জস্ব প্রতিবেদক
গুমের শিকার ব্যক্তিদের বিচার পাওয়া নিশ্চিত করা জরুরি। বিচারকাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন না হলে আবারো গুম ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি ফিরে আসবে। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেস কাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে মানবাধিকার সংগঠন অধিকার আয়োজিত আন্তর্জাতিক নিখোঁজ সপ্তাহ-২০২৬ উপলে ‘ন্যায়বিচার, তিপূরণ এবং পুনরাবৃত্তি রোধের নিশ্চয়তা নিশ্চিতকরণ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলা হয়।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম, সংসদ সদস্য আখতার হোসেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম, গুম কমিশনের সাবেক সদস্য নাবিলা ইদ্রিস, গুম থেকে ফিরে আসা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) আব্দুল্লাহিল আমান আযমী, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, ব্রিগেডিয়ার (অব:) হাসিনুর রহমান, মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য অধ্যাপক শরিফুল ইসলামসহ মানবাধিকারকর্মী ও ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা।
গোলটেবিলে বক্তারা বলেন, গুমের শিকার পরিবারগুলো আজও চরম অনিশ্চয়তা ও আর্থিক সঙ্কটে জীবনযাপন করছে। আইনি স্বীকৃতি না থাকায় অনেক পরিবার ব্যাংক হিসাব পরিচালনা, সম্পত্তি সংক্রান্ত কাজ বা আর্থিক সহায়তা পেতে নানা জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছে। সরকার চাইলেই এসব পরিবারের জন্য তিপূরণ ও ব্যাংক হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ নিশ্চিত করতে পারে।
ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম বলেন, প্রধানমন্ত্রী প্রথমদিকে গুম নিয়ে যেভাবে কথা বলেছিলেন কাজের ক্ষেত্রে তা প্রতিফলিত হচ্ছে না। মহান সংসদে দাঁড়িয়ে একাধিকবার গুম বিষয়ে কথা উত্থাপন করেছি কিন্তু তাতেও লাভ হয়নি। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে বলেন, আপনার শরীরে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের রক্ত। আপসহীন নেত্রীর সন্তান আপনি। মানুষ আপনার ওপর আস্থা রাখতে চায়। আইওয়াশের মাধ্যমে বোকা না বানিয়ে তাদের বিপদ থেকে উদ্ধার করেন। গুম হওয়া ব্যক্তি যারা চলে গেছেন তাদের কেউ ফেরত আনতে পারবে না। কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া প্রিয়জনের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের ভোগান্তিগুলো দূর করার চেষ্টা করুন। যাতে দেশে আরো একটি জুলাই না আসে। তিনি বলেন, গুমের শিকার পরিবারগুলোর সহায়তার জন্য প্রতারক চক্র তহবিল গঠন করে সেই টাকা আত্মসাৎ করেছে। তাদের বিচার করে এ ধরনের কাজ আর কেউ যাতে করতে না পারে সে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
গুম সংক্রান্ত কমিশনের সাবেক সদস্য সাজ্জাদ হোসেন বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের করা গুম সংক্রান্ত অধ্যাদেশ থেকে আরো শক্তিশালী আইন করা হবে বলে সরকার যে আইন করছে তার খসড়া দেখে মনে হচ্ছে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের করা ২০০৯ সালের আইনের থেকে জঘন্যতম আইন তৈরি করা হচ্ছে। নতুন এই আইনে যারা গুম করে থাকে সেসব বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্ত করা যাবে না বলে উল্লেখ থাকছে। তদন্ত করতে হলে ওই থানার একজন এসআই ওই সংস্থার প্রধানের কাছে আবেদন করে রিপোর্ট চাইতে হবে। একজন এসআইয়ের পক্ষে একটি সংস্থার প্রধানের কাছে গিয়ে তথ্য চাওয়া বা তদন্ত করা কতটুকু সম্ভব হবে। এ ছাড়া কমিশনের যারা থাকবেন তারা সবাই রাষ্ট্রপতির সুপারিশে সরকার নিয়ন্ত্রণে থাকলে কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন।
গুম সংক্রান্ত কমিশনের সাবেক সদস্য ড. নাবিলা ইদ্রিস বলেন, যেকোনো আইন তৈরি করতে সবার স্বার্থ রক্ষা করতে হয়। বিগত সরকার গুম সংক্রান্ত আইন তৈরির সময় সবার মতামত নিয়ে আইনটি তৈরি করেছিলেন। তিনি বলেন, কমিশনে কাজ করার সময় আমার কাছে গুম সংক্রান্ত অসংখ্য ফাইল আসে। যার মধ্যে কিছু ফাইল ছিল অনেক পুরনো ঘুণে ধরা। ফাইলগুলো এত পুরনো কেন জানতে চাইলে আমাকে বলা হয় এগুলো নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে। কারো ক্ষমতা নেই নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্ত করা। আমার মনে হচ্ছে নতুন যে আইন করা হচ্ছে তাতে ওই পুরনো ফাইলগুলো আর উত্থাপন করা হবে না। তিনি বলেন, এখানে লুকোচুরির কিছু নেই। আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে চাইছি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের দ্বারা সংঘটিত কোনো ধরনের অপরাধের স্বচ্ছ এবং সঠিক তদন্ত সরকার চাইছে না। আইনগুলো পড়লে সরকারের ইনটেনশন কিয়ার হয়ে যায়। তিনি বলেন, গুম বিষয়ে প্রায় ১৬ অভিযোগ আমাদের কাছে আসে। যার মধ্যে বেশি বিএনপির। অথচ এসব ঘটনায় জিডি হয়েছিল মাত্র ২৫০টি। তার মানে থানা পুলিশ মামলা দূরের কথা জিডিও নিতো না। আমি চোখে দেখছি যে র্যাব নিয়ে গেছে, কিন্তু জিডিতে উল্লেখ করা যেতো না। বলা হতো নিখোঁজ হয়েছে। তিনি বলেন, বাহিনীগুলোর মধ্যে কী এমন পরিবর্তন হয়েছে যে নতুন আইনে তাদের অপরাধের তদন্তভার তাদেরকেই দেয়া হচ্ছে। এটা সম্ভব যে চুয়াডাঙ্গা থানার এসআই ডিজিএফআইর মেজর জেনারেলকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। তিনি বলেন, একটা জিনিস লিখে দিলেই তো আইন হয়ে গেল না। বাস্তবের সাথে মিল থাকতে হবে। তিনি বলেন, আমার তদন্তকালীন সময়ে তিন বাহিনীর ১০ থেকে ৩০ জন ব্যক্তি গুমের সাথে জড়িত থাকতে পারে। এখন এই ৩০ জনকে দায়মুক্তি দেয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ নাকি ১৬০০ ব্যক্তিকে গুম করা হয়েছে সেটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, গুম ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার দ্রুত সম্পন্ন না হলে দেশে আবারো ভয় ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি ফিরে আসবে। তিনি অভিযোগ করেন, গুমের ভয়াবহতাকে অস্বীকার করে পাল্টা ন্যারেটিভ তৈরির চেষ্টা চলছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা তিনটি গুমের মামলায় প্রধানদের শনাক্ত করে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করেছে। সেই বিচারপ্রক্রিয়া এই মুহূর্তে অনেকটা স্তব্ধ। ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখতে না চাইলে তাহলে ট্রাইব্যুনালে বিচার কাজ চলমান আছে সেগুলো পূর্ণগতি ও শক্তিতে চালাতে হবে। এই ঘটনার সাথে জড়িত দানবগুলোর বিচার সম্পন্ন করতে না পারি তাহলে এই জাতীয় সেমিনার করে কোনো লাভ হবে না। শেখ হাসিনা যে ভয়ের রেজিম তৈরি করে রেখে গিয়েছিল আবার সেই ভয়ের মধ্যে ডুবতে হবে। গুমের বিচার না করে যতই আইন করা হোক কোনো আইনই বাংলাদেশে গুমের ধারা বন্ধ হবে না। সুতরাং যে বিচার চলমান আছ্ েতা যথাযথভাবে শেষ করতে হবে।
ব্রিগেডিয়ার (অব:) আমান আযমী বলেন, দেশে আইন সঠিকভাবে নেই, আইনের প্রয়োগও নেই। আশ্বাস দেয়া হচ্ছে কমিটি গঠন করা হচ্ছে কিন্তু কোনো বিচার হচ্ছে না। ৫ আগস্টের পরে একবুক আশা ছিল অনেক কিছু হবে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সবই যেন মিথ্যা। তিনি বলেন, কোনো সভ্য সরকারকে গুমকে প্রশ্রয় দিতে পারে না। গুমের শিকার প্রতিটি মানুষ যে যন্ত্রণা ভোগ করছে তা আমি জানি। আমার মা, স্ত্রী নিজেদের গয়না বিক্রি করে সংসার চালিয়েছেন। ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে পারেননি। বলা হয়েছে অ্যাকাউন্ট হোল্ডারের মৃত্যুসনদ লাগবে। কিন্তু মৃত্যুসনদ তারা কিভাবে দিবে। আযমী বলেন, সংবিধান সংশোধন করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করে গুমের বিচারসহ সব বিচার করা প্রয়োজন।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) হাসিনুর রহমান বলেন, ফ্যাসিস্ট গেছে কিন্তু তাদের সব দোসর রয়ে গেছে। তিন বাহিনীর প্রধানদের নির্দেশনায় জুলাই আন্দোলনে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়েছে। অথচ তারা বহাল অবস্থায় রয়েছেন। এখনো সেসব আমলাই ফাইল তৈরি করে দিচ্ছে সরকারকে। গুমের সাথে জড়িত সেই জিয়াউল আহসান রাজার বেশে রয়েছে। তিনি শহীদ আবু সাঈদের কাছে শুকরিয়া জানিয়ে বলেন, আপনাদের কাছে আজ জীবিত অবস্থায় এখানে আসতে পেরেছি। কিন্তু আন্দোলন ঠিকমতো কাজে আসেনি। বিএনপিকে উদ্দেশ করে বলেন, বিগত বছরগুলোতে আপনারাও মজলুম ছিলেন। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর বুঝতে পারছি আপনাদের উদ্দেশ্য অসৎ। তা না হলে সরকারি লোকদের বিরুদ্ধে তদন্ত করা যাবে না এটা বলতে পারতেন না। বিডিআর এর ৫৭ জনকে মেরে ফেললো সে ব্যাপারে কী করছে সরকার। তিনি বলেন, সরকার যদি ভারতের হয়ে কাজ করে সেটা মেনে নেয়া হবে না।



