নয়া দিগন্তকে দেয়া সাক্ষাৎকারে চিফ প্রসিকিউটর

অর্থ লেনদেনের প্রমাণ না পেলেও অভিযোগের সত্যতা রয়েছে

প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদারের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন অপরিহার্য। আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রে দুর্নীতির অনেক প্রেক্ষাপট থাকতে পারে; কিন্তু দেশ গঠনে কাউকে না কাউকে শক্ত উদ্যোগ নিতেই হবে। এই ট্রাইব্যুনাল নিয়ে জনগণের অনেক প্রত্যাশা। তাই আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে থেকে কেউ দুর্নীতির চিন্তা করলে সেটি হবে তার জন্য আত্মঘাতী। যারা সৎভাবে কাজ করতে পারবেন না, তাদের এই প্রতিষ্ঠানে থাকার প্রয়োজন নেই। আমরা ইনশা আল্লাহ এই প্রতিষ্ঠানকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাখব।

আলমগীর কবির
Printed Edition
চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম
চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম |নয়া দিগন্ত

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদারের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগে এখন পর্যন্ত সরাসরি কোনো অর্থ লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম। তবে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা এবং সংশ্লিষ্টদের অডিও রেকর্ড কমিটির হাতে রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন তিনি। দৈনিক নয়া দিগন্তকে দেয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি ট্রাইব্যুনালের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে তার কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।

প্রশ্ন : প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তে যে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করা হয়েছে, তার বর্তমান অগ্রগতি কী?

আমিনুল ইসলাম : আমরা কমিটির কাজ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে চালিয়ে যাচ্ছি। নিয়মিত বিরতিতে আমাদের মিটিং হচ্ছে এবং আমরা ঘটনার গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করছি। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে আমাদের অনেক নথিপত্র দেখতে হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য রেকর্ড করতে হচ্ছে। আমরা খতিয়ে দেখছি যে, অভিযোগটির পেছনে প্রকৃত উদ্দেশ্য কী বা এর মধ্যে কতটা সত্যতা আছে। কাজগুলো আমাদের নিয়মিত দাফতরিক ব্যস্ততার মাঝেই করতে হচ্ছে, তাই কিছুটা সময় লাগছে। তবে আমরা এই মাসের মধ্যেই একটি পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট দেয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।

প্রশ্ন : অভিযুক্ত প্রসিকিউটর তো ইতোমধ্যে পদত্যাগ করেছেন। তার সাথে কি আপনাদের কমিটির কোনো কথা হয়েছে?

আমিনুল ইসলাম : হ্যাঁ, তার সাথে আমার ব্যক্তিগতভাবে কথা হয়েছে। তিনি পদত্যাগ করার সময় পরোক্ষভাবে অভিযোগের বিষয়টি স্বীকার করেছেন এবং দুঃখ প্রকাশ করেছেন। প্রকৃতপক্ষে সেই অভিযোগের কারণেই তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন।

প্রশ্ন : তদন্তে কি কোনো আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে?

আমিনুল ইসলাম : এখন পর্যন্ত আমরা সরাসরি কোনো অর্থ লেনদেনের প্রমাণ পাইনি, তবে তাদের মধ্যকার কথোপকথনের রেকর্ড আমাদের হাতে এসেছে। এই বিষয়ে অবগত অন্যান্য প্রসিকিউটরও ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। আমরা নিশ্চিত হয়েছি যে, ওই কথোপকথনে থাকা ব্যক্তিরা তারাই ছিলেন।

প্রশ্ন : আইনের দৃষ্টিতে শুধু কথোপকথন বা অর্থ দাবি করা কি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে?

আমিনুল ইসলাম : অবশ্যই। আইনে ঘুষ চাওয়া এবং দেয়া দুইটিই সমান অপরাধ। আমাদের কাছে থাকা কথোপকথন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখানে দুই পক্ষেরই অভিন্ন স্বার্থ কাজ করছিল। একজন সুবিধা দিতে চাইছেন, অন্যজন সুবিধা নিতে চাইছেন। এখানে অপরাধকে খণ্ডিত করে দেখার সুযোগ নেই যে, একজনকে দায়ী করব আর অন্যজনকে করব না। এই অফারটি প্রথম কে করল এবং কার উদ্দেশ্য কী ছিল, তা আমরা বিস্তারিত রিপোর্টে উল্লেখ করব।

প্রশ্ন : তদন্তের স্বার্থে আপনারা কি কাউকে তলব করছেন বা গোপনীয়তা রক্ষা করছেন?

আমিনুল ইসলাম : তদন্তের প্রয়োজনে আমরা অনেকের সাথেই যোগাযোগ করছি। কাউকে পাচ্ছি, কাউকে আবার পেতে সময় লাগছে। এমনকি বেশ কয়েকজনের সাথে আমরা অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে কথা বলছি। এই মুহূর্তে তদন্তের সব কৌশল প্রকাশ করা সম্ভব নয়, তবে রিপোর্ট জমা হলে আপনারা বিস্তারিত জানতে পারবেন।

প্রশ্ন : বর্তমান সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান এবং আপনার প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে কিছু বলুন।

আমিনুল ইসলাম : দেখুন, বর্তমান সরকার এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্টভাবেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেছেন। আমি ২০২৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে যোগদানের পর থেকেই অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছি। আমি আমার তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশন টিমের সবাইকে পরিষ্কার বার্তা দিয়েছি যে, কোনো অবস্থাতেই অনিয়ম প্রশ্রয় দেয়া হবে না।

প্রশ্ন : প্রতিষ্ঠানটিকে দুর্নীতিমুক্ত রাখতে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

আমিনুল ইসলাম : আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন অপরিহার্য। আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রে দুর্নীতির অনেক প্রেক্ষাপট থাকতে পারে; কিন্তু দেশ গঠনে কাউকে না কাউকে শক্ত উদ্যোগ নিতেই হবে। এই ট্রাইব্যুনাল নিয়ে জনগণের অনেক প্রত্যাশা। তাই আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে থেকে কেউ দুর্নীতির চিন্তা করলে সেটি হবে তার জন্য আত্মঘাতী। যারা সৎভাবে কাজ করতে পারবেন না, তাদের এই প্রতিষ্ঠানে থাকার প্রয়োজন নেই। আমরা ইনশা আল্লাহ এই প্রতিষ্ঠানকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাখব।