শিশু হাসপাতাল থেকে ফেরত যাচ্ছে হাম আক্রান্তরা

মানা হচ্ছে না সরকারি নির্দেশনা

হামিম উল কবির
Printed Edition

রাজধানীর শিশু হাসপাতালে হাম আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে আসছেন অভিভাবকরা; কিন্তু বেড না পেয়ে শিশুর ভবিষ্যৎ চিন্তা করে চোখের পানি ফেলছেন। সকাল থেকে অনেকে অভিভাবক ভিড় করছেন শিশুদের নিয়ে, দিন চলে যায় কোনো বেড পাওয়া যাচ্ছে না। স্বাস্থ্য অধিদফতরের হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর পরিচালকের দফতর থেকে জারি করা নির্দেশনাকে আমলেই নিচ্ছে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর পরিচালক ডা: আবু হোসেন মো: মঈনুল আহসান এই নির্দেশনা জারি করেন। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ‘শয্যা খালি না থাকার অজুহাতে কোনো হাসপাতাল থেকে হাম বা হাম উপসর্গের রোগী অন্যত্র রেফার করা যাবে না। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালকেই অতিরিক্ত শয্যার ব্যবস্থা করে রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।’

কিন্তু গতকাল বেলা আড়াইটা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ঢাকা শিশু হাসপাতালের জরুরি বিভাগে গিয়ে দেখা গেছে, শ্বাসকষ্ট নিয়ে আসা হামের রোগীদেরও ভর্তি না করে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

শরীয়তপুরের গোসাইরহাট থানা থেকে আবুল বাশার তার এক মাসের সন্তান বুশরাকে নিয়ে এসেছিলেন এই হাসপাতালে। শিশুটির শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল; কিন্তু হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ভর্তি করেনি। শিশু হাসপাতালে এই শিশুটির জন্য কোনো সিট নেই জানিয়ে বলে দেয়া হয়েছে অন্যত্র নিয়ে যেতে। শিশুটির মা কথা বলছিলেন আর বলছিলেন, ‘অনেকক্ষণ থেকে বলেছি আমার বাচ্চাটাকে বাঁচান; কিন্তু তারা কথাই শুনলেন না।’ তারা প্রথমে এসেছিলেন ১১ মে পাশের সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে। সেখানে শিশুটিকে ভর্তি করা সম্ভব না হওয়ায় যখন হতাশায় ভুগছিলেন ঠিক সে সময় পাশের একটি বেসরকারি হাসপাতালের দালাল নানা কিছু বলে শিশুটিকে নিয়ে যায় সেখানে। সেখানে ২৪ ঘণ্টায় ৩১ হাজার টাকা বিল হলে সেটি পরিশোধ করে সেখান থেকে চলে আসেন শিশু হাসপাতালে। এই প্রতিবেদক গতকাল বিকেলে যখন কথা বলছিলেন তখন তাদের কাছে শরীয়তপুর যাওয়ার মতো ভাড়াও ছিল না।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে লক্ষ্মীপুর সদর থানা থেকে নাজমুল করিম তার তিন বছরের ছেলে আয়ানকে নিয়ে এসেছেন। আয়ানের হাম হয়েছে, মুখে লাল লাল র‌্যাশে ভর্তি। শিশুটি শুধুই কাঁদছিল। নাজমুল করিম লক্ষ্মীপুর থেকে রাত ৩টায় রওনা দিয়ে খুব সকালে আসেন হাসপাতালে; কিন্তু আয়ানের জন্য কোনো বেডের ব্যবস্থা করতে পারেননি। তিনি জানান, হাসপাতালের অনেককে ধরেছেন ছেলেকে ভর্তি করে দেয়ার জন্য; কিন্তু কোনো ব্যবস্থা করতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত ঢাকায় অবস্থান করা এলাকার লোকজনকে ফোন দিচ্ছিলেন, একটা ব্যবস্থা করে দিতে পারে কি না। বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত তিনি ফোন দিয়েই যাচ্ছিলেন। নাজমুল করিম তার ছেলেকে এর আগে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করেছিলেন; কিন্তু ছেলের স্বাস্থ্যের কোনো উন্নতি হয়নি।

