দ্রুত বিচার নাকি প্রক্রিয়াগত তাড়াহুড়ো?

শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার মামলায় মাত্র চার কার্যদিবসে নিম্ন আদালতের রায়কে অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে ‘মাইলফলক’ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে নিম্ন আদালতে দ্রুত বিচার সম্পন্ন হলেও উচ্চ আদালতে গিয়ে এর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি বিপুল মামলার জটের মুখে পড়বে কি না তা নিয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে গভীর বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা এই রায়কে স্বাগত জানালেও বিচার প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে ‘আইনি নিখুঁত আচরণ’ বজায় রাখা এবং উচ্চ আদালতের বিশাল ডেথ রেফারেন্স জটলা এড়িয়ে কিভাবে এর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

আলমগীর কবির
Printed Edition

রাজধানীর মিরপুরে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার মামলায় মাত্র চার কার্যদিবসে নিম্ন আদালতের রায়কে অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে ‘মাইলফলক’ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে নিম্ন আদালতে দ্রুত বিচার সম্পন্ন হলেও উচ্চ আদালতে গিয়ে এর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি বিপুল মামলার জটের মুখে পড়বে কি না তা নিয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে গভীর বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা এই রায়কে স্বাগত জানালেও বিচার প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে ‘আইনি নিখুঁত আচরণ’ বজায় রাখা এবং উচ্চ আদালতের বিশাল ডেথ রেফারেন্স জটলা এড়িয়ে কিভাবে এর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

নিম্ন আদালতে দ্রুত রায় এলেও উচ্চ আদালতে গিয়ে এই গতি থমকে যাওয়ার আশঙ্কার কথা জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মনির বলেন, ‘নজিরবিহীন অল্প সময়ে তদন্ত ও নিম্ন আদালতের বিচার শেষ হওয়া ইতিবাচক; কিন্তু আসল বাধা তৈরি হবে হাইকোর্টে। আইন অনুযায়ী, নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ড হলে তা হাইকোর্ট বিভাগ দ্বারা নিশ্চিত (ডেথ রেফারেন্স) হওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।’

অ্যাডভোকেট শিশির মনির সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান ও আইনি বাস্তবতা তুলে ধরে নয়া দিগন্তকে বলেন ‘বর্তমানে হাইকোর্টে ২০১৮ ও ২০১৯ সালের মৃত্যুদণ্ডাদেশের শত শত মামলা শুনানির অপেক্ষায় ঝুলে (পেন্ডিং) রয়েছে। অর্থাৎ, নিম্ন আদালতের রায়ের পর প্রায় সাত থেকে আট বছর ধরে আসামিরা কনডেম সেলে অপেক্ষা করছেন।’ এ ছাড়া এই বিষয়ে আইনি সমতার প্রশ্ন রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমানে প্রায় আড়াই থেকে তিন হাজার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দী উচ্চ আদালতের রায়ের অপেক্ষায় আছেন। এখন রামিসা বা অন্য কোনো আলোচিত মামলাকে যদি বিশেষ ব্যবস্থাপনায় বা রাজনৈতিক চাপে অগ্রাধিকার দিয়ে সাত দিনে পেপারবুক তৈরি করে শুনানি করা হয়, তবে ‘সিরিয়াল ব্রেক’ (ক্রমভঙ্গ) হবে। এর ফলে বছরের পর বছর ধরে আটকে থাকা অন্য আসামিরা সংবিধানে বর্ণিত ‘আইনের দৃষ্টিতে সমতা’র প্রশ্ন তুলবেন।

এই দীর্ঘমেয়াদি সঙ্কট থেকে উত্তরণে তিনি একটি সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়ে বলেন, ‘বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টে যে রেগুলার ক্রিমিনাল ডিভিশন বেঞ্চ রয়েছে, তা মামলার তুলনায় অপ্রতুল। এর সমাধান হিসেবে ফৌজদারি মামলায় অভিজ্ঞ জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের মধ্য থেকে রিকোয়েস্ট করে ‘অ্যাডহক’ (অস্থায়ী) ভিত্তিতে বিচারক নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। তারা এক বা দুই বছরের জন্য শুধু ঝুলে থাকা মৃত্যুদণ্ডের মামলাগুলো ফাস্ট ট্র্যাক ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করবেন। অতীতের জট শেষ না করলে রামিসা হত্যার মতো নতুন মামলাগুলোর দ্রুত চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করা কঠিন হবে।’

মামলাটির দ্রুত নিষ্পত্তিকে বিচার বিভাগের জন্য এক অনন্য নজির বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু। তিনি বলেন, ‘এ মামলার রায় মূলত চার কার্যদিবসে সম্পন্ন হয়েছে। সাধারণভাবে পাঁচ কার্যদিবস বললেও ভুল হবে না। তবে এ ধরনের অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে এটি ইতিহাস হয়ে থাকবে।’ পরবর্তী আইনি ধাপের জটিলতা প্রসঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘‘এই মামলার পরবর্তী কার্যক্রম হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে যাবে। এটি ‘আইনের ধারা’ অনুযায়ীই হবে। সভ্য রাষ্ট্রের যে আইনগত কাঠামো ও ‘ডিউ প্রসেস অব ল’ রয়েছে, সেটিকে আমরা কোনোভাবেই বাইপাস বা উপেক্ষা করতে পারব না। এখন বিচার বিভাগের অভিভাবক তথা প্রধান বিচারপতি ও সরকার এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেন, সেটিই দেখার বিষয়।’’

