যাদের ত্যাগে বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ

শহীদ বিপ্লব হাসানের মায়ের আকুতি ‘পোলায় মা কইয়া ডাক দেয় না এক বছর’

Printed Edition
শহীদ বিপ্লব হাসানের মায়ের আকুতি ‘পোলায় মা কইয়া ডাক দেয় না এক বছর’
শহীদ বিপ্লব হাসানের মায়ের আকুতি ‘পোলায় মা কইয়া ডাক দেয় না এক বছর’

মো: সাজ্জাতুল ইসলাম ময়মনসিংহ

‘পোলায় মা কইয়া ডাক দেয় না এক বছর হইল। ঘর থেকে বের হওয়ার আগে মা কইয়া ডাকত। এখন আর কেউ ডাক দেয় না। আমার বিপ্লবরে ক্যামনে গুলি করে মারল রে বাবা! তারার কি একটুও মায়া লাগল না? আমার বিপ্লব কোনো রাজনীতি করত না। হতবিহ্বল দৃষ্টিতে কথাগুলো বললেন জুলাই আন্দোলনে নিহত শহীদ বিপ্লব হাসানের মা বিলকিস বেগম।

অভাব-অটনের চাপে পেটের দায়ে অয়েল মিলে কাজ করত। তারে ক্যারে গুলি কইরা মারল? পুলিশ তারে মাতে ফেলে এমনভাবে গুলি করছে যেন বুকটা ঝাজরা হইয়া গ্যাছে। পুশের চাপের ছেলেডারে তকইরা বাভিতরেই দাফন করতে হইল।

গতকাল রোববার দুপুরে নয়া দিগন্তকে কথাগুলো বলছিলেন শহীদ বিপ্লব হাসানের মা বিলকিস বেগম। এ সময় তিনি সন্তানের ছবি নিয়ে কাঁদতে থাকেন। পাশে বসে ছিলেন শহীদ বিপ্লবের নির্বাক বাবা বাবুল মিয়া।

শহীদ বিপ্লব হাসান (১৯) ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার ডৌহাখলা ইউনিয়নের চুড়ালী গ্রামের বাবুল মিয়ার ছেলে। বিপ্লব মোজাফফর আলী ফকির উচ্চবিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজ থেকে ২০২৩ ও ২০২৪ সালে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিলেও দুইবারই অকৃতকার্য হন।

বিপ্লবের মা বলেন, বিপ্লবের বাবা বাবুল মিয়া রিকশা গ্যারেজের মিস্ত্রির কাজ করতেন। কোমরের হাড় ক্ষয় হয়ে যাওয়ায় এখন আর আগের মতো কাজ করতে পারেন না। টাকার অভাবে দুই মেয়ের লেখাপড়াও বন্ধ হয়ে যায়। বাবার চিকিৎসা আর দুই বোনের লেখাপড়ার খরচ চালাতে বাধ্য হয়ে বিপ্লব হাসান কিষানী অয়েল মিলে চাকরি নেন। ছেলেই ছিল একমাত্র ভরসা। মাস শেষে বেতনের পুরো টাকাই তুলে দিতেন মায়ের হাতে। দৈনন্দিন খরচের টাকা মায়ের কাছ থেকে চেয়ে নিতেন। মাকে বাড়ির বাইরে। যেতে বারণ করত।

জানা যায়, ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুর উপজেলার কলতাপাড়া বাজারের পাশে চুড়ালী গ্রামে মাত্র ২ শতাংশ জমিতে পথনে মোড়ানো ছোট্ট এক জোড়া ঘরে তিন সন্তান নিয়ে বসবাস করতেন বাবুল মিয়া ও বিলকিস আক্তার দম্পতি। গত বছর ২০ জুলাই গৌরীপুরের কলতাপাড়ায় কোটা আন্দোলনকারীদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ ও গুলিবর্ষণের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত তিনজনের একজন বিপ্লব হাসান (১৯)।

শহীদ বিপ্লবের মা বিল কাঁদতে কাঁদতে জানান, ‘আমি কোনো দিন ছেলেকে একটা চড় (থাপ্পড়) দেইনি। পুলিশ আমার ছেলেকে (বিপ্লব) কেন মারল। মানুষের কাছে শুনেছি, ছেলের মুখে পাড়া দিয়ে পুলিশ গুলি করেছে। সবাই দেখেছে, পুলিশের গুলিতেই আমার ছেলে মারা গেছে। আমি যদি জানতাম গোলযোগ হচ্ছে, তাহলে তো ছেলেকে ঘর থেকে যেতেই দিতাম না। গত বছর ২০ জুলাই রাতে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ থেকে বিপ্লবের লাশ আনার পর রস্তায় রাখা হয়েছিল। দেখলাম, ওর গালে পুলিশের বুটের (জুতা) ছাপ। কপালে ও গলায় গুলির আঘাত। পুলিশ দ্রুত লাশ দাফন করতে চাপ দিলে ঘরের পাশেই দাফন করা হয় নাড়িছেঁড়া আমার বিপ্লবকে। সেই সাথে গোটা পরিবারের সামনে নেমে এসেছে অমানিশার ঘোর অন্ধকার।

বিল আরো জানান, ডিউটি থেকে এসে রাতে ঘুমানোর আগে বলল, মা দুপুর ১টার সময় ডেকে দিও ২টায় ডিউটিতে যাব। সকালে গভীর ঘুমে ছেলেকে দেখে রান্না করতে যান মা। বড় মেয়ে বাবলী ঘুম থেকে জাগানোর চেষ্টা করলে বিপ্লব ওকে থাপ্পড় মারে। ঘুম ভেঙে গেলে বিপ্লব জানতে চায়- ‘মা কী রান্না করেছ।’ বললাম- মাছ। ও মাছ পছন্দ করে না। বাজারে নাশতা করবে বলে মায়ের কাছে টাকা চেয়েছিল। সাড়ে ১০টার দিকে একটা ফোন পেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। সাড়ে ১২টার দিকে ছেলে গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পেয়ে মূর্ছা যান মা। বেহুঁশ হয়ে যান তিনি।

এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শহীদ বিপ্লব হাসানের পিতা বাবুল মিয়া বাদি হয়ে গৌরীপুর থানায় গত ৪ এপ্রিল একটি মামলা করেন। এ মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে গৌরীপুর থানার তৎকালীন সাব ইন্সপেক্টর শফিকুল আলম ও ২নং আসামি করা হয়েছে গৌরীপুর থানার তৎকালীন অফিসার ইনচার্জ সুমন চন্দ্র রায়কে। এ মামলার অন্য আসামিরা হলেন, উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্পাদক সোমনাথ সাহা, ডৌহাখলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সম্পাদক শহিদুল হক সরকার, পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি সৈয়দ রফিকুল ইসলাম, ময়মনসিংহ স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক তানজীর আহম্মেদ রাজিব, পৌর যুবলীগের সভাপতি মেহেদী হাসান মিথুনসহ ১৫০ জন।

ঘটনার এক বছর অতিবাহিত হলেও আসামিদের গ্রেফতার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, পুলিশকে ধরছে না। পুলিশ বুলেট দিয়ে আমার ছেলের মাথায় ঝাঁজরা করে দিয়েছিল। অথচ সেই পুলিশ এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে, এটা মানতে পারছি না।

এ প্রসঙ্গে ময়মনসিংহ জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ওসি মহিদুল ইসলাম জানান, তারা পলাতক। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাদের অবস্থান শনাক্ত করে গ্রেফতারের চেষ্টা চালানো হচ্ছে।