মো: আজিজুল হক গাজীপুর মহানগর
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে (ব্রি) সরকারি প্রজ্ঞাপনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অস্থিরতা, প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব ও গবেষণা কার্যক্রমে স্থবিরতার ঘটনায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সরকারি সিদ্ধান্ত প্রতিহত করতে কক্ষে কক্ষে তালা ঝুলানো, বিক্ষোভ, অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি এবং প্রশাসনিক কাজে বাধা দেয়ার অভিযোগ ওঠার পরও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো তাদের নিয়েই কৃষি মন্ত্রণালয়ে বৈঠক করায় বিস্ময় ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানী ও কর্মকর্তারা।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের ৩ মে ২০২৬ তারিখের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ব্রির জ্যেষ্ঠতম মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আমিনুল ইসলামকে মহাপরিচালকের (রুটিন দায়িত্ব) দায়িত্ব দেয়া হয়। পরদিন ৪ মে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করতে ব্রি ক্যাম্পাসে গেলে একদল বিক্ষোভকারী প্রধান ফটক ও বিভিন্ন দফতরের সামনে অবস্থান নেন। এ সময় কক্ষে কক্ষে তালা ঝুলিয়ে প্রশাসনিক ও গবেষণা কার্যক্রম ব্যাহত করার অভিযোগ ওঠে।
ব্রির একাধিক সূত্রের দাবি, বিজ্ঞানী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ড. হাবিবুর রহমান মুকুলের নেতৃত্বে কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিক ওই কর্মসূচিতে অংশ নেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও আনসার সদস্যদের হস্তক্ষেপ করতে হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, দায়িত্বপ্রাপ্ত মহাপরিচালকের প্রবেশ ঠেকাতে গিয়ে পুলিশের সাথে ধস্তাধস্তির ঘটনাও ঘটে।
একাধিক বিজ্ঞানী অভিযোগ করেন, দায়িত্ব গ্রহণের দিন গবেষণা বিভাগ, ল্যাবরেটরি ও কর্মকর্তাদের কক্ষে তালা ঝুলিয়ে স্বাভাবিক গবেষণা পরিবেশ নষ্ট করা হয়। এমনকি সার্ভার রুম থেকে সিসিটিভি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগও উঠেছে, যাতে সেদিনের ঘটনাপ্রবাহের ভিডিও প্রমাণ সংরক্ষিত না থাকে। যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ড. মুকুল।
ব্রির সাধারণ বিজ্ঞানীদের অনেকেই নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গবেষণা প্রতিষ্ঠানে মতভেদ থাকতে পারে; কিন্তু সরকারি আদেশ অমান্য করে তালা ঝুলানো, প্রশাসনিক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে অফিসে ঢুকতে বাধা দেয়া- এসব কোনোভাবেই পেশাদার আচরণ নয়। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, গত ৩ ও ৪ মে সংঘটিত ঘটনাগুলোর তদন্তে কমিটি গঠনের একটি প্রস্তাব কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখায় প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে ঝুলে রয়েছে। এ নিয়ে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও উঠেছে বিভিন্ন মহলে। এদিকে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে কৃষি সচিবের উদ্যোগে গতকাল কৃষিবিদদের সাথে অনুষ্ঠিতব্য একটি সভা। সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, সরকারি প্রজ্ঞাপনের বিরোধিতা, অরাজকতা সৃষ্টি এবং প্রশাসনিক কাজে বাধা দেয়ার অভিযোগ ওঠার পরও কিভাবে বিতর্কিত আচরণের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ওই বৈঠকে অন্তর্ভুক্ত হলেন?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী বলেন, সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়ে প্রতিষ্ঠানে তালা ঝুলানোর মতো ঘটনায় যদি কোনো জবাবদিহি না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আরো বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী আচরণ বিধিমালা অনুযায়ী কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রভাব বিস্তার বা বাধা সৃষ্টি ‘অসদাচরণ’ হিসেবে গণ্য হতে পারে। সে বিবেচনায় ব্রিতে সংঘটিত ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে।
বিজ্ঞানীদের একটি বড় অংশের অভিযোগ, বর্তমানে ব্রি ও বারির মতো গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব সঙ্কট ও প্রশাসনিক দ্বন্দ্বের আড়ালে নিয়োগ, পদোন্নতি, টেন্ডার, প্রকল্প পরিচালনা এবং প্রভাব বিস্তার সংক্রান্ত পুরনো অভিযোগগুলো চাপা পড়ে যাচ্ছে। তাদের মতে, সরকারের উচিত কোনো পক্ষের চাপ বা বিভ্রান্তির শিকার না হয়ে জ্যেষ্ঠতা, পেশাদারিত্ব, গবেষণা অভিজ্ঞতা এবং প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ বিবেচনায় স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব নিশ্চিত করা।
কৃষি গবেষণা খাত সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকদের মতে, দেশের খাদ্য নিরাপত্তা যখন জলবায়ু পরিবর্তন, অতিবৃষ্টি, হাওর অঞ্চলের ফসলহানি এবং উৎপাদন ঝুঁকির মতো বাস্তব চ্যালেঞ্জের মুখে, তখন গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয় বলয়, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও প্রশাসনিক অচলাবস্থা দেশের কৃষি ব্যবস্থার জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।
তাদের ভাষ্য, গবেষণা প্রতিষ্ঠান কোনো রাজনৈতিক মঞ্চ নয়; এটি জ্ঞান, উদ্ভাবন ও জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার সাথে সম্পর্কিত একটি সংবেদনশীল ক্ষেত্র। এখানে পেশাদারিত্বের পরিবর্তে সংঘাত ও প্রভাব বিস্তারের সংস্কৃতি চলতে থাকলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো কৃষি গবেষণা ব্যবস্থাই।



