অনলাইন নিবন্ধন ও ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারিতে যাচ্ছে এনবিআর

ভ্যাট ব্যবস্থায় বড় সংস্কার : তাৎক্ষণিক বিআইএন

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ব্যবস্থাকে আরো ডিজিটাল, স্বচ্ছ ও ব্যবসাবান্ধব করতে আমূল পরিবর্তন এনেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। নতুন প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ভ্যাট নিবন্ধন, টার্নওভার কর তালিকাভুক্তি, নিবন্ধন বাতিল, তথ্য হালনাগাদ, রিটার্ন দাখিল এবং করদাতা যাচাইয়ের প্রায় পুরো প্রক্রিয়াই অনলাইনভিত্তিক করা হয়েছে। একই সাথে করফাঁকি ও ভুয়া নিবন্ধন প্রতিরোধে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে।

বাজেট ঘোষণার প্রাক্কালে জারি করা এসআরও-১২৫ অনুযায়ী নতুন বিধানগুলো আগামী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে।

নতুন বিধিমালার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো ভ্যাট নিবন্ধনের ক্ষেত্রে আর দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অপেক্ষা করতে হবে না। ই-ভ্যাট সিস্টেমে প্রয়োজনীয় তথ্য ও দলিল ঠিক থাকলে সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা যাচাই করে তাৎক্ষণিকভাবে বিধিমালায় শনাক্তকরণ নম্বর (বিআইএন) এবং নিবন্ধন সনদ ইস্যু করবে।

এতদিন নিবন্ধনের জন্য আবেদন, মাঠপর্যায়ের যাচাই, কাগজপত্র পরীক্ষা এবং প্রশাসনিক অনুমোদনের কারণে অনেক ক্ষেত্রে সপ্তাহ বা মাস লেগে যেত। নতুন ব্যবস্থায় ব্যবসা শুরু করতে আগ্রহী উদ্যোক্তারা দ্রুত কর কাঠামোর আওতায় আসতে পারবেন।

রাজস্ব কর্মকর্তারা বলছেন, এটি বাংলাদেশের ভ্যাট প্রশাসনকে আন্তর্জাতিক মানের ডিজিটাল কর ব্যবস্থার কাছাকাছি নিয়ে যাবে। নতুন ব্যবস্থায় প্রথমে নিবন্ধন দেয়া হবে, পরে মাঠপর্যায়ে যাচাই করা হবে। তবে যাচাইয়ে অসঙ্গতি ধরা পড়লে বিভাগীয় কর্মকর্তা কারণ দর্শানোর নোটিশ দিতে পারবেন এবং প্রয়োজন হলে নিবন্ধনের কার্যকারিতা সাময়িকভাবে স্থগিত করতে পারবেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পদ্ধতি ব্যবসা সহজীকরণের জন্য ইতিবাচক হলেও ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ জন্য এনবিআরকে ঝুঁকিভিত্তিক অডিট ও তথ্য বিশ্লেষণ আরো শক্তিশালী করতে হবে। নিবন্ধন বা তালিকাভুক্তির আবেদন এখন শুধু ই-ভ্যাট সিস্টেমেই নয়, কাস্টমস-এক্সাইজ-ভ্যাট কমিশনারেটের সেবাকেন্দ্র, বিভাগীয় অফিস, মেলা কিংবা এনবিআর নির্ধারিত অন্যান্য সেবা কেন্দ্র থেকেও জমা দেয়া যাবে। এর ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য কর নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়া সহজ হবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী নেতারা।

নতুন বিধিতে স্পষ্ট করা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধনসীমা অতিক্রম করেছে কি না তা নির্ধারণে তার সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম বিবেচনা করা হবে। কর প্রশাসনের ভাষায়, একাধিক ব্যবসা বা কার্যক্রমকে আলাদা দেখিয়ে নিবন্ধন এড়ানোর সুযোগ কমে যাবে। এর ফলে করভিত্তি সম্প্রসারণে সহায়তা মিলতে পারে।

