চট্টগ্রাম বন্দরে ১ লাখ টন লাইট ক্রুড বোঝাই জাহাজ

ইস্টার্ন রিফাইনারি চালু হচ্ছে কাল বা পরশু

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা চট্টগ্রাম

দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ব জ্বালানি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি (ইর্আএল) আবারো প্রাণ ফিরে পাচ্ছে। এক লাখ টন এরাবিয়ান লাইট ক্রুড নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর বহির্নোঙরে পৌঁছেছে মার্শাল আইল্যান্ডের পতাকাবাহী বিশাল ট্যাংকার জাহাজ এমটি নিনেমিয়া। কাঁচামাল(ক্রুড) সঙ্কটে ইআরএল কার্যত বন্ধ হয়ে যায় গত ১৪ এপ্রিল রাতে। বর্তমানে নতুন কাঁচামালের জোগান আসাতে আগামীকাল শুক্রবার নাগাদ চালু হতে পারে দেশের একমাত্র জ্বালানি তেল শোধনাগার। তবে অপর একটি সূত্র রিফাইনারি চালু হতে শনিবার পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলেও জানিয়েছে।

বন্দর সূত্র জানিয়েছে, সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে এক লাখ টন ক্রুড অয়েল নিয়ে ছেড়ে আসা জাহাজ এমটি নিনেমিয়া গতকাল বুধবার দুপুরে চট্টগ্রাম বহির্নোঙরে পৌঁছায়। বহির্নোঙরে পৌঁছার পর জাহাজটিতে আসা ক্রুড বিএসসির তত্ত্বাবধানে লাইটারিং করে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পৌঁছানো হবে। লাইটারিংয়ে কয়েক দিন লেগে যেতে পারে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়। সূত্র জানিয়েছে, ইস্টার্ন রিফাইনারিতে প্রতিদিন সাড়ে ৪ হাজার টন ক্রুড পরিশোধন করা হয়। সে হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছা এক লাখ টন ক্রুড দিয়ে অন্তত ২২ দিন রিফাইনারি চালু রাখা যাবে বলেও সূত্র জানায়। এর মধ্যে ১০ মে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দর থেকে আরো একটি জাহাজ এক লাখ টন মারবান ক্রুড অয়েল নিয়ে চট্টগ্রামের পথে যাত্রা করবে এবং ২০ মে সেটি চট্টগ্রামে পৌঁছার কথা রয়েছে। এ ছাড়া হরমুজ প্রণালী ইস্যুতে আটকে পড়া এক লাখ টন ক্রুডবাহী এমটি নরডিক পোলাক্স জাহাজটিকেও দেশে আনার চেষ্টা চলছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

ইস্টার্ন রিফাইনারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো: শরীফ হাসনাত গতকাল বিকেলে নয়া দিগন্তকে বলেন, ক্রুড চলে এসেছে, এটা আমাদের জন্য একটা স্বস্তি। এখন লাইটারিং করে ক্রুড রিফাইনারিতে নিয়ে আসার প্রক্রিয়া শুরু হবে। আমরা আশা করছি কালকে (আজ বৃহস্পতিবার) যেকোনোভাবে আমাদের ইউনিটগুলো চালু করতে পারব। আমাদের দিক থেকে আমরা প্রস্তুত আছি। বাকিটা ওয়েদারসহ অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করছে বলে তিনি জানান।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আক্রমণের পর হতেই হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ব জ্বালানি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের তীব্র সঙ্কটে ভুগছিল।

মূলত সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ব তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো থেকে এরাবিয়ান লাইট ক্রুড অয়েল (এএলসি) ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি থেকে মারবান ক্রুড অয়েল আমদানি করে এই তেল শোধনাগারে তা পরিশোধন করা হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইআরএল মূলত মধ্যপ্রাচ্যের নির্দিষ্ট কিছু ‘লাইট ক্রুড’ শোধনের উপযোগী করে সৃষ্টি করা। ফলে অন্য কোনো উৎস থেকে তেল সংগ্রহ করা কঠিন। ইতঃপূর্বে করোনার সময় রাশিয়ান ক্রুড অয়েল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তা ইআরএলে পরিশোধন উপযোগী নয় বলে জানানো হয়েছিল।

সূত্র জানায়, সাধারণত প্রতি মাসে দুই দেশ থেকে আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেলের দু’টি ট্যাংকার বাংলাদেশে আসে। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে নির্ধারিত তিনটি ট্যাংকার আসেনি। এর মধ্যে একটি ট্যাংকারে তেল বোঝাই করলেও হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করতে পারেনি।

১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ইআরএল মূলত একটি ফুয়েল রিফাইনারি হিসেবে সীমিত কলেবরে স্থাপিত হলেও পরবর্তীকালে দেশের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বেশ কিছু নতুন ইউনিট সংযোজনের মাধ্যমে বর্তমানে কিছু নন-ফুয়েল পণ্যসহ লিকুইফাইড পেট্রলিয়াম গ্যাস (এলপিজি), স্পেশাল বয়েলিং পয়েন্ট সলভেন্ট (এসবিপি), মোটর গ্যাসোলিন রেগুলার (পেট্রল), মোটর গ্যাসোলিন প্রিমিয়াম (অকটেন), ন্যাফথা (গ্যাসোলিন), মিনারেল টার্পেনটাইন (এমটিটি), সুপিরিয়র কেরোসিন অয়েল (এসকেও), জেট এ-১ (এভিয়েশন টারবাইন ফুয়েল), হাইস্পিড ডিজেল (এইচএসডি), জুট ব্যাচিং অয়েল (জেবিও), লাইট ডিজেল অয়েল (এলডিও), ফার্নেস অয়েল (এফও) এবং বিটুমিন উৎপাদন করছে।

প্রসঙ্গত, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে বিপিসি কর্তৃক সরবরাহকৃত মোট জ্বালানি তেলের পরিমাণ ছিল ৬৮.৩৫ লাখ মেট্রিক টন। এসব জ্বালানি তেলের মধ্যে ৬২.৬৯% ডিজেল, ১৪.৩৪% ফার্নেস অয়েল, ৬.৩২% পেট্রল, ৫.৯০% অকটেন, ১.০০% কেরোসিন, ৮.১৯% জেট এ-১ এবং ১.৫৬% অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্য রয়েছে। এর মধ্যে ২০ শতাংশের জোগান আসে ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে।