হাওরের বুক চিরে ‘উন্নয়ন’ নাকি দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয়?

Printed Edition

আলি জামশেদ বাজিতপুর (কিশোরগঞ্জ)

কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের বুক চিরে নির্মিত প্রায় ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ অলওয়েদার সড়ক একসময় ‘উন্নয়নের প্রতীক’ হিসেবে প্রচার পেয়েছিল। কিন্তু কয়েক বছর যেতে না যেতেই সেই সড়ক এখন স্থানীয় কৃষক, জেলে, গবেষক ও পরিবেশবিদদের একাংশের কাছে পরিণত হয়েছে ‘গলার কাঁটা’য়। অভিযোগ উঠেছেÑ সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের রাজনৈতিক প্রভাব ও দ্রুত বাস্তবায়নের চাপের মধ্যে নির্মিত এই প্রকল্প হাওরের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ, মাছের বিচরণ, কৃষি উৎপাদন ও জীববৈচিত্র্যে অস্বাভাবিক পরিবর্তন ডেকে এনেছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম অলওয়েদার সড়ক এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; বরং বর্ষা মৌসুমে পানির স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা হয়ে দাঁড়ানো এক বিশাল বাঁধে পরিণত হয়েছে। যদিও সরকারি কর্মকর্তাদের একটি অংশ এসব অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করছেন। ফলে উন্নয়ন বনাম পরিবেশÑ এই পুরনো বিতর্ক আবারো সামনে এসেছে নতুন করে।

হাওরের স্বাভাবিক চরিত্রে হস্তপে?

হাওরের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে উন্মুক্ত জলপ্রবাহ। বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢল এসে দ্রুত বিস্তীর্ণ জলরাশিতে ছড়িয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে নদীপথে নেমে যায়। কিন্তু অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, প্রায় ২৯ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই উঁচু সড়ক অনেকাংশে সেই প্রাকৃতিক প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।

২০২০ সালে প্রায় ৮৭৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সড়কটিতে রয়েছে মাত্র তিনটি পিসি গার্ডার ব্রিজ, ৬২টি আরসিসি বক্স কালভার্ট এবং ১১টি আরসিসি গার্ডার ব্রিজ। বিশেষজ্ঞদের দাবি, হাওরের মতো বিশাল জলাধারের জন্য এ অবকাঠামো পর্যাপ্ত নয়।

হাওর গবেষক ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ুম বলেন, ‘হাওরের মধ্যে এমন সড়ক নির্মাণের আগে অন্তত ৩০ শতাংশ অংশ এলিভেটেড বা উড়ালপথ রাখার প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তা আমলে নেয়া হয়নি। এখন এর প্রভাব কৃষি, মাছ, নৌযোগাযোগ ও জীববৈচিত্র্যে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।’

তার ভাষ্য, ‘উন্নয়ন মানেই শুধু রাস্তা নয়; উন্নয়ন হতে হবে পরিবেশ-সহনশীল। এই সড়ক ভবিষ্যতে আরো বড় পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।’

বন্যার পানিতে আটকে যাচ্ছে হাওর

স্থানীয় কৃষক ও জেলেদের অভিযোগ, ভারীবর্ষণ ও ভারতের মেঘালয় এবং আসাম থেকে নেমে আসা ঢলের পানি এখন আগের মতো দ্রুত নামতে পারছে না। ফলে পানি দীর্ঘসময় আটকে থাকছে হাওরে, বাড়ছে অকাল বন্যা ও জলাবদ্ধতা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, পাহাড়ি ঢলের পানি প্রথমে যাদুকাটা, সারি, ধলাইসহ ছোট-বড় নদীতে এসে পড়ে। সেখান থেকে সুরমা ও কুশিয়ারা নদী হয়ে পানি সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে প্রবেশ করে। পরে ধনু নদী ও ঘোড়াউত্রা হয়ে কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন হাওরে ছড়িয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত মেঘনায় গিয়ে মেশে। কিন্তু স্থানীয়দের দাবি, মাঝপথে নির্মিত উঁচু অলওয়েদার সড়ক পানি নিষ্কাশনের গতি মন্থর করে দিচ্ছে। জোয়ানশাহী হাওরের কৃষক কামরুল ইসলাম বলেন, ‘সড়ক হওয়ার পর কয়েকবার বড় তির মুখে পড়েছি। এ বছরও আমার ৩৬ একর জমির প্রায় ৭০ শতাংশ তলিয়ে গেছে। পানি নামতে দেরি হচ্ছে।’

মাছের বিচরণ কমেছে, তিগ্রস্ত জেলে সম্প্রদায়

শুধু কৃষিই নয়, মাছের প্রজনন ও বিচরণ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ, আগে যেসব মাছ অবাধে হাওরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চলাচল করত, এখন তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নিকলীর জারইতলা ইউনিয়নের কৃষক ও মৌসুমি জেলে ধনু মিয়া বলেন, ‘সড়ক হওয়ার পর নিকলী হাওরে মাছ কমে গেছে। আগের মতো মাছ আর আসে না। জেলেদের আয়ও কমেছে।’

গবেষকদের মতে, হাওরের প্রাকৃতিক জলপথ সঙ্কুচিত হলে মাছের প্রজনন ত্রেও তিগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে দেশীয় প্রজাতির মাছের বিচরণ সীমিত হয়ে পড়ে।

শুধু সড়ক নয়, দায়ী নদী ভরাটও

তবে সব মহল একমত নয়। সড়ক ও জনপথ বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা এবং স্থানীয়দের একটি অংশের মতে, শুধু অলওয়েদার সড়ককে দায়ী করা বাস্তবসম্মত নয়।

তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে নদী-নদীর খনন না হওয়া, পলি জমে নাব্যতা কমে যাওয়া, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ এবং নদী দখলÑ এসবও সমানভাবে দায়ী।

কিশোরগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সাকিল মোহাম্মদ ফয়সাল বলেন, ‘সিলেট বা কিশোরগঞ্জের বন্যার জন্য এককভাবে অলওয়েদার সড়ককে দায়ী করা যাবে না। নদীগুলো ভরাট হয়ে গেছে। খণ্ড খণ্ড খননে সমাধান হবে না, প্রয়োজন সমন্বিত খনন।’

সরেজমিন দেখা গেছে, মেঘনা নদীর বিভিন্ন অংশে অসংখ্য চর জেগে উঠেছে। কোথাও কোথাও নদীর তীর দখল করে স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। স্থানীয়দের মতে, ভৈরব-আশুগঞ্জ এলাকায় একাধিক সেতু ও রেলসংযোগও পানিপ্রবাহে প্রভাব ফেলছে।

উন্নয়ন নাকি রাজনৈতিক প্রভাবের প্রকল্প?

স্থানীয়দের অনেকেই মনে করেন, সাবেক রাষ্ট্রপতির রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেই দ্রুত বাস্তবায়ন করা হয় এই প্রকল্প। পরিকল্পনার পর্যায়ে পরিবেশগত ঝুঁকি নিয়ে আপত্তি উঠলেও তা গুরুত্ব পায়নি। একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় ‘দ্রুত কাজ শেষ করার চাপ’ ছিল। পরিবেশগত দীর্ঘমেয়াদি সমীা যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি বলেও অভিযোগ তাদের।

পরিবেশবিদ ও গবেষকদের একটি বড় অংশ এখন হাওরাঞ্চলে এলিভেটেড বা উড়াল সড়ক নির্মাণের পে মত দিচ্ছেন। তাদের যুক্তি, এতে নিচ দিয়ে পানিপ্রবাহ অব্যাহত থাকবে এবং বন্যার চাপ কমবে।

কেউ কেউ বিদ্যমান সড়কের বিভিন্ন অংশ কেটে অতিরিক্ত ব্রিজ ও কালভার্ট নির্মাণের দাবিও তুলেছেন।

অনুসন্ধানে আরো উঠে এসেছে, শুধু ইটনা-মিঠামইন সড়ক নয়; হাওরাঞ্চলের বিভিন্ন পূর্ব-পশ্চিমমুখী সড়কও অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত হয়েছে। অনেক সড়কে পর্যাপ্ত কালভার্ট না থাকায় পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

কৃষকের বহুমাত্রিক সঙ্কট

সাম্প্রতিক বন্যায় হাওরাঞ্চলের কৃষকেরা নানামুখী সঙ্কটে পড়েছেন। মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ীÑ কাঁচা ও আধাপাকা ধান তলিয়ে গেছে; ধানের গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে; পানির কারণে হারভেস্টার ব্যবহার কঠিন হয়ে পড়েছে; শ্রমিক সঙ্কট তৈরি হয়েছে; ভেজা ধান শুকাতে হিমশিম খাচ্ছেন কৃষকেরা; ন্যায্যমূল্যে ধান বিক্রির সুযোগ কমেছে; গবাদিপশুর খাদ্য ও ঘাসের সঙ্কট তৈরি হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি বছর একই সঙ্কট দেখা দিলেও এখনো হয়নি কোনো সমন্বিত পরিবেশগত ও জলপ্রবাহভিত্তিক সমীা।

বড় সমীার দাবি

বিশেষজ্ঞদের মতে, হাওরাঞ্চলে যেকোনো অবকাঠামো নির্মাণের আগে সমন্বিত জলবিদ্যা, নদীপ্রবাহ, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত প্রভাব বিশ্লেষণ জরুরি ছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রক্রিয়া যথেষ্টভাবে অনুসরণ করা হয়নি। ফলে এখন প্রশ্ন উঠেছেÑ যোগাযোগ উন্নয়নের নামে নির্মিত এই ‘মেগা প্রকল্প’ আদৌ দীর্ঘমেয়াদে টেকসই কি না।

এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল এবং জেলা বিএনপির সভাপতি শরিফুল আলমের বক্তব্য নেয়ার চেষ্টা করা হলেও তাদের সাথে যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।