ববি প্রতিনিধি
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) সংলগ্ন ঢাকা-কুয়াকাটা ও ভোলা-বরিশাল মহাসড়কে শাখা ছাত্রদলের শীর্ষ ও পদধারী নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। গত মঙ্গলবার (১৯ মে) ভোর রাতে মহাসড়কে মাছের গাড়ি আটকে হুমকি-ধমকি দিয়ে একাধিক বিকাশ এজেন্টের মাধ্যমে প্রায় লাধিক টাকা হাতিয়ে নিয়েছে অভিযুক্তরা।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নবগঠিত কমিটির সহসভাপতি মিয়া বাবুল, সহসভাপতি মো: মিথুন, সহসভাপতি আকিব, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো: ইব্রাহিম হোসেন স্বজন এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো: ইমরান মাহমুদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো: শাখাওয়াত, সহসাংগাঠনিক সম্পাদক মো: হায়দার মুন্সি, শাহরিয়ারসহ একাধিক নেতাকর্মী সরাসরি এই চাঁদাবাজির সাথে জড়িত।
সাধারণ ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি মো: মোশাররফ হোসেন, সাধারণ সম্পাদক আরিফ হোসাইন শান্ত, সাংগঠনিক সম্পাদক মো: মিজানুর রহমানসহ সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের ছত্রছায়ায় মহাসড়কে এই নিয়মিত চাঁদাবাজি চলছে। আদায়কৃত চাঁদার একটি বড় অংশ তাদের পকেটেও যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার ভোর ৫টার দিকে মহাসড়কে মাছের গাড়ি আটকে ব্যবসায়ীদের জিম্মি করা হয়। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের তিনটি বিকাশ এজেন্ট অ্যাকাউন্টে মোট ৯৪ হাজার ৯০০ টাকা পাঠাতে বাধ্য করা হয় ব্যবসায়ীদের। টাকা পাঠানো নিশ্চিত করতে প্রতিবারই মাছ ব্যবসায়ীর ফোন নাম্বার থেকে কল দিয়ে নিশ্চিত করা হয়। পরবর্তীতে সকাল ৯টার দিকে অভিযুক্ত ছাত্রদল সহসভাপতি মিয়া বাবুল ও সহসাংগঠনিক সম্পাদক মো: হায়দার মুন্সিসহ মোট চারজন সরাসরি ওইসব দোকানে গিয়ে টাকা তুলে নিয়ে আসে।
চাঁদাবাজির টাকা লেনদেনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভোলা রোড-সংলগ্ন একটি ফার্মেসি, কেন্দ্রীয় মসজিদের মুয়াজ্জিনের দোকান এবং হলের একটি দোকান ব্যবহার করা হয়। ব্যবসায়ী লোকমানের এজেন্ট নম্বরে তিন দফায় মোট ৪৪ হাজার ৯০০ টাকা পাঠানো হয়। সকাল ৬:৫৬ মিনিটে ১৫ হাজার টাকা (ট্যাক্স আইডি : উঊঔ৬ঈতঝঋজঙ)। সকাল ৭:২০ মিনিটে ৯ হাজার ৯০০ টাকা (ট্যাক্স আইডি : উঊঔ৪উ০২১উট)। সকাল ৭:৩৬ মিনিটে ২০ হাজার টাকা (ট্যাক্স আইডি: উঊঔ৬উ০৯ঘতএ)
ফার্মেসির মালিক লোকমান বলেন, সকাল ৯টার দিকে মিয়া বাবুল আমাকে কল দিয়ে বলেন,’ মামা, আপনার নম্বরে টাকা পাঠাইছি। আমার এক বন্ধু অসুস্থ, টাকাটা জরুরি লাগবে।’ পরবর্তীতে আমি নম্বর মিলিয়ে তাকে ৪৪ হাজার ৯০০ টাকা ক্যাশ বুঝিয়ে দিই।
কেন্দ্রীয় মসজিদের মুয়াজ্জিনের দোকান : বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের মুয়াজ্জিনের এজেন্ট নাম্বারে দুই দফায় ৩৫ হাজার ৩০০ টাকা পাঠানো হয়। সকাল ৬:৩৩ মিনিটে ২৫ হাজার ৩০০ টাকা (ট্যাক্স আইডি : উঊঔ৬ঈতঘঙ২০)। সকাল ৭:০০ মিনিটে ১০ হাজার টাকা (ট্যাক্স আইডি: উঊঔ৭ঈতট৭ণঞ)
মুয়াজ্জিন সাহেব বলেন, সকাল ৯টা ১১ মিনিটে আমাকে কল দিয়ে বলা হয় হুজুর আপনি কই? আপনার নম্বরে টাকা গেছে, টাকাগুলো লাগবে। আমি দ্রুত দোকানে আসি। কিন্তু আমার কাছে পর্যাপ্ত ক্যাশ না থাকায় অন্য দোকান থেকে ২৫ হাজার টাকা এনে তাদের দিই। বাকি ১০ হাজার টাকা তাদের দেয়া একটি নম্বরে সেন্ডমানি (ট্যাক্স আইডি : উঊঔ৬উ২জউ৮ও) করে দিতে বলায় আমি পাঠিয়ে দিই। তারা চার-পাঁচজন এসেছিল একসাথে।
