আইইআরবির সেমিনারে বক্তারা

মুদ্রাস্ফীতি ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তায় চাপে দেশের অর্থনীতি

সরকারি ঋণ ২৪ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে; যা আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য অশনিসংকেত

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

উচ্চ মূল্যস্ফীতির কশাঘাত, ক্রমবর্ধমান ঋণ পরিশোধের চাপ এবং বৈশ্বিক অস্থিরতা- সবমিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক গভীর ও জটিল সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। এক দিকে বিগত বছরগুলোর প্রবৃদ্ধি ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন ধরে রাখার তাগিদ, অন্য দিকে সামষ্টিক অর্থনীতির এই বহুমুখী চাপ- এ দুইয়ের মাঝে বিদায়ী ২০২৫-২৬ এবং আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছর দেশের জন্য এক বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, সময়োপযোগী নীতি সমন্বয়, কঠোর বাজেট শৃঙ্খলা এবং বাস্তবভিত্তিক সংস্কার ছাড়া এই চাপ সামাল দিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

গতকাল ইসলামিক ইকোনমিক রিসার্চ ব্যুরো (আইইআরবি) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট : ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনীতির সন্ধানে’ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। আইইআরবির কনফারেন্স রুমে সংগঠনের ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক আলী আক্কাসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সংসদ সদস্য প্রফেসর ড. ইলিয়াস মোল্লা। মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আইইআরবির সেক্রেটারি জেনারেল ড. মুহাম্মদ মিজানুর রহমান। আলোচনায় আরো অংশ নেন এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ এবং ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদ উদ্দিন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের নামমাত্র জিডিপি প্রায় ৪৬০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও প্রবৃদ্ধি কমে ৪.৭ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সময়ে মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ৮.৯ শতাংশ, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় চাপ সৃষ্টি করছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০.৯ বিলিয়ন ডলারে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক অস্থিরতা। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সঙ্ঘাত জ্বালানি ও খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়িয়ে দেয়ায় আমদানি ব্যয় এবং বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ১১১.৬ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি বড় চাপ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সরবরাহ চেইন ব্যাহত হলে আমদানি-রফতানি কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং প্রবৃদ্ধি আরো কমার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি প্রবাসী শ্রমবাজার ঝুঁকিতে পড়ায় রেমিট্যান্স প্রবাহেও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধে ড. মুহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, তারল্য সঙ্কট এবং দুর্বল শাসনব্যবস্থা অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি। একই সাথে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি ও ব্যয় বৃদ্ধি বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। তিনি বিদ্যুৎ খাতের কুইক রেন্টাল প্রকল্পের সমালোচনা করে বলেন, ২০০৯ সাল থেকে এই খাতে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ এক লাখ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে। বর্তমানে উৎপাদন সক্ষমতার একটি বড় অংশ অব্যবহৃত থাকায় এই আর্থিক বোঝা আরো দীর্ঘমেয়াদি হচ্ছে।

বিগত ছয় অর্থবছরের বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরের ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা থেকে বাজেট বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৮ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। কিন্তু উন্নয়ন ব্যয়ের বাস্তবায়ন হার প্রত্যাশিত নয়। বাজেটে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে বরাদ্দ প্রায় ১২ শতাংশ হলেও স্বাস্থ্য খাতে তা মাত্র ৫ শতাংশের কাছাকাছি এবং কৃষি খাতেও তুলনামূলক কম, যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ বলেন, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি ও বাজেট শৃঙ্খলা সবচেয়ে জরুরি। তবে নীতিগত সুদের হার ১০ শতাংশে থাকায় বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্প খাতের সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি বাজারে সিন্ডিকেট ও মূল্য কারসাজি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান। রাজস্ব খাতের দুর্বলতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত ১১-১২ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য থাকলেও, বর্তমানে প্রায় ৯০ লাখ টিআইএনধারীর বিপরীতে মাত্র ৩৩ লাখ করদাতা রিটার্ন জমা দেন। এই ফাঁকি রোধে ডিজিটাল করব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং হুন্ডি ভেঙে বৈধ পথে (যেমন- এমএফএস) রেমিট্যান্স বাড়াতে প্রণোদনা জরুরি।

ইসলামী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদ উদ্দিন বলেন, ভ্যাট কাঠামো সরলীকরণ, কাস্টমস আধুনিকায়ন এবং উন্নয়ন প্রকল্পে কর অব্যাহতি কমানো হলে রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। অপ্রদর্শিত অর্থ বারবার বৈধ করার সুযোগ সৎ করদাতাদের নিরুৎসাহিত করছে উল্লেখ করে তিনি এ নীতি পুনর্বিবেচনার দাবি জানান। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং অস্বচ্ছ চুক্তিতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর তিনি জোর দেন।

সরকারি ঋণের পরিমাণও দ্রুত বাড়ছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে মোট ঋণ ১৫ লাখ ৬৯৭ হাজার কোটি টাকা থাকলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৪ লাখ ৩৮৮ হাজার কোটি টাকায়, যার প্রায় ৩৮ শতাংশ বৈদেশিক ঋণ। ঋণ-জিডিপি অনুপাত ৩৮.৫ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ভবিষ্যতে আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ফলে ঋণের সুদ পরিশোধে বরাদ্দ ক্রমাগত বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এক লাখ ১০ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা মোট বাজেটের বিশাল অংশ।

এলডিসি উত্তরণের পর ইইউ ও যুক্তরাজ্যের বাণিজ্য সুবিধা কমে আসায় ভিয়েতনাম, ভারত ও কম্বোডিয়ার মতো দেশের সাথে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা তীব্র হবে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভারতের অর্থনীতি ৪.১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এবং ৬৯০ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ ধরে রেখেছে। ভিয়েতনাম ৫.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি কম মুদ্রাস্ফীতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। থাইল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিও স্থিতিশীলতার দিকে এগোচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবও সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি সংসদ সদস্য প্রফেসর ড. ইলিয়াস মোল্লা বলেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ অপরিহার্য, যার জন্য সরকার নানা কর্মসূচি নিয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সুশাসন প্রতিষ্ঠিত করতে জবাবদিহিতা অপরিহার্য; যে দেশে জবাবদিহিতা যত বেশি, সে দেশ তত বেশি উন্নত।

পরিশেষে অর্থনীতিবিদরা মত দেন, বাংলাদেশ অর্থনীতি সম্ভাবনাময় হলেও সামনে বড় ধরনের নীতিগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সঠিক ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত এবং দক্ষ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে না পারলে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও বৈদেশিক অনিশ্চয়তা অর্থনীতিকে আরো কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলে দেবে।