অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
টানা দ্বিতীয় দিনের মতো নেতিবাচক আচরণের শিকার হলো দেশের পুঁজিবাজার। দিনের শুরুটা ভালো হলেও শেষ দিকে সৃষ্টি হওয়া বিক্রয়চাপ এ নেতিবাচক আচরণে ফিরিয়ে নিচ্ছে বাজারকে। তবে এতে খুব একটা তোয়াক্কা করছেন না বিনিয়োগকারীরা। ভালো একটি বাজারের প্রত্যাশায় বাড়ছে তাদের অংশগ্রহণ যা বাজারগুলোতে লেনদেনের ইতিবাচক ধারা ধরে রাখতে সাহায্য করছে। ফলে সূচকের নেতিবাচক আচরণ সত্ত্বেও গতকাল লেনদেন বেড়েছে দুই বাজারে। তবে বাজারগুলোতে লেনদেন হওয়া কোম্পানির বেশির ভাগ দর হারানোর ফলে সূচকের আচরণ ছিল নেতিবাচক।
দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৩ দশমিক ৫৭ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। পাঁচ হাজার ৫১৬ দশমিক ৮২ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি বিকালে লেনদেনশেষে পাঁচ হাজার ৫২০ দশমিক ৩৯ পয়েন্টে স্থির হয়। এ সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচকের মধ্যে ডিএসই-৩০ সূচক ৭ দশমিক ১৮ পয়েন্ট হারালেও শরিয়াহ সূচকটি ০ দশমিক ৫২ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে। অপর দিকে, দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই গতকাল ৪৮ দশমিক ৫০ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি ঘটে যথাক্রমে ২৫ দশমিক ১১ ও ৪৫ দশমিক ৩৬ পয়েন্ট।
সূচকের নেতিবাচক আচরণ সত্ত্বেও বাজারগুলোতে লেনদেনের উন্নতি ঘটেছে গতকাল। ডিএসইতে এদিন এক হাজার ২৩৮ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি হয় যা আগের দিনের চেয়ে ২৮ কোটি টাকা বেশি। বুধবার ডিএসইর লেনদেন ছিল এক হাজার ২১০ কোটি টাকা। অপর দিকে, চট্টগ্রামে গতকাল ৩৪ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি হয় যা আগের দিন অপেক্ষা ১০ কোটি টাকা বেশি। বুধবার সিএসইর লেনদেন ছিল ২৪ কোটি টাকা।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা গত দু’দিনের বাজার আচরণ বিশ্লেষণ করে এটাকে বাজারের স্বাভাবিক আচরণে ফেরার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে এর আগে ১০ দিন টানা বৃদ্ধির পর এদিন কিছুটা সংশোধন ঘটে। পরে বাজেটকে সামনে রেখে বিনিয়োগকারীরা কিছুটা দোদুল্যমান ছিলেন। কিন্তু তারা বাজারে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছেন যা বাজারের প্রতি তাদের আস্থা বৃদ্ধির প্রতিফলন। এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে ধীরে ধীরে ভারসাম্য ফিরছে। কিছুদিন আগেও হাতে গোনা কয়েকটি নির্দিষ্ট কোম্পানি দুই পুঁজিবাজারের লেনদেন ও মূল্যবৃদ্ধিতে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখত। সম্প্রতি এ ধারায় পরিবর্তন এসেছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন কোম্পানি এ জায়গাগুলো দখলে রাখছে। এর ফলে বিনিয়োগকারীরাও সহজে নিজেদের বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন।
তবে তারা মনে করেন দীর্ঘ সময় ধরে পুঁজিবাজর ব্যাপক অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার শিকার থাকায় একদিনেই স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার সুযোগ নেই। কিন্তু গত কয়েকদিনের বাজার বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ছোটখাটো কিছু ব্যত্যয় বাদ দিলে ক্রমান্বয়ে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে পুঁজিবাজার। এ মুহূর্তে দীর্ঘ সময় ধরে লোকসানে থাকা বিনিয়োগকারীদের চাহিদা বাজেটে পুঁজিবাজারের জন্য কিছু বাড়তি প্রণোদনা। আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে এ ধরনের কিছু প্রণোদনা থাকলে তা বিনিয়োগকারীদের বাজারে টিকে থাকতে সহায়ক হবে।