চাঁদাবাজির অবশিষ্ট টাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের ভেতরের দোকানদার সেলিম মামার বিকাশ অ্যাকাউন্ট থেকে উত্তোলন করে নিয়ে যায় অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতারা।
চিংড়ি রেণু উৎপাদনকারী হ্যাচারি মালিক জাহাঙ্গীর বলেন, আমার দু’টি চিংড়ির রেণুবাহী গাড়ি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের শিার্থীরা আটকে চাঁদা দাবি করে। আমি প্রথমে ৯৯৯ এবং সংশ্লিষ্ট থানায় কল করেও কোনো প্রতিকার পাইনি। পরে আমার কাছ থেকে যারা মাছ কিনেছেন, তারা বাধ্য হয়ে বিকাশে প্রায় দেড় লাখ টাকা চাঁদা দিয়ে গাড়ি উদ্ধার করেন। আরেকটি গাড়ি থেকে চাঁদা নিতে না পেরে তারা গাড়ি ভাঙচুর করেছে এবং চালককে মারধর করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সহসভাপতি মিঞা বাবুল বলেন, আমাকে এখানে ফাঁসানো হচ্ছে। খায় সবাই মিলে; কিন্তু নাম হয় শুধু আমার এরসাথে এলাকার কিছু লোকও জড়িত আছে। আমি দ্রুত সাংবাদিকদের মাধ্যমে মূলহোতাদের নাম সামনে নিয়ে আসব।
সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাফি শিকদার বলেন, চাঁদাবাজি এবং অন্যান্য অবৈধ কাজের সাথে যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে তথ্য ও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ সংরণের কাজ চলমান রয়েছে। প্রমাণসাপেে তাদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়ার প্রস্তুতি আমরা নিচ্ছি। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ছাত্রদলের সেক্রেটারি শান্ত ইসলাম আরিফ বলেন, আমি গনমাধ্যমের দেখছি। আসলে এই বিষয়ে আমি অবগত ছিলাম না। এ রকম কোনো ঘটনা ঘটে থাকলে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ছাত্রদলের সভাপতি মোশাররফ হোসেন বলেন, আমাদের অবস্থান একদম পরিষ্কার। দলের নাম ব্যবহার করে যদি কেউ অন্যায় বা অনিয়মে জড়িত থাকে এবং তা প্রমাণিত হয়, তবে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে এর বিরুদ্ধে কঠোর পদপে নেবো।
ববি ছাত্রদলের দুই সহসভাপতিকে বহিষ্কার
এ দিকে মহাসড়কে পোনাবাহী মাছের গাড়ি আটকে চাঁদাবাজির অভিযোগে ববি ছাত্রদলের দুই সহসভাপতি মিঞা বাবুল ও মো: মিঠুকে সাংগঠনিক পদ থেকে বহিষ্কার করেছে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল। তবে শীর্ষ পাঁচ নেতার যোগসাজশের অভিযোগ থাকলেও তারা রয়ে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
গতকাল ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় দফতর সম্পদক মো: জাহাঙ্গীর আলমের স্বারিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে ববি ছাত্রদলের সহসভাপতি দু’জনকে বহিষ্কারের কথা জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, কেন্দ্রীয় সংসদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সহসভাপতি মিয়া বাবুল ও মো: মিঠুকে সাংগঠনিক পদ থেকে বহিষ্কার করা হলো।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির এ সিদ্ধান্ত অনুমোদন এবং ছাত্রদলের সব নেতাকর্মীদের তাদের সাথে কোনোরূপ সাংগঠনিক সম্পর্ক না রাখতে নির্দেশনা দিয়েছেন।



