নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) থেকে হালাল সনদ নিতে গিয়ে গাড়ি, টাকা এমনকি রফতানির পরিমাণ অনুযায়ী চাঁদা দাবি করা হয় এমন গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন দেশের শীর্ষ শিল্প উদ্যোক্তারা। একই সাথে তারা বলেছেন, দেশে একাধিক সংস্থা পৃথকভাবে হালাল সনদ দেয়ায় ব্যবসায়ীদের ব্যয় ও জটিলতা বাড়ছে। তাই আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন একটি একক হালাল অথরিটি বা হালাল বোর্ড গঠন এখন সময়ের দাবি। গতকাল রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই) আয়োজিত ‘রফতানি বহুমুখীকরণে হালাল’ শীর্ষক কর্মশালায় এসব অভিযোগ ও দাবি উঠে আসে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ হাসান আরিফ। এ সময় সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও ব্যবসায়ীরা অংশগ্রহণ করেন।
কর্মশালায় বিসিআইয়ের পরিচালক ও ইজি ফুডের চেয়ারম্যান জিয়া হায়দার অভিযোগ করে বলেন, বিএসটিআই থেকে হালাল সনদ নিতে গেলে কর্মকর্তারা ‘গাড়ি দাও, টাকা দাও’ এ ধরনের দাবি করেন। এমনকি কত টন পণ্য রফতানি হবে, তার ওপর ভিত্তি করে চাঁদা চাওয়ারও অভিযোগ করেন তিনি। জিয়া হায়দার বলেন, এ ধরনের অনৈতিক দাবি বিদেশী ক্রেতাদের কাছেও নেতিবাচক বার্তা দেয়। অনেক ক্রেতা তখন আনুষ্ঠানিক সনদের পরিবর্তে শুধু পণ্যের মোড়কে ‘হালাল’ লেখা থাকলেই যথেষ্ট বলে মনে করেন। তিনি বলেন, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে হালাল সনদ প্রদানের প্রক্রিয়া সহজ, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত করতে হবে।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বোম্বে সুইটস লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক খুরশীদ আহমাদ ফরহাদ বলেন, অতীতে একটি হালাল সনদ পেতে ১৬ থেকে ১৮ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হতো। বর্তমানে কিছুটা কমলেও সমস্যা পুরোপুরি দূর হয়নি। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশে প্রাপ্ত সনদ অনেক ক্ষেত্রে সৌদি আরবে গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পারস্পরিক স্বীকৃতি বা চুক্তি নেই। ফলে রফতানিকারকদের ভারত, থাইল্যান্ড কিংবা সিঙ্গাপুর থেকে পুনরায় হালাল সনদ নিতে হচ্ছে, যা সময় ও ব্যয় উভয়ই বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সভাপতির বক্তব্যে আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণ এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জনে রফতানি বহুমুখীকরণের কোনো বিকল্প নেই। বর্তমানে দেশের মোট রফতানি আয়ের প্রায় ৮২ শতাংশই তৈরী পোশাক খাত থেকে আসে। এ নির্ভরতা কমাতে খাদ্য ও কৃষিপণ্য, ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, হালাল অর্থনীতি, প্রযুক্তিনির্ভর পোশাক, ইলেকট্রনিকস, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, তথ্যপ্রযুক্তি, চামড়া, আসবাবপত্র ও জাহাজ নির্মাণসহ নতুন সম্ভাবনাময় খাতকে এগিয়ে নিতে হবে।
তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের হালাল পণ্য রফতানির পরিমাণ প্রায় ৮৫ কোটি (৮৫০ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার। অন্য দিকে ২০২৫ সালে বৈশ্বিক হালাল বাজারের আকার ছিল প্রায় ৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩৪ সালে এই বাজার ৯ দশমিক ৪৫ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত হতে পারে, যেখানে বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধি ১২ শতাংশেরও বেশি।
বিসিআই সভাপতি বলেন, বিশ্বের প্রায় ২০০ কোটি মুসলমান ছাড়াও স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, নৈতিকতা ও গুণগত মানের কারণে অমুসলিম ভোক্তাদের মধ্যেও হালাল পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এই বাজারে উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করতে পারে। এজন্য ‘বাংলাদেশ হালাল’ নামে একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড গড়ে তোলার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি আরো বলেন, বর্তমানে ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও বিএসটিআই আলাদাভাবে হালাল সনদ প্রদান করায় ব্যবসায়ীদের ব্যয়, সময় ও প্রশাসনিক জটিলতা বাড়ছে। তাই একটি কেন্দ্রীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হালাল কর্তৃপক্ষ গঠন জরুরি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ হাসান আরিফ বলেন, রফতানি বহুমুখীকরণে হালাল খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শুধু খাদ্যপণ্য নয়, ওষুধ, প্রসাধনী, লজিস্টিকস, পর্যটন, ইসলামিক ফাইন্যান্সসহ হালাল অর্থনীতির বিস্তৃত ক্ষেত্র রয়েছে। এসব খাতে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে আরো কার্যকরভাবে যুক্ত করতে সরকার কাজ করছে বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা, বিদেশী ক্রেতাদের সাথে সংযোগ এবং রফতানি সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ইপিবি ব্যবসায়ীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়ে যাবে।
কর্মশালায় উপস্থিত বক্তারা মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ সফল দেশগুলোর অভিজ্ঞতা অনুসরণ করে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিকমানের পরীক্ষাগার স্থাপন, উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত শরিয়াহ, স্বাস্থ্য ও নৈতিক মান নিশ্চিতকরণ, গবেষণা ও দক্ষ জনবল উন্নয়ন এবং সরকার-বেসরকারি খাত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী হালাল ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার সুপারিশ করেন।



