চট্টগ্রাম-১১ আসনে নির্ভার আমীর খসরু আত্মবিশ্বাসী শফিউল আলমও

Printed Edition
চট্টগ্রাম-১১ আসনে নির্ভার আমীর খসরু আত্মবিশ্বাসী শফিউল আলমও
চট্টগ্রাম-১১ আসনে নির্ভার আমীর খসরু আত্মবিশ্বাসী শফিউল আলমও

বিশেষ সংবাদদাতা, চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম-১১ সংসদীয় আসনটি শুধু চট্টগ্রাম নয়, সারা দেশের অর্থনীতিরও প্রাণকেন্দ্র এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় (কেপিআই) ঠাসা। আসনটিতে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী যেমনি জয়ের ব্যাপারে নির্ভার, তেমনি জামায়াতের প্রার্থী শফিউল আলমও জয়ের ব্যাপারে পূর্ণ আত্মবিশ্বাসী। ফলে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস মিলছে এক সময়কার রাজনৈতিক মিত্র বিএনপির ধানের শীষ ও জামায়াতের দাঁড়িপাল্লার মধ্যে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ২৭ থেকে ৩০ নম্বর এবং ৩৬ থেকে ৪১ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে চট্টগ্রাম-১১ সংসদীয় আসন। পতেঙ্গা, বন্দর, সদরঘাট ও ইপিজেড থানা এবং ডবলমুরিং থানার একাংশ নিয়ে গঠিত এই আসন। এখানে রয়েছে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, দু’টি বৃহৎ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল, বিমানবন্দর, নৌ ও বিমানঘাঁটি, দেশের একমাত্র তেল শোধনাগার, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা অয়েল কোম্পানিসহ জাতীয় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা (কেপিআই)।

এই আসনে মোট ভোটার চার লাখ ৯৫ হাজার ২৭৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার দুই লাখ ৫২ হাজার ৩৩৩ জন এবং নারী ভোটার দুই লাখ ৪২ হাজার ৯৪২ জন। ভোটারদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ স্থানীয় এবং বাকিরা চাকরির সুবাদে সেখানে বসবাস করেন। ফলে ভোটের হিসাবে রয়েছে নানা সমীকরণ। স্থানীয়দের ভাবনা এক ধরনের আবার চাকরির সুবাদে বসবাসকারীদের ভাবনা ভিন্ন।

আসনটিতে ধানের শীষের প্রার্থী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ১৯৯১ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত টানা এমপি ছিলেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর মাঝে প্রায় ১৬ বছর বিচ্ছিন্নতা এবং এমপি থাকাকালীন প্রদত্ত অঙ্গীকার বাস্তবায়নের হিসাব মিলাচ্ছেন এখন ভোটাররা বিশেষ করে স্থানীয়রা। আসনটির নানা স্থানে ২০২৪ এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তীতে বিএনপির পরিচয়ে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজি, দখলবাজির ঘটনাও ঘটেছে। ফলে নির্বাচনে এসব সামনে নিয়ে আসছেন ভোটাররা। এর নিশ্চিত প্রভাব ভোটে থাকবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

১৯৯১ এই আসন থেকে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এমপি নির্বাচিত হন। জামায়াতের নিঃশর্ত সমর্থনে সেবার বিএনপি সরকার গঠনের পর আসনটি বেগম খালেদা জিয়া ছেড়ে দিলে উপ নির্বাচনে এমপি হন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এরপর ১৯৯৬ সালে এবং ২০০১ সালেও তিনি আসনটি থেকে এমপি নির্বাচিত হন। আর ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এম এ লতিফ আসনটিতে থেকে এমপি নির্বাচিত হন। এর মধ্যে খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় মেয়াদে বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। কিন্তু ঢাকায় তাইওয়ানের কনস্যুলেট অফিস স্থাপনকে কেন্দ্র করে চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কে টানাপড়েন সৃষ্টি হলে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে মন্ত্রিসভা থেকে ছিটকে পড়তে হয়।

এবারের নির্বাচনেও আমীর খসরু অতীতের ন্যায় ফলাফল করবেন এমনটিই ধারণা তার ঘনিষ্ঠজনদের। কিন্তু ভোটারদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে- বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা নিয়ে খোদ বেগম খালেদা জিয়ার সাথে বিএনপি নেতা গোলাম আকবর খোন্দকারের একটি টেলিফোন সংলাপে আমীর খসরু সম্পর্কে খালেদা জিয়ার নেতিবাচক বক্তব্য বেকায়দায় ফেলেছে এই হেভিওয়েট প্রার্থীকে। তা ছাড়া নিজে ১১ আসনটি ছেড়ে চট্টগ্রাম ১০ আসনে মনোনয়ন নেয়া এবং ১১ আসনে নিজের ছেলেকে প্রার্থী করতে চাওয়ার ঘটনাও খোদ দলের অভ্যন্তরে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে। বিষয়টি ভোটারদের মাঝেও প্রভাব ফেলছে বলে স্থানীয়দের সাথে আলাপ করে জানা গেছে। তবে দীর্ঘ ১৫ বছর একই আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হওয়া এবং মন্ত্রী পরিষদে স্থান পাওয়ার সুবিধা আছে বিএনপির এই অন্যতম শীর্ষ নেতার।

স্থানীয়দের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, আসনটিতে জামায়াতের প্রার্থী শফিউল আলম জাতীয় নির্বাচনে নবীন হলেও স্থানীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের অর্থ স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি ফ্যাসিবাদী শাসনামলে ছিলেন মামলা-হামলায় জর্জরিত এবং দীর্ঘদিন কারান্তরীন। কাউন্সিলর থাকাকালে সময়ে তার বিরুদ্ধে নেতিবাচক কোনো অভিযোগ না থাকা এবং তিনি চট্টগ্রাম-১১ আসনটির স্থানীয় বাসিন্দা হওয়ার কিছু বাড়তি সুবিধা পাচ্ছেন কোনো কোনো ক্ষেত্রে। হিন্দু ও জেলে সম্প্রদায়সহ সমাজের পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর সাথে দীর্ঘদিন ধরেই তার সম্পর্ক। তাদের সুখে-দুঃখে কাছে থাকার একটা সুবিধাও তিনি পাচ্ছেন বলে জানা গেছে।

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী নির্বাচনের সামগ্রিক পরিবেশ নিয়ে নয়া দিগন্তকে বলেন, নির্বাচনের পরিবেশ তো মোটামুটি ভালোই আছে। মানুষ উৎসাহী, ভোট দিতে উন্মুখ হয়ে আছে। অনেক দিন তো ভোট দিতে পারে নাই। মানুষ ভোট দিতে চাচ্ছে। এ রকম সময়ে সবসময় বিএনপির ওপর আস্থা রেখেছে মানুষ। বাংলাদেশ যখনই ক্রান্তিলগ্নে পড়েছে সব সময় তো বিএনপির ওপরই আস্থা রেখেছে। বিএনপির আপসহীন গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের লড়াই ও বাংলাদেশের উন্নয়নে বিএনপির যে রেকর্ড তা হলো জনগণের আস্থা। তিনি বলেন, জনগণের উপর আস্থা ছাড়া বিএনপির তো আর কোনো রাজনীতি নাই।

জামায়াত প্রার্থী শফিউল আলম বলেন, ফেয়ার নির্বাচন হলে আাল্লাহর রহমতে জয়ের ব্যাপারে আমি আত্মবিশ্বাসী। বিগত ১৬ মাসে ব্যাপক চাঁদাবাজিতে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর দলটির প্রতি ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে মানুষ একেবারেই বিরক্ত। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক হাব চট্টগ্রাম ১১ আসন কেন্দ্রিক। শত শত শিপিং এজেন্সি এবং দু’টি ইপিজেড কেন্দ্রিক প্রচুর ব্যবসা বাণিজ্য এখানে চলে। চাঁদাবাজি এবং বিগত সরকার সমর্থকদের বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখলের সাথে দলটির লোকজন জড়িত। যেহেতু ওনার অনুসারীরাই চট্টগ্রাম ১১ আসন নিয়ন্ত্রণ করে তাদের ব্যাপক চাঁদাবাজির খেসারত নিশ্চয়ই ভোটের মাঠে দিতে হবে।