শিশু হাসপাতাল থেকে ফেরত যাচ্ছে

চাঁদপুরের মতলব থানার নারায়ণপুর ইউনিয়ন থেকে হালিমা আক্তার তার ১০ মাসের শিশুপুত্র শায়ানকে নিয়ে এসেছেন শিশু হাসপাতালে। শিশুটির হাম অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে কিন্তু তার রয়েছে তীব্র শ্বাসকষ্ট। শিশু হাসপাতালে কোনো সিট নেই বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন ডাক্তাররা। কী করবেন বুঝতে পারছেন না তিনি। ছেলে শায়ানকে এর আগে রাজধানীর ইস্টওয়েস্ট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। শায়ানকে শুরুতেই তারা কার্বাপেনেম (জেনেরিক নাম এটি, সঙ্গত কারণে ট্রেড নামটি উল্লেখ করা হলো না, হালিমা আক্তার ট্রেড নামটিই বলেছেন) দিয়েছে। এটা একটি অ্যান্টিবায়োটিক, আইসিইউর রোগীকে দেয়া হয় অ্যান্টিবায়োটিক। দুই দিন শায়ানের ব্লাড কালচার করার জন্য রক্ত পাঠানো হয়। ব্লাড কালচারে কোনো কিছু আসেনি বলে জানান হালিমা আক্তার। এত দামি দামি ইনজেকশন ও ওষুধ দেয়ার পরও সুস্থ না হলে শায়ানকে নিয়ে শিশু হাসপাতালে চলে আসেন ভর্তির জন্য। কিন্তু শিশু হাসপাতালে সেট না পেয়ে এক কোনায় বসে কাঁদছেন। কী করবেন বুঝতে পারছেন। স্বচ্ছল পরিবারের হালিমা আক্তার প্রথমে বেসরকারি হাসপাতালেই গিয়েছিলেন কিন্তু সব টাকা খরচ করে এসেছেন শিশু হাসপাতালে।

গতকাল বুধবার বিকেলে এ ধরনের বিভিন্ন রোগের শিশুতে ভর্তি ছিল শিশু হাসপাতালের ওয়েটিং এলাকাটি। অনেক শিশুর হাতে ও পায়ে ক্যানুলা পরানো ছিল। এরা এর আগে অন্য কোনো হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। সুস্থ না হয়ে শিশুদের এরা সবাই শিশু হাসপাতালের দ্বারস্থ হলেও শিশু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সবার জন্য চিকিৎসার নিশ্চয়তা দিতে পারছে না।

এ ব্যাপারে শিশু হাসপাতালের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা: এ কে এম আজিজুল হক নয়া দিগন্তকে জানান, শিশু হাসপাতালে হামের জন্য কোনো বেড ছিল না। বর্তমানে প্রয়োজনের নিরিখে ৮২টি বেড করা হয়েছে শুধু হামের চিকিৎাসর জন্য। শুধু হামের জন্য ১৬টি আইসিইউর ব্যবস্থা করা হয়েছে। হাম আক্রান্ত শিশুদের অবস্থা একটু ভালো হলে আমরা অন্য কোথাও স্থানান্তর করে নতুন রোগী ভর্তি করি। আমরা চেষ্টা করছি সবাইকে চিকিৎসা দিতে। তিনি বলেনন, যে শিশুদের হাম ছড়ানো বন্ধ হয়েছে বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা কিন্তু আইসিইউর সাপোর্ট প্রয়োজন এদের আমরা অন্য ডিপার্টমেন্টের আইসিইউতে স্থানান্তর করে নতুনদের চিকিৎসা দিচ্ছি। আমাদের চেষ্টার কমতি নেই কিন্তু আমাদের সামর্থ্য সীমিত।