বিনিয়োগকারীরাও মনে করেন, বেশ কিছুদিন সূচকের দীর্ঘ উত্থানের পর গত দু’দিন বাজার আচরণে কিছুটা নেতিবাচক প্রবণতা বিরাজ করলেও বড় ধরনের সংশোধন ঘটেনি। এটা সামনের দিনগুলোর জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত। কারণ এ মুহূর্তে পুঁজিবাজারের মূল্যস্তর অনেক নীচে যা বিনিয়োগের জন্য সহায়ক। তাই বাজারে এ মুহূর্তে বড় ধরনের সংশোধন ঘটার আশঙ্কা নেই। এটা ইতিবাচক মনোভাব থেকেই গত দু’দিন সূচকের নেতিবাচক আচরণেও বাজারগুলো সম্মানজনক লেনদেন ধরে রেখেছে। এখন স্বাভাবিক বাজার আচরণ টিকে থাকলে সামনের দিনগুলোতে সাইড লাইনে থাকা নতুন নতুন বিনিয়োগকারী বাজারের সাথে যুক্ত হবেন যা বাজারের গতিশীলতা বাড়াবে।
গতকাল ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষে উঠে আসে সেবা খাতের প্রতিষ্ঠান সামিট অ্যালাইয়েন্স পোর্ট। ৪০ কোটি ২২ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ৬৯ লাখ ৮২ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ৩৯ কোটি ২৬ লাখ টাকায় এক কোটি ৬৯ লাখ শেয়ার বেচাকেনা করে লেনদেনের দ্বিতীয় শীর্ষ কোম্পানি ছিল ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইন্ডাস্ট্রিয়্যাল প্রমোশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি (আইপিডিসি)। ডিএসইর লেনদেনে শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে পিপলস ইন্স্যুরেন্স, বিডি থাই ফুডস, এনসিসিবি, লাভেলো আইসক্রিম, আনোয়ার গ্যালভেনাইজিং, প্রভাতি ইন্স্যুরেন্স, জেনেক্স ইনফোসিস লিঃ ও ট্রাস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স।
ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ কোম্পানি ছিল বিডি থাই অ্যালুমিনিয়াম। কোম্পানিটির ৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে গতকাল। ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের তৃতীয় দিনের মাথায় গতকাল আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে ইসলামী ব্যাংক। ৯ দশমিক ৮১ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে কোম্পানিটি গতকাল মূল্যবৃদ্ধির দ্বিতীয় স্থানে জায়গা করে নিয়েছে। ৯ দশমিক ৭২ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পাওয়া আইপিডিসি ছিল এ তালিকায় তৃতীয় কোম্পানি। মূল্যবৃদ্ধিতে ডিএসইর শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ফারইস্ট নিটিং অ্যান্ড ডাইং, দেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্স, সামিট অ্যালাইয়েন্স পোর্ট, ট্রাস্ট ইসলামিক লাইফ ইন্স্যুরেন্স, ইউনাইটেড ফিন্যান্স, ডেফোডিল কম্পিউটার, পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্স ও আর এ কে সিরামিকস।
গতকাল নিয়ে টানা তৃতীয় দিনের মতো ডিএসইতে দরপতনের শীর্ষে ছিল বেক্সিমকো লিমিটেড। কোম্পানিটি ৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ দর হারায় গতকাল। ৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ দর হারিয়ে এ তালিকায় দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল মেঘনা করডেন্সড মিল্ক। ডিএসইতে দরপতনে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে প্রিমিয়ার লিজিং, ফারইস্ট ফিন্যান্স, পিপল লিজিং, এফএএস ফিন্যান্স, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্স, মেঘনা পেট ইন্ডাস্ট্রিজ, প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্স ও বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স।



