি অনুসন্ধানের সুযোগ নেই। এর পরিবর্তে পরিচ্ছন্ন ও সাশ্রয়ী জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে, বিশেষ করে হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং বিদ্যুৎ সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় বাংলাদেশের অতিরিক্ত কয়েক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে। উপকূলীয় অঞ্চল, কৃষি, পানিসম্পদ, নগর অবকাঠামো এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে সুরক্ষিত রাখতে প্রতি বছর বিপুল অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে।

এদিকে সম্মেলনে অভিযোজনবিষয়ক বৈশ্বিক লক্ষ্য (গ্লোবাল গোল অন অ্যাডাপটেশন) বাস্তবায়ন এবং অভিযোজন অগ্রগতি পরিমাপের সূচক চূড়ান্ত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। পরিবেশবিদদের মতে, অভিযোজন সাফল্য মূল্যায়নের আন্তর্জাতিক কাঠামো তৈরি হলে বাংলাদেশসহ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর প্রকৃত প্রয়োজন ও অগ্রগতি আরো স্পষ্টভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে।

অন্য দিকে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে ধীরে ধীরে সরে আসার বিষয়টি বন সম্মেলনের অন্যতম প্রধান আলোচ্য হিসেবে উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও জ্বালানি সরবরাহ সঙ্কট নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়ার প্রয়োজনীয়তা আরো স্পষ্ট করেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জার্মানির বন সম্মেলন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ গ্যাস, কয়লা, তেল ও আমদানিনির্ভর এলএনজির ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। তারা মনে করেন, সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তি এবং জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করতে পারে।

সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের (সিডিপি) নির্বাহী পরিচালক মো: জাহাঙ্গীর হোসেন মাসুম নয়া দিগন্তকে বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়া অবশ্যই ন্যায়সঙ্গত হতে হবে। উন্নত দেশগুলো দীর্ঘদিন জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করে শিল্পায়নের সুবিধা নিয়েছে। তাই উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, স্বল্পসুদে অর্থায়ন এবং সক্ষমতা উন্নয়ন নিশ্চিত না করে উত্তরণের চাপ সৃষ্টি করা হলে বৈশ্বিক বৈষম্য আরো বাড়বে।

তিনি বলেন, সম্মেলনে জলবায়ু অর্থায়ন নিয়েও ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। বর্তমানে অভিযোজন অর্থায়নের মাত্র ১৫ শতাংশ অনুদান হিসেবে দেয়া হয়, বাকি অংশ ঋণ আকারে প্রদান করা হচ্ছে। ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলো নতুন ঋণের বোঝায় জর্জরিত হচ্ছে।

তিনি বলেন, এ বাস্তবতা দেশের জন্যও উদ্বেগজনক। জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো, উপকূল রক্ষা বাঁধ, নদী ব্যবস্থাপনা, কৃষি অভিযোজন ও স্বাস্থ্য খাতের প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থের বড় অংশ যদি ঋণ হিসেবে গ্রহণ করতে হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক চাপ আরো বৃদ্ধি পাবে। তাই বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে অনুদানভিত্তিক জলবায়ু অর্থায়নের দাবি জানিয়ে আসছে।

সম্মেলনে জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতি ও ক্ষতিপূরণ তহবিল (লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড) নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। স্বাস্থ্য ও জলবায়ু সংগঠনগুলো বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বাস্থ্যক্ষতি ও প্রাণহানির প্রকৃত হিসাব এখনো যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে না। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো প্রয়োজনীয় সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের মোট গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান ১ শতাংশের কম হলেও ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে দেশটি সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি। তাই বন সম্মেলনে অভিযোজন অর্থায়ন বৃদ্ধি, ক্ষয়ক্ষতি তহবিল কার্যকর করা, স্বাস্থ্য খাতের জন্য বিশেষ সহায়তা নিশ্চিত করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ন্যায়সঙ্গত রূপান্তরের বিষয়ে যে সিদ্ধান্তগুলো নেয়া হবে, তার সরাসরি প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত বছরের কপ-৩০ সম্মেলনে দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন প্রতিশ্রুতির চেয়ে বিদ্যমান অঙ্গীকার বাস্তবায়ন, অভিযোজন অর্থায়ন সহজলভ্য করা, ক্ষয়ক্ষতি তহবিল কার্যকর করা এবং প্রযুক্তি ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করাই বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর প্রধান প্রত্যাশা। অন্যথায় জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান অভিঘাতে দেশের উন্নয়ন অর্জনগুলো নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।