আগাম বর্ষণে বিভিন্ন স্থানে বোরো ধান ও সবজির ব্যাপক ক্ষতি

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

বৈশাখের শুরুতেই টানা বর্ষণ ও জলাবদ্ধতায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকের মুখে নেমে এসেছে হতাশা। কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরে আগাম বৃষ্টিতে পানির নিচে তলিয়ে গেছে পাকা বোরো ধান, আর বরগুনার বেতাগীতে অতিবর্ষণে পচতে শুরু করেছে বোরো ধানসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফসল। প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি কোথাও পানি নিষ্কাশনের প্রতিবন্ধকতা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। এতে ক্ষতির মুখে পড়েছেন হাজারো কৃষক। মাঠে দাঁড়িয়ে এখন তাদের একটাই প্রশ্ন- বছরের সব শ্রম আর বিনিয়োগের ক্ষতি কিভাবে পুষিয়ে উঠবেন।

হোসেনপুর (কিশোরগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরে আগাম ভারী বর্ষণে শত শত একর বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। কাটার অপেক্ষায় থাকা পাকা ধান নষ্ট হওয়ায় দিশেহারা এখন এ অঞ্চলের পাঁচ শতাধিক কৃষক। স্থানীয়দের অভিযোগ, খালের ওপর অবৈধ বাঁধ ও পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।

উপজেলার গোবিন্দপুর ইউনিয়নের পানান বিল ও আশপাশের এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সোনালি ধানে ভরা বিস্তীর্ণ মাঠ এখন পানির নিচে। কয়েক দিনের মধ্যেই কৃষকের ঘরে ওঠার কথা ছিল এই ধান। কিন্তু বৈশাখের শুরুতেই টানা বর্ষণে মাঠজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক নজরুল ইসলাম, হারুন ও অন্যরা বলেন, যে পানি মানুষের জীবন বাঁচায়, সেই পানিই আজ আমাদের স্বপ্নকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। তাদের ভাষ্য, এক বছরের বছর শ্রম আর ঋণ করে চাষ করা ধান চোখের সামনে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

স্থানীয় কৃষক চাঁন মিয়া ও আলামিনের অভিযোগ, শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, মানুষের অবহেলাও এই ক্ষতির জন্য দায়ী। পানান বিলের সাথে সংযুক্ত খালগুলোতে পানি বের হওয়ার পথ বিভিন্ন স্থানে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে বারইখালি খালের ওপর মাছ ধরার জন্য অপরিকল্পিত বাঁধ ও ফিশারি নির্মাণ করায় স্বাভাবিক পানি প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। এতে সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হচ্ছে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা।

পানান বিল ঘিরে ডাংরি, দক্ষিণ পানান, সৈয়দপুর, গাংগাটিয়াসহ বিস্তীর্ণ এলাকার কৃষকরা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এ ছাড়া কিশোরগঞ্জ সদর ও ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার অনেক কৃষিজমিও এ বিলের আশপাশে অবস্থিত।

স্থানীয় কৃষক ও কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, শুধু হোসেনপুর ও আশপাশের এলাকাতেই পাঁচ শতাধিক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পাশের উপজেলাগুলো মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ আরো বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দাবি, দ্রুত পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একইসাথে খালের ওপর নির্মিত অবৈধ বাঁধ অপসারণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য জরুরি সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ মহসিন জানান, উপজেলার ছয়টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় আট হাজার ১৩০ হেক্টর জমিতে এবার বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় দুই হাজার হেক্টরের ধান কাটা হয়েছে। তিনি বলেন, পানান বিল এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেশি হলেও কৃষকদের সহযোগিতায় কৃষি বিভাগ কাজ করছে।

বেতাগী (বরগুনা) সংবাদদাতা জানান, উপকূলীয় জনপদ বরগুনার বেতাগীতে টানা বর্ষণের কারণে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। গত এক সপ্তাহ ধরে অবিরাম বর্ষণে মাঠের ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। পচন ধরতে শুরু করছে বোরো ধানসহ অন্যান্য সবজি। ফলে দিশেহারা হয়ে পড়ছেন কৃষকরা।

উপজেলা কৃৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, গত এক সপ্তাহ ধরে শুরু হওয়া টানা বৃষ্টিতে আমন ধান, শাক-সবজি, মুগডাল, বাদাম, মরিচ, কাঁকর, পটল, করল্লা, উচ্ছে, শষা, পেঁপে, কাঁচা মরিচ, মিষ্টি কুমড়া, বরবটি, ডাটাশাকসহ বিভিন্ন ধরনের গ্রীষ্ম মৌসুমের ফসল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বেতাগী পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কৃষক গোলাম হোসেন বলেন, গত কয়েকদিন ধরে বৃষ্টিতে ফসল পচতে শুরু করেছে। বিশেষ করে মুগডাল, মিষ্টি কুমড়া, পটল ও বাদাম পচে যাচ্ছে।

বেতাগী সদর ইউনিয়নের বাসণ্ডা গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক বাবুল বিশ্বাস বলেন, অনেক কষ্ট করে জমিতে মুগডাল, বাদাম, মিষ্টি কুমড়া ও মরিচ চাষ করেছি। ফলনও ভালো হয়েছিল। কিন্তু শেষমেশ ঘরে নিতে পারলাম না। এই টানা বৃষ্টিতে সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এখন ঋণের টাকা কিভাবে শোধ করব সেটাই বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই ধরনের হতাশা প্রকাশ করেন অন্য কৃষকরাও। তারা সরকারের কাছে জরুরি সহায়তা ও ক্ষতিপূরণের দাবি জানান।

কৃষিবিদ সাজেদুর রহমান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আবহাওয়ার এমন অস্বাভাবিক আচরণ করছে, যা কৃষির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ক্ষতি মোকাবেলায় টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দেয়া প্রয়োজন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) অনিমেষ বালা বলেন, চলতি মৌসুমে বেতাগী উপজেলায় প্রায় সাত হাজার হেক্টর জমিতে মুগডাল, বাদাম, শষা, কুমড়া, বরবটি, করল্লাসহ বোরো ধান ও শাক-সবজি চাষ করেছে। টানা বর্ষণে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। মাঠ পর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখন হিসেব করা হচ্ছে।