সংসদে নিজেদের সক্রিয় উপস্থিতি নিশ্চিত করতে প্রস্তুতি সবার

Printed Edition

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আবারো শুরু হতে যাচ্ছে জাতীয় সংসদের নতুন অধিবেশন। এই অধিবেশনকে কেন্দ্র করে নিজেদের সক্রিয় উপস্থিতি নিশ্চিত করতে জোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকারি দল ও বিরোধী দল। ইতোমধ্যে উভয়পক্ষই তাদের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের জন্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করেছে। এবারের সংসদের অধিকাংশ সদস্যই নতুন হওয়ায় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সবাই সংসদে নিজেদের সক্ষমতা ও উপস্থিতি তুলে ধরতে চান।

সংসদে সম্ভাব্য তর্ক-বিতর্ক ও রাজনৈতিক মোকাবেলার প্রস্তুতিও নিচ্ছে বিভিন্ন দল। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি- সব দলই নিজেদের সংসদ সদস্যদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষ করেছে বলে জানা গেছে। আগামী ১২ মার্চ শুরু হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। সেই অধিবেশনেই মূলত বোঝা যাবে, নতুন সংসদ সদস্যদের এই প্রস্তুতি সংসদের বিতর্ক ও আলোচনায় কতটা প্রতিফলিত হয়। বিশ্লেষকদের মতে, সংসদ যদি সত্যিকার অর্থে নীতিনির্ধারণ ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে, তবে এ ধরনের প্রশিক্ষণ উদ্যোগ অবশ্যই ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

অধিবেশন আহ্বান ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া : সূত্র জানায়, গত ২৩ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের গণসংযোগ অধিশাখা থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে যে ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হবে ১২ মার্চ।

সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি এই অধিবেশন আহ্বান করেছেন। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিন ১২ মার্চ সকাল ১১টায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম (২০২৬ সালের প্রথম) অধিবেশন আহ্বান করেছেন। সংসদীয় প্রথা অনুযায়ী নতুন সংসদের প্রথম দিনেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করতে হয়। এই নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর নবনির্বাচিত স্পিকারের সভাপতিত্বে ত্রয়োদশ সংসদের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হবে।

অধিবেশনের শুরুতেই রাষ্ট্রপতি সংসদে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেবেন। সেখানে বর্তমান সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, প্রশাসনিক পরিকল্পনা এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক কর্মসূচির সার্বিক দিকনির্দেশনা তুলে ধরা হবে।

সংসদকে প্রাণবন্ত করতে প্রস্তুতি : সংসদকে প্রাণবন্ত করতে জোর তৎপরতা শুরু করেছে সরকারি দল বিএনপি এবং বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। অধিবেশনের শুরু থেকেই সম্ভাব্য বাকযুদ্ধ মোকাবেলার জন্য উভয়পক্ষই তাদের সংসদ সদস্যদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছে।

শপথ গ্রহণ ও বিরোধীদলীয় নেতৃত্ব নির্ধারণের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর জাতীয় সংসদে নিজেদের সক্রিয় উপস্থিতি নিশ্চিত করতে প্রস্তুতি শুরু করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সংসদীয় কার্যপ্রণালী, বিল ও বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়া এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাজ সম্পর্কে ধারণা দিতে দলটি দুই দিনব্যাপী একটি বিশেষ কর্মশালার আয়োজন করে।

জামায়াত সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে তারা একটি দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক বিরোধী দল হিসেবে ভূমিকা রাখতে চায়। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ইতিবাচক রাজনীতি চর্চা, সরকারের যৌক্তিক উদ্যোগকে সমর্থন এবং জনস্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্তের বিরোধিতা- এই তিনটি বিষয়কে সামনে রেখে সংসদে কাজ করার পরিকল্পনা করেছে দলটি। দলটির আমির ডা: শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে সংসদ সদস্যরা সংসদীয় কার্যপ্রণালী ও সংবিধান বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণও নিয়েছেন। বর্তমানে ৭৭ জন সংসদ সদস্য নিয়ে গঠিত হয়েছে বিরোধী দল।

জামায়াত নেতৃত্ব মনে করছে, দীর্ঘ দিনের নেতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে এবার সংসদে একটি আদর্শ বিরোধী দলের ভূমিকা রাখা সম্ভব। আগের মতো অযৌক্তিক বিরোধিতা না করে ভালো কাজের ক্ষেত্রে সহযোগিতা এবং ভুল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংসদ ও রাজপথ- দুই জায়গাতেই প্রতিবাদ গড়ে তোলার প্রস্তুতি রয়েছে তাদের।

বিরোধীদলীয় নেতার অবস্থান : গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেয়ার পরপরই বিরোধী দল হিসেবে ভূমিকা পালনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান। সেদিন এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, ‘দেশ ও জনগণের কল্যাণে সরকার যদি কোনো উদ্যোগ নেয়, আমরা অবশ্যই তা সমর্থন করব। কিন্তু দেশের স্বার্থবিরোধী কিছু দেখলে জনগণের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেবো।’