আলোচিত এই মামলায় মাত্র চার দিনে ১৭ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ এবং এক দিনেই ১৬ জনের জেরা ও জবানবন্দী সম্পন্ন হওয়া নিয়ে আইনি অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ এই প্রসঙ্গে নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘যেহেতু আসামি অপরাধ স্বীকার করেছে, তাই এখানে দীর্ঘ সময়ক্ষেপণের প্রয়োজন ছিল না। জজ ও আইনজীবী উভয়ে সদিচ্ছা প্রকাশ করলে এক দিনে ১৬-১৭ জনের সাক্ষ্য নেয়া অসম্ভব কিছু নয়।’

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও জনমানসের চাপের প্রভাব প্রসঙ্গে তিনি অকপটে স্বীকার করেন, বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষই দ্রুত বিচার চায়। এই সামাজিক চাপের কারণে হয়তো সরকার ও প্রশাসন কিছুটা দ্রুততার সাথে কাজটি করেছে। তবে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও প্রভাবমুক্ত থাকতে হবে, যেন কোনো বাহ্যিক চাপ বিচারকের রায় বা আইনি প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে না পারে।

এ দিকে দ্রুত রায় কার্যকরের মাধ্যমে সমাজে অপরাধপ্রবণতা কমানোর তাগিদ দিয়েছেন ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম খান। তিনি বলেন, ‘সাত থেকে আট বছরের শিশুদের সঙ্গে যেভাবে এই জঘন্য অপরাধগুলো ঘটছে, তাতে দেশের মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত। আমরা চাই আজকে যে রায় ঘোষণা হয়েছে সেটি যেন উচ্চ আদালতেও দ্রুত বাস্তবায়িত হয়। তাহলে অপরাধীরা এ ধরনের অপরাধ করার সাহস পাবে না।’

মাগুরার বহুল আলোচিত ‘আসিয়া’ হত্যা মামলার রায় এক বছর পার হলেও এখনো কার্যকর হয়নি। এই প্রসঙ্গে ঢাকা বারের এই নেতা বাস্তব চিত্র তুলে করে বলেন, ‘আমাদের দেশে হত্যাকাণ্ডের অনেক মামলা জট লেগে আছে, এগুলো শুনানি করতে স্বাভাবিকভাবেই সময় লাগে। রাতারাতি একটি মামলা শেষ করা সম্ভব নয়। আমরা আশা করি হাইকোর্টেও এটি দ্রুত নিষ্পত্তি হবে।’

বিশেষজ্ঞদের এমন সব আইনি প্রশ্নের বিপরীতে সরকারের নীতিগত অবস্থান ও প্রস্তুতি তুলে ধরেছেন আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান। রায়-পরবর্তী এক প্রতিক্রিয়ায় সচিবালয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী এক মাসের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, রাষ্ট্রপক্ষ তা বাস্তবায়ন করেছে। ন্যায়বিচার নিয়ে যেন কোনো প্রশ্ন না থাকে, সে জন্য সরকারের খরচে আসামিদের জন্য ‘স্টেট ডিফেন্স’ (আইনজীবী) নিয়োগ করা হয়েছিল।’ এই ধরনের বিচারিক ইতিহাস টেনে মন্ত্রী বলেন, ১৮৮২ সালে নদীয়ায় এক দিনে একটি হত্যার বিচার সম্পন্ন হওয়ার উদাহরণ রয়েছে। সেই তুলনায় আধুনিক যুগে চার থেকে ছয় কার্যদিবসের মধ্যে এই বিচার সম্পন্ন হওয়া দেশের বিচারিক ইতিহাসে এক অনন্য নজির।

আইনমন্ত্রী আরো জানান, আগামী সাত দিনের মধ্যে ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্ট বিভাগে পাঠানো হবে। সেখানে সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে দ্রুত পেপারবুক প্রস্তুত করা হবে। অতীতে মাগুরার আছিয়া, রাজন বা রাকিব হত্যা মামলার মতো এই মামলাটিরও দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রধান বিচারপতির সাথে বিশেষ ফোকাসড উদ্যোগ নেয়া হবে। সংশ্লিষ্ট সুপ্রিম কোর্ট বেঞ্চ যদি মামলাটিকে অগ্রাধিকার দিয়ে শুনানি করেন, তবে আগামী তিন মাসের মধ্যে চূড়ান্ত রায় কার্যকর করা সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন মন্ত্রী।

গতকাল রোববার ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার মামলার এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন।

রায়ে মূল আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(২) ধারায় সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। দণ্ডের পাশাপাশি সোহেলকে পাঁচ লাখ ও স্বপ্নাকে দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেয়া হয়েছে, যা ভিকটিম রামিসার আইনগত উত্তরাধিকাররা পাবেন। ক্ষতিপূরণ না দিলে আসামিদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে এই অর্থ আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত স্পষ্ট করেন, ‘আমাদের এই রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক উদ্দেশ্য হলো ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তথা শিশুদের রক্ষা করা। কোনো শিশুর সঙ্গে যদি এ ধরনের ন্যক্কারজনক অপরাধ সংঘটিত হয়, সে ক্ষেত্রে কোনো ধরনের দয়াদাক্ষিণ্য না দেখিয়ে সাজা দিতে হবে।’