নিবন্ধন বাতিলের ক্ষেত্রেও নতুন বিধান যুক্ত হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠান- নিবন্ধনের পর ব্যবসা শুরু না করলে, ব্যবসা বন্ধ করে দিলে, কার্যক্রম করমুক্ত ঘোষিত হলে, অথবা পরপর দুই বছর নিবন্ধনসীমার নিচে টার্নওভার থাকলে, নিবন্ধন বাতিলের আবেদন করতে পারবে। তবে নিবন্ধন বাতিলের আগে এনবিআরকে শুনানির সুযোগ দিতে হবে এবং সব ধরনের কর দায় নিষ্পত্তি করতে হবে।

বিভাগীয় কর্মকর্তাদের হাতে নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ভ্যাট নিবন্ধনযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও নিবন্ধন না করলে কর কর্মকর্তারা নিজ উদ্যোগে তাকে নিবন্ধিত বা তালিকাভুক্ত করতে পারবেন। কর বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি করজালের বাইরে থাকা ব্যবসাকে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির আওতায় আনার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

নতুন বিধি অনুসারে, ব্যবসার ঠিকানা, ব্যাংক হিসাব, মালিকানা, শাখা অফিস, অর্থনৈতিক কার্যক্রমসহ বিভিন্ন তথ্য পরিবর্তিত হলে ১৫ দিনের মধ্যে তা এনবিআরকে জানাতে হবে। নতুন তথ্য যাচাই শেষে সংশোধিত নিবন্ধন সনদ ইস্যু করা হবে। এতে করদাতাদের তথ্যভাণ্ডার আরো নির্ভুল হবে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রজ্ঞাপনে নতুন ভ্যাট রিটার্ন ফরম ‘মূসক-৯.১.১’ এবং টার্নওভার কর রিটার্ন ফরম ‘মূসক-৯.২’ চালু করা হয়েছে। নতুন ফরমে- বিক্রয়, ক্রয়, সমন্বয়, কর জমা, বকেয়া সুদ, জরিমানা, সমাপনী স্থিতি ইত্যাদি তথ্য আরো কাঠামোবদ্ধভাবে উপস্থাপন করতে হবে।

এনবিআর মনে করছে, এতে তথ্য বিশ্লেষণ সহজ হবে এবং কর ফাঁকি শনাক্তকরণে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদার করা সম্ভব হবে।

ইনপুট-আউটপুট কো-ইফিশিয়েন্ট (আইওসি) বা উপকরণ-উৎপাদ সহগ ঘোষণার নিয়মও সংশোধন করা হয়েছে। তবে শতভাগ রফতানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং নির্দিষ্ট কিছু খাতকে এই বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এতে রফতানিমুখী শিল্পের প্রশাসনিক ব্যয় ও কাগজপত্রের চাপ কমবে।

বিধিমালার একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হলো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে জরিমানার পরিমাণ ৫ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ১ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য স্বস্তির খবর হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নতুন বিধিমালা এক দিকে যেমন করদাতার জন্য নিবন্ধন ও রিটার্ন দাখিল সহজ করছে, অন্য দিকে এনবিআরকে আরো বেশি তথ্যভিত্তিক নজরদারির সুযোগ দিচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি মূলত ‘আগে আস্থা, পরে যাচাই’ মডেলের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা। এতে ব্যবসা শুরু ও পরিচালনার প্রক্রিয়া সহজ হবে, তবে কর প্রশাসনকে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে যাতে তাৎক্ষণিক নিবন্ধন ব্যবস্থার অপব্যবহার না হয়। বিশ্লেষকদের ধারণা, নতুন বিধিমালার ফলে- নতুন করদাতার সংখ্যা বাড়বে, ভ্যাট নিবন্ধন প্রক্রিয়া দ্রুত হবে, করজাল সম্প্রসারিত হবে, তথ্যভিত্তিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সহজ হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব আহরণ বাড়তে পারে। তবে সফলতা নির্ভর করবে ই-ভ্যাট সিস্টেমের কার্যকারিতা, মাঠপর্যায়ের যাচাইয়ের মান এবং এনবিআরের ডিজিটাল সক্ষমতার ওপর। নতুন বিধিমালা কার্যকর হলে বাংলাদেশের ভ্যাট প্রশাসন কাগজনির্ভর আমলাতান্ত্রিক জটিল কাঠামো থেকে আরো বেশি প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হবে, যা দেশের কর সংস্কারের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।