সরকারি চাকরির কঠোর বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে কৃষি মন্ত্রণালয়ভুক্ত বিভিন্ন দফতর ও সংস্থার একশ্রেণীর কর্মকর্তা জড়িয়ে পড়ছেন আবাসন ব্যবসায়- এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কেউ নিজের নামে কোম্পানি খুলে, আবার কেউ স্ত্রী-স্বজন কিংবা গ্রুপভিত্তিক অংশীদারির আড়ালে জমি কিনে ফ্ল্যাট নির্মাণ ও বিক্রির ব্যবসা করছেন। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা ও গ্রেফতারের ঘটনায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সরকারি চাকরিতে থেকে আবাসন কোম্পানির চেয়ারম্যান বনে যাওয়া ব্রির উপপরিচালক (অর্থ) মো: গোলাম রশিদ এখন কারাগারে। বগুড়া থেকে নির্বাচিত বিএনপি দলীয় এক এমপির স্ত্রীর ফ্ল্যাট বিক্রির নামে এক কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় তাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি শুধু একজন কর্মকর্তার বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; কৃষি খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সরকারি চাকরির আড়ালে আবাসন ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।
জানা গেছে, ব্রির উপপরিচালক (অর্থ) হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মো: গোলাম রশিদ দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীতে আবাসন ব্যবসার সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি ‘এএক্সপি হোল্ডিংস লিমিটেডে’র চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। অথচ সরকারি চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী কোনো লাভজনক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান, পরিচালক বা ব্যবস্থাপনায় যুক্ত হতে পারেন না। সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করেই তিনি এই ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিলেন।
মামলার বিবরণে জানা যায়, বগুড়া-৪ আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য মোশাররফ হোসেনের স্ত্রী মোছা: সাবিহা সুলতানার কাছ থেকে রাজধানীর উত্তর ধানমন্ডি এলাকায় ১৫৫০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট ও কার পার্কিং বিক্রির নামে এক কোটি টাকা নেয়া হয়। ২০২৩ সালের ৩০ ও ৩১ আগস্ট রেজিস্ট্রিকৃত বায়নাপত্রের মাধ্যমে মোট এক কোটি ২০ লাখ টাকার চুক্তি হয় এবং এর মধ্যে এক কোটি টাকা পরিশোধ করেন সাবিহা সুলতানা। চুক্তি অনুযায়ী, বাকি ২০ লাখ টাকা তিন বছরের মধ্যে পরিশোধ করে ফ্ল্যাটের রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, পরে একই ফ্ল্যাট অন্য দুই ব্যক্তির কাছেও বিক্রি করা হয়। বিষয়টি জানতে পেরে ভুক্তভোগী গত ৭ মার্চ টাকা ফেরত চাইলে আসামিরা তা দিতে অস্বীকৃতি জানান। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, এ সময় তাকে গালিগালাজ, প্রাণনাশের হুমকি এবং মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর ভয়ও দেখানো হয়।
কলাবাগান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফজলে আশিক জানান, আদালতের জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানার ভিত্তিতে গত শনিবার দিবাগত রাতে উত্তর ধানমন্ডির বাসা থেকে মো: গোলাম রশিদকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। মামলায় অপর আসামি করা হয়েছে এএক্সপি হোল্ডিংস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো: আসাদুজ্জামানকে।
ব্রি সূত্র জানিয়েছে, মো: গোলাম রশিদ নিয়মিত অফিস করতেন না। সংস্থার উচ্চপর্যায়ের কিছু কর্মকর্তাকে ‘ম্যানেজ’ করে দিনের পর দিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ব্রির প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কয়েকজন ঠিকাদার ও কর্মকর্তার কাছ থেকেও তিনি টাকা নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেয়ার আশ্বাস দিয়ে বিভিন্নভাবে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, শুধু ব্রি নয়; কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর (ডিএই), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি), বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অনেক কর্মকর্তা ব্যক্তি বা গ্রুপভিত্তিক আবাসন ব্যবসায় যুক্ত রয়েছেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কয়েকজন কর্মকর্তা মিলে জমি কিনে সেখানে ফ্ল্যাট নির্মাণ করেন এবং পরে বিভিন্ন ক্রেতার কাছে ইউনিট বা শেয়ার বিক্রি করেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্ত্রী বা আত্মীয়ের নামে ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে।
ব্যক্তিগত পর্যায়ে জমি কিনে ফ্ল্যাট তৈরি করে শেয়ার বিক্রির সাথে জড়িত একজন কর্মকর্তা বলেন, আমরা ব্যক্তিগতভাবে আত্মীয়স্বজন মিলে জমি কিনে ফ্ল্যাট নির্মাণ করে তারপর অতিরিক্ত শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছি। এটা তো ব্যবসা নয়। আমাদের তো কোম্পানি নেই।
সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কয়েকজন মিলে জমি কিনে ফ্ল্যাট নির্মাণ করে শেয়ার বিক্রি করা এখন অনেকের কাছে ‘অতিরিক্ত আয়ের উৎস’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ সরাসরি কোম্পানি খুলছেন, আবার কেউ অনানুষ্ঠানিক গ্রুপ গড়ে ব্যবসা করছেন। তিনি দাবি করেন, এটিকে অনেকে ‘ব্যক্তিগত বিনিয়োগ’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করলেও বাস্তবে তা বাণিজ্যিক আবাসন কার্যক্রমের পর্যায়েই পড়ে।



