তিন বছরের রেলপথ নির্মাণ ১ যুগেও শেষ হলো না

Printed Edition

হামিদুল ইসলাম সরকার

দেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো ক্রমেই দীর্ঘসূত্রতা, ব্যয় বৃদ্ধি ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার উদাহরণ হয়ে উঠছে। বছরের পর বছর অর্থ ব্যয়ের পরও অনেক প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শেষ করা যাচ্ছে না। এরই একটি বড় উদাহরণ ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সেকশনে বিদ্যমান মিটারগেজ লাইনের সমান্তরালে ২৯ দশমিক ৯১ কিলোমিটার ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণ প্রকল্প। মাত্র তিন বছরে শেষ করার ল্য নিয়ে অনুমোদিত প্রকল্পটি এক যুগ পেরিয়েও শেষ হয়নি। ১২ বছরে বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৫৭ দশমিক ২০ শতাংশ।

এর মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২৩ সালে একটি প্যাকেজের চীনা ঠিকাদার কাজ অসমাপ্ত রেখেই চলে যায়। পরে নতুন করে দরপত্র আহ্বান ও ঠিকাদার নিয়োগে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। অন্যদিকে প্রকল্পের ব্যয়ও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। শুরুতে ৩৭৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকার প্রকল্পের ব্যয় এখন দাঁড়িয়েছে ৬৫৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকায়। অর্থাৎ ব্যয় বেড়েছে ২৭৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকা বা প্রায় ৭৪ শতাংশ।

সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘসূত্রতা ও দুর্বল প্রকল্প ব্যবস্থাপনার কারণে বিদেশী অর্থায়ন না বাড়ায় অতিরিক্ত ব্যয়ের বড় অংশ সরকারকেই বহন করতে হচ্ছে। ফলে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় বাড়ছে।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ‘ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সেকশনে বিদ্যমান মিটারগেজ রেললাইনের সমান্তরালে একটি ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পটি ডিআরজিএ-সিএফের অনুদান সহায়তায় ২০১৫ সালে একনেক সভায় অনুমোদন পায়। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছিল জুলাই ২০১৪ থেকে জুন ২০১৭ পর্যন্ত। শুরুতে মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ৩৭৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের অর্থায়ন ছিল ১২৯ কোটি ১১ লাখ টাকা এবং ডিআরজিএ-সিএফের অনুদান ছিল ২৪৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকা।

কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পটির মেয়াদ দফায় দফায় বাড়ানো হয়। চার দফা মেয়াদ বাড়িয়ে প্রথমে ডিসেম্বর ২০২২ পর্যন্ত নেয়া হয়। পরে বিদ্যমান মিটারগেজ লাইনকে ভবিষ্যতে ডুয়েলগেজে রূপান্তরের সংস্থান রেখে প্রকল্পটি সংশোধন করা হয়। এতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৬৫৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় প্রকল্পের মেয়াদ জুন ২০২৬ পর্যন্ত বাড়ানোর অনুমোদন দেয়া হয়। এখন আবার দ্বিতীয় সংশোধিত ডিপিপি প্রস্তুত করে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটের বিদ্যমান মিটারগেজ সিঙ্গেল লাইনটি ১৮৮২ সালে নির্মিত হয়। রাজধানী ঢাকা ও দেশের অন্যতম বৃহৎ নদীবন্দর নারায়ণগঞ্জের মধ্যে এই রেলপথের দূরত্ব ১৬ দশমিক ১০ কিলোমিটার। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যাত্রী এই পথে কমিউটার ট্রেনে যাতায়াত করেন। শিা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের জন্য রুটটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি এটি সড়কপথের যানজটও কিছুটা কমিয়ে থাকে। তবে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের ক্রমবর্ধমান চাহিদার তুলনায় বিদ্যমান সিঙ্গেল লাইনটি অপর্যাপ্ত হয়ে পড়েছে। এ কারণেই নতুন ডুয়েলগেজ লাইন নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়।

প্রকল্পের আওতায় ৩০ দশমিক ২৬ কিলোমিটার রেল ট্র্যাক নির্মাণ, পাঁচটি স্টেশন ভবন, ১১টি লেভেল ক্রসিং গেট, পাঁচটি ফুটওভারব্রিজ, ১০টি প্ল্যাটফর্ম ও প্ল্যাটফর্ম শেড, ২২টি ছোট সেতু, দু’টি ওয়াশপিট, একটি ডরমিটরি এবং একটি গেটম্যান কোয়ার্টার নির্মাণের কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক মো: সেলিম রউফ বলেন, শুরুতে জমি-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে প্রায় দুই বছর সময় নষ্ট হয়। পরে চীনা ঠিকাদার কম দর দিয়ে কাজ নিলেও বাজারদর বেড়ে যাওয়ায় তারা নির্ধারিত দামে কাজ করতে পারেনি। একপর্যায়ে ২০২৩ সালে তারা চুক্তি বাতিল করে কাজ ফেলে চলে যায়। এরপর নতুন করে দরপত্র আহ্বান ও ঠিকাদার নিয়োগে আরো সময় লাগে।

তিনি বলেন, ‘ঠিকাদার কাজ শেষ না করেই চলে গেছে। তাদের কিছু বিল বকেয়া ছিল। তবে চুক্তি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার প্রক্রিয়া এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি।’ ১২ বছরে মাত্র ৫৭ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘নতুন ঠিকাদার এখন কাজ করছে। দ্রুত অনুমোদন পাওয়া গেলে ২০২৮ সালের মধ্যেই কাজ শেষ করা সম্ভব হবে।’

এদিকে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ প্রকল্পটির অস্বাভাবিক বিলম্ব নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তুলেছে। কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্পের শুরু থেকে বছরভিত্তিক ল্যমাত্রা ও বাস্তব অগ্রগতির বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি ঠিকাদার কাজ ফেলে চলে যাওয়ার ঘটনায় চুক্তির কোন ধারা অনুযায়ী কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, তারও পূর্ণাঙ্গ বিবরণ চাওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া পিপিআর-২০০৮ অনুযায়ী কত দিনের মধ্যে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ দেয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল এবং বাস্তবে কত দিনে তা করা হয়েছে, সেটিও জানতে চেয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে কি না, তাও ব্যাখ্যা করতে বলা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্পে দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল পরিকল্পনা ও জবাবদিহির অভাবের কারণেই বারবার একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। সময়মতো প্রকল্প শেষ না হওয়ায় যেমন ব্যয় বাড়ছে, তেমনি জনগণও প্রত্যাশিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।