সম্প্রতি একদলীয় ইফতার মাহফিলে তিনি আরো বলেন, ‘আমরা গতানুগতিক কোনো বিরোধী দল হিসেবে সংসদে কাজ করতে চাই না। সংসদকে আমরা জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখতে চাই।’

সরকারি দলের কর্মশালা : অন্য দিকে সরকারি দল বিএনপি তাদের সংসদ সদস্যদের জন্য দুই দিনব্যাপী কর্মশালার আয়োজন করেছে। গত শুক্রবার শুরু হওয়া এই কর্মশালা শনিবার শেষ হয়।

গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই কর্মশালায় নতুন সংসদ সদস্যদের সংসদীয় কার্যপ্রণালী, বাজেট বিশ্লেষণ, কমিটির কার্যক্রম এবং সংসদে কার্যকরভাবে অংশগ্রহণের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে ধারণা দেয়া হয়।

কর্মশালায় বিশেষভাবে আলোচনা করা হয়- সংসদের আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া; সংসদীয় কমিটির ভূমিকা; বিরোধীদের সাথে বিতর্ক মোকাবেলার কৌশল এবং সংসদকে সক্রিয় রাখার দায়িত্ব। কর্মশালার দ্বিতীয় দিনের উদ্বোধন করেন দলের মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এতে স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ আজম খান, সিনিয়র নেতা ওসমান ফারুকসহ দলের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

নতুন সংসদ সদস্যদের প্রস্তুতি : নতুন সংসদ সদস্যদের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন বলেন, ‘যারা নতুন সংসদ সদস্য, তারা নতুনভাবে যাত্রা শুরু করবেন। তাদের মধ্যে যদি কোনো নেতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতি না থাকে, তাহলে তারা ভালো শিক্ষা নিতে পারবেন।’ তিনি বলেন, ‘একটি শিশু জন্মের পর যেমন নতুন সংস্কৃতি শেখে, ঠিক তেমনি নতুন সংসদ সদস্যদেরও একটি ইতিবাচক সংসদীয় সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত করে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে।’

এনসিপির অবস্থান : অন্য দিকে সংসদের প্রথম অধিবেশনকে সামনে রেখে প্রস্তুতি নিয়েছে এনসিপি। দলটির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব জানিয়েছেন, প্রথম অধিবেশন শুরু হওয়ার আগে নিয়োগপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি অপসারণ না হলে তারা সংসদে বিষয়টি উত্থাপন করবে এবং অভিশংসনের দাবি তুলবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে প্রতিটি নতুন সংসদ কেবল একটি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা নয়; বরং এটি নতুন প্রত্যাশা, নতুন বিতর্ক এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা করে। বিশ্বের অনেক গণতান্ত্রিক দেশে নতুন সংসদ সদস্যদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি রয়েছে। এসব কর্মসূচিতে সংসদীয় বিধি, আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া, বাজেট বিশ্লেষণ এবং কমিটি ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংসদ সদস্য হওয়া মানে শুধু জনপ্রিয়তা নয়; বরং আইন প্রণয়ন, নীতিনির্ধারণ, বাজেট বিশ্লেষণ এবং সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও এর সাথে জড়িত।

নতুন মুখের সংসদ : জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে বিএনপি থেকে ২০৯ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই প্রথমবারের মতো সংসদে এসেছেন। একইভাবে জামায়াত ও এনসিপির বেশির ভাগ সদস্যও নতুন। এই বাস্তবতায় সংসদীয় কার্যপ্রণালী সম্পর্কে ধারণা দেয়া এবং নতুন সাংসদদের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য কর্মশালাগুলো গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

সংসদে সম্ভাব্য উত্তপ্ত বিতর্ক : জানা গেছে, প্রথম দিন থেকেই সরকারকে কীভাবে চাপে রাখা যায়, সে প্রস্তুতি নিয়েছে বিরোধী দলগুলো। বিশেষ করে যেসব ইস্যু সামনে আসতে পারে সেগুলো হলো- আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ, জুলাই সনদ ও গণভোট এবং সুশাসনের প্রশ্ন।

বিশ্লেষকদের মতে, বিরোধী দল যদি ঐক্যবদ্ধভাবে এসব ইস্যু সংসদে তুলে ধরে, তবে তা সরকারের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তেও প্রভাব ফেলতে পারে।

সংসদকে কার্যকর করার চ্যালেঞ্জ : রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, নতুন প্রজন্মের সংসদ সদস্যদের উপস্থিতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিবর্তনের একটি ইঙ্গিত। তারা নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও নতুন রাজনৈতিক ভাষা নিয়ে আসতে পারেন। তবে সংসদের কার্যকারিতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে রাজনৈতিক সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ওপর।

সরকারের অবস্থান : এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, ‘যৌক্তিক দাবি ও ইস্যুতে বিরোধী দল সমালোচনা করবে এবং সরকারকে চাপে রাখবে- এটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। সংসদকে কার্যকর রাখতে হলে গঠনমূলক আলোচনার বিকল্প নেই। আমরা সংসদীয় রীতি মেনে সব প্রশ্নের জবাব দিতে প্রস্তুত।’