শর্ত পূরণ ছাড়া সহায়তা নয়

জ্বালানির দাম সমন্বয়, করছাড় রদ, ভ্যাটের অভিন্ন হার দ্রুত চায় আইএমএফ

সৈয়দ সামসুজ্জামান নীপু
Printed Edition
শর্ত পূরণ ছাড়া সহায়তা নয়
শর্ত পূরণ ছাড়া সহায়তা নয়

শর্ত পূরণ করতে না পারলে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে বাড়তি সহায়তা প্রাপ্তি অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। আইএমএফ’র পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেয়া হয়েছে, বাংলাদেশ যদি সংস্থাটির কাছ থেকে বর্ধিত সহায়তা আশা করে তবে সেক্ষেত্রে তাকে বেশ কয়েকটি শর্ত পূরণ করতে হবে। এই শর্তের মধ্যে রয়েছে, জ¦ালানি দামের সমন্বয় (বৃদ্ধি), প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ছাড়া সব ক্ষেত্রে ভর্তুকি প্রত্যাহার, কর ছাড় রদ এবং ভ্যাটের অভিন্ন হারের প্রবর্তন।

আইএমএফ’র পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এসব বিষয়ে দ্রুত দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না হলে বাংলাদেশকে বাড়তি সহায়তা দেয়ার বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। শুধু তাই নয়, শর্ত পূরণ না হলে চলমান ঋণ কর্মসূচির আওতায় পরবর্তী কিস্তিও জুন মাসে ছাড় করা হবে না।

বিশ^ব্যাংক-আইএমএফ’র বসন্তকালীন বৈঠকে যোগ দিতে বর্তমান অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে ১১ সদস্যের এক বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল বর্তমানে ওয়াশিংটনে অবস্থান করছেন। সেখানে তারা বৈঠকে পাশাপাশি সাইডলাইনে বিশ^ব্যাংক ও আইএমএফ’র কর্মকর্তাদের সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করছেন। সেই বৈঠকে আইএমএফ’র পক্ষ থেকে এই বিষয়গুলো জানানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

বৈঠকের বিষয়ে উল্লেখ করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে চলমান অর্থনীতি ও জ¦ালানি সঙ্কট মোকাবেলায় বাংলাদেশকে যেন অন্ততপক্ষে ১০০ কোটি ডলার বাড়তি সহায়তা দেয়া হয় তার আর্জি জানানো হয়। এই অর্থ বাজেট সহায়তা হিসেবে জুনের আগেই দেয়ার জন্য আবেদন করা হয়। কিন্তু আইএমএফ’র পক্ষ থেকে চলমান সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করা হয়। বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্য সঙ্কট মোকাবেলায় বিশে^র বিভিন্ন দেশে জ¦ালানি সামগ্রির দাম সমন্বয় করা হলেও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তা করা হয়নি। কিন্তু চলমান ঋণ কর্মসূচি শর্ত মোতাবেক প্রতি মাসেই জ¦ালানির দাম সমন্বয়ের কথা রয়েছে। দাম সমন্বয় না করার কারণে এরই মধ্যে ভর্তুকির পরিমাণ অনেক বেড়ে গেছে। যা দেশটির সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করছে।

তিনি বলেন, চলমান ঋণচুক্তির দুটি শর্ত বাস্তবায়নের পক্ষে কঠোর অবস্থান নিয়েছে আইএমএফ। শর্ত দুটি হলো- সব ধরনের কর-ছাড় সুবিধা বাতিল করে ট্যারিফ যৌক্তিকীকরণ এবং গ্যাস-বিদ্যুৎসহ জ্বালানিতে ভর্তুকি প্রত্যাহার করে নিম্ন আয়ের মানুষকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনা। এই দুটি শর্ত বাস্তবায়ন করলে চলতি অর্থবছরের মধ্যেই ঋণ ছাড় করা হতে পারে মর্মে আশ^াস দেয়া হয়েছে।

তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উল্লেখ করা হয়, বর্তমান সরকার দুই মাসের মতো সময় দায়িত্বে রয়েছে। এই স্বল্প সময়ে তাদের পক্ষে বিদ্যুৎ ও তেলের দাম সমন্বয় করা বেশ কষ্টকর। কারণ এরই মধ্যে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমতে শুরু করলেও তা আট শতাংশের ওপরে রয়েছে। এই সময়ে যদি জ¦ালানি দাম বাড়ানো হয় তবে মূল্যস্ফীতিকে আরো উসকে দেয়া হবে। এতে করে বাড়বে জনভোগান্তি। তাই জ¦ালানি দাম কিছুটা ধীরে সমন্বয় করা হবে।

এদিকে উন্নয়নশীল ও নিম্ন আয়ের দেশগুলোর জন্য আইএমএফ এরই মধ্যে ৫০ বিলিয়ন ডলার এবং বিশ্বব্যাংক ২৫ বিলিয়ন ডলারের জরুরি সহায়তা তহবিল ঘোষণা করেছে। মূলত এই তহবিল থেকেই বাংলাদেশ বাড়তি সহায়তা চেয়েছে।

উল্লেখ্য, আইএমএফের সাথে বাংলাদেশের ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ কর্মসূচি শুরু হয় ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গত বছরের জুনে ৮০ কোটি ডলার বেড়ে ঋণ কর্মসূচির আকার ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়। আইএমএফ থেকে এখন পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে বাংলাদেশ পেয়েছে ৩৬৪ কোটি ডলারের ঋণসহায়তা। বাকি আছে ১৮৬ কোটি ডলার। গত ডিসেম্বরে ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ পাওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা পাওয়া যায়নি। আইএমএফ’র পক্ষ থেকে তখন বলা হয়, নির্বাচিত সরকারের সাথে আলোচনা করে তারা ঋণের পরবর্তী কিস্তি ছাড় করবে। বর্তমান সরকারের অর্থমন্ত্রী এর আগে বলেছেন, আগামী জুনে তারা ঋণের ষষ্ঠ ও সপ্তম কিস্তি একবারে ছাড় করতে পারে।