সবুজ কারখানার আড়ালে সনদ বাণিজ্য

গ্রিন সার্টিফিকেট এটি ইতিবাচক কিন্তু বাজারজাতকরণের হাতিয়ার হয়ে যায় তাহলে এর মূল উদ্দেশ্য নষ্ট হবে। তার মতে, এলইইডি মূল্যায়নে কারখানার জ্বালানি ব্যবহার, পানি ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, কর্মপরিবেশ, নির্মাণ নকশা ও কার্বন নিঃসরণ বিবেচনা করা হলেও বাস্তবে তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আওতায় থাকে না। মূল সমস্যা হলো সার্টিফিকেশন এককালীন মূল্যায়নের ওপর নির্ভরশীল, অথচ পরিবেশ ব্যবস্থাপনা হওয়া উচিত ধারাবাহিক। ফলে অনেক কারখানা সনদ পাওয়ার সময় পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি দেখালেও পরবর্তীতে তা আর বজায় রাখে না।

শাহ আলম নূর
Printed Edition

বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ

  • নিয়মিত ৩য় পক্ষের স্বাধীন মনিটরিং চালু করা
  • জ্বালানি ও পানি ব্যবহারের তথ্য বাধ্যতামূলকভাবে প্রকাশ করা
  • শ্রমিক কল্যাণ সূচককে সার্টিফিকেশনের অংশ করা
  • আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা

বিশ্বের তৈরি পোশাকশিল্পে পরিবেশবান্ধব বা ‘সবুজ কারখানা’ হিসেবে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন পদ্ধতি ‘লিডারশিপ ইন এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ডিজাইন’ (এলইইডি) সনদপ্রাপ্ত কারখানার সংখ্যায় বাংলাদেশ এখন বিশ্বসেরা। বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ২৮৪টি সবুজ কারখানা রয়েছে, এতে ১২১টি ‘প্লাটিনাম’, ১৪৪টি ‘গোল্ড’, ১৫টি ‘সিলভার’ এবং ৪টি ‘সার্টিফায়েড’ মানের। বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি সর্বোচ্চ রেটিংপ্রাপ্ত সবুজ কারখানার মধ্যে ৬০টিরও বেশি এবং শীর্ষ ১০টির মধ্যে ৯টিই বাংলাদেশে অবস্থিত। এছাড়া ৫০০টিরও বেশি কারখানা নতুনভাবে এই সনদের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

তবে এই অভাবনীয় সাফল্যের আড়ালে আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়াকে ঘিরে এক ধরনের ‘সনদ বাণিজ্য’, স্কোর জালিয়াতি ও ‘গ্রিনওয়াশিং’-এর অভিযোগ তুলেছেন শিল্পসংশ্লিষ্ট, পরিবেশবিদ ও শ্রম-অধিকারকর্মীরা। তাদের দাবি, প্রকৃত পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনার চেয়ে এখন আন্তর্জাতিক বাজারে ব্র্যান্ড ভ্যালু বাড়ানো, ক্রেতা আকর্ষণ এবং ব্যাংকঋণ পেতে সার্টিফিকেট অর্জনের অন্ধ প্রতিযোগিতা চলছে। এ প্রক্রিয়ায় কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠান, নিরীক্ষা সংস্থা ও বিদেশী মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে স্থানীয় কিছু উদ্যোক্তার অস্বচ্ছ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে।

পরিবেশ ও শিল্পনিরাপত্তা বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, গ্রিন সার্টিফিকেট এটি ইতিবাচক কিন্তু বাজারজাতকরণের হাতিয়ার হয়ে যায় তাহলে এর মূল উদ্দেশ্য নষ্ট হবে। তার মতে, এলইইডি মূল্যায়নে কারখানার জ্বালানি ব্যবহার, পানি ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, কর্মপরিবেশ, নির্মাণ নকশা ও কার্বন নিঃসরণ বিবেচনা করা হলেও বাস্তবে তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আওতায় থাকে না। মূল সমস্যা হলো সার্টিফিকেশন এককালীন মূল্যায়নের ওপর নির্ভরশীল, অথচ পরিবেশ ব্যবস্থাপনা হওয়া উচিত ধারাবাহিক। ফলে অনেক কারখানা সনদ পাওয়ার সময় পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি দেখালেও পরবর্তীতে তা আর বজায় রাখে না।

জানা গেছে, একটি কারখানাকে এলইইডি সনদ পেতে আন্তর্জাতিক কনসালটেন্সি, ডিজাইন পরিবর্তন ও মূল্যায়ন বাবদ কয়েক কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়, যার বড় অংশই যায় বিদেশী পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের পকেটে। অভিযোগ রয়েছে, ‘ডকুমেন্ট ম্যানেজমেন্ট’ ও ‘স্কোর ম্যানিপুলেশন’-এর মাধ্যমে বাস্তব পরিবেশ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন না করেই অনেক প্রতিষ্ঠান সনদ নিচ্ছে। নাম না প্রকাশের শর্তে গাজীপুরের একটি রফতানিমুখী কারখানার একজন পরিচালক নয়া দিগন্তকে বলেন, কিছু অসাধু কনসালটেন্ট অতিরিক্ত টাকা দিলে দ্রুত সার্টিফিকেট পাইয়ে দেয়া এবং কাগজপত্রের ভিত্তিতে স্কোর বাড়িয়ে দেয়ার আশ্বাস দেয়। তিনি আরো

জানান, কিছু কারখানা শুধুমাত্র বিদেশী ক্রেতাদের কাছে নিজেদের ‘সবুজ’ পরিচয় তুলে ধরতে সীমিত পরিসরে পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো তৈরি করে, অথচ উৎপাদন প্রক্রিয়ায় এখনো উচ্চমাত্রার জ্বালানি ব্যবহার, রাসায়নিক দূষণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতি রয়ে গেছে।

এদিকে শ্রম-অধিকারকর্মীরা বলছেন, সবুজ কারখানার জাঁকজমকপূর্ণ আলোচনায় শ্রমিকদের ন্যায্যমজুরি ও কল্যাণের বিষয়টি আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) কর্মকর্তা নয়া দিগন্তকে বলেন, কারখানার ছাদে সোলার প্যানেল লাগানো বা পানি পুনর্ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শ্রমিক যদি ন্যায্যমজুরি না পায়, তবে সেই কারখানাকে টেকসই বলা চলে না। আন্তর্জাতিক শ্রম-পরিবেশ সংগঠনগুলোর একটি অংশও মনে করে, অনেক আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের ‘গ্রিনওয়াশিং’ কৌশল হিসেবে এসব সার্টিফিকেট ব্যবহার করছে- পরিবেশবান্ধব ইমেজ তৈরি করা হলেও উৎপাদন শৃঙ্খলের সামগ্রিক টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত হচ্ছে না।

অন্যদিকে এত বিপুলসংখ্যক সবুজ কারখানা থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের দাম না বাড়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদরা। অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, গ্রিন ফ্যাক্টরি ইতিবাচক ব্র্যান্ডিং তৈরি করলেও তা যদি রফতানি মূল্যে ভূমিকা না রাখে, তবে উদ্যোক্তারা আর্থিক চাপে পড়বেন এবং এই সুযোগে মধ্যস্বত্বভোগী ও কনসালটেন্সি ব্যবসা মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। তাই আন্তর্জাতিক নিরীক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

অবশ্য বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, পরিবেশবান্ধব পোশাক উৎপাদনে বিশ্বসেরা হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান আরো শক্তিশালী হয়েছে, যা টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থা গ্রহণে আমাদের ধারাবাহিক অগ্রগতির প্রমাণ।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশের পোশাকশিল্পের এ আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ধরে রাখতে শুধুমাত্র সনদের ওপর নির্ভর না করে নিয়মিত তৃতীয় পক্ষের মনিটরিং, জ্বালানি ও পানি ব্যবহারের তথ্যপ্রকাশ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার স্বাধীন নিরীক্ষা এবং শ্রমিক কল্যাণ সূচককে বাধ্যতামূলক করাসহ সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়ায় পূর্ণ স্বচ্ছতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। পরিবেশবিদরাও বলছেন, গ্রিন ফ্যাক্টরি শুধু একটি ভবন নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ নৈতিক উৎপাদন ব্যবস্থা- যেখানে পরিবেশ, শ্রমিক অধিকার ও সামাজিক দায়বদ্ধতা একসাথে নিশ্চিত করতে হবে। সার্টিফিকেটকে কেবল ব্যবসায়িক ব্র্যান্ডিং হিসেবে ব্যবহার করলে সেটি টেকসই উন্নয়ন নয়। অন্যথায় ‘সবুজ কারখানা’ অর্জনের এ বৈশ্বিক সাফল্য একসময় প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়তে